প্রথম দর্শনেই প্রেমের ব্যাপারটা কিন্তু আদৌ টিটকারির বা হাসাহাসি করে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবার মতো নয়।
প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়া, প্রেমে হাবুডুব খাওয়ার ব্যাপারটা আজ যেমন অবাস্তব নয়, তেমনি অতীতেও ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না–মোদ্দা কথা, চিরকালই থাকবে।
এক ঝলক দেখেই মন-প্রাণ উতলা হয়ে পড়াটা কিন্তু যে-সে ব্যাপার নয়, হেসে উড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপার তো অবশ্যই নয়। অত্যাধুনিক আবিষ্ককারগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করলে বহু অদ্ভুত ঘটনার কথা জানা সম্ভব হচ্ছে।
আপনারা প্রেমের ব্যাপারটাকে যে দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার করুন না কেন, নৈতিক চৌম্বক ধর্ম বা চৌম্বক-সৌন্দর্য বিজ্ঞান যা-ই বলুন না কেন, প্রকৃত বক্তব্যটা কিন্তু বাস্তবিকই যারপরনাই চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী।
এক পলকে, মুহূর্তের দর্শনে দু-দুটো অন্তরের গভীরে যে অভাবনীয়নিবিড় নৈকট্যবোধ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে তাকে লোহা গলিয়ে, লোহার সঙ্গে সেঁটে দেওয়ার মতোই চিরস্থায়ী মনে করতে তিলমাত্র দ্বিধাও কারো মধ্যে থাকা উচিত নয়।
সত্যি বলছি, হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করলে আপনিও অবশ্যই আমার সঙ্গে সহমত পোষণ করবেন যে, প্রথম দর্শনেই দুটো অন্তরের গোপন বন্দরে অতর্কিতে ঠিক যেন ইলেকট্রিক সহানুভূতি ঝিলিক মেরে ওঠে। বুকের ভেতরে তীব্র আলোক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
প্রেম বা ভালোবাসা যে শব্দই ব্যবহার করুন না কেন, তা কিন্তু প্রথম দর্শনের মুহূর্তেই খুবই তীব্র, পুরোপুরি নিখাদভাবে বিকিরিত হয়ে থাকে।
ভেবে দেখুন, প্রথম দর্শনে অন্তরে যে প্রেমের সঞ্চার ঘটে তার চেয়ে নিখাদ, তার চেয়ে অকৃত্রিম আর কিছু হতে পারে কি? আমি তো জোর গলায়ই বলব–না, অবশ্যই না। দু টুকরো গলানো লোহার মতোই একটা হৃদয় অন্য আর একটা হৃদয়ের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে জোড়া লেগে যায়।
যে কাহিনীটা এখনই আপনার দরবারে পেশ করব তা পড়লেই নিঃসন্দেহ হবেন আমার কথাটা কতখানি বাস্তবতায় পরিপূর্ণ, কতখানি নিখাদ। আর এও বলছি, এ ব্যাপারে হাজারো দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যেতে পারে। তবুও আমি বলব, বর্তমান কাহিনীটাই আমার এ বক্তব্যের প্রমাণ দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।
একটা কথা গোড়াতেই বলে রাখছি–গল্পটাকে রসসিক্ত ও মনোমুগ্ধকর করে তোলার জন্য আমাকে একটু বিশদভাবেই বর্ণনা দিতে হবে। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, আমাকে সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আপনাদের দরবারে পেশ করতে হবে, আশা করি আমার বক্তব্যটা আপনাদের বোঝাতে পেরেছি।
যাক গে, যে কথা বলছিলাম, বর্তমানে আমি বয়সের দিক থেকে নিতান্তই এক যুবক–সবে যৌবনের প্রথম ধাপে পা রেখেছি। এখন আমার বয়স বাইশ চলছে। আর আমার বর্তমান নামটাও মোপটেই জবরজং নয়, নিতান্তই সাদামাটা–সিম্পসন।
স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, বর্তমান শব্দটা কেন ব্যবহার করলাম, তাই না? হ্যাঁ, কারণ তো একটা অবশ্যই আছে। কারণটা হচ্ছে, অতি সম্প্রতি আইনানুগভাবে আমার পদবীটা বদল করার দরকার হয়ে পড়ে। ফলে করলামও তা-ই।
কেন পদবীটা বদল করতে আমি উৎসাহি হয়েছি তা-ও খোলসা করেই বলছি। বহু দূর সম্পর্কের আমার এক আত্মীয়, পুরুষ আত্মীয়ের উত্তরাধিকারী আমাকে হতে হয়েছে। সে জন্যই পদবী বদলের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছি। আর ঘটনাটা বেশিদিন আগে ঘটেনি, গত বছরের ব্যাপার।
আমার ভাগ্য কিছুটা বদলে দেওয়া সে পরম আত্মীয়ের নামটাও আপনাদের সামনে পেশ করা যাক, কি বলেন?
অ্যাডলফাস সিম্পসন তার নাম।
আমি যথাসময়ে জানতে পারলাম, সম্পত্তির উত্তরাধিকার অর্জন করতে হলে যার সম্পত্তি তার পদবী আমাকে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। তবে এটা খুবই সত্য যে, আমি কেবলমাত্র প্রথম নামটা গ্রহণ করলেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে দিতে পারতাম। কিন্তু উইলের শর্ত যে আমাকে মানতেই হবে!
সম্পত্তি বাগাবার তাগিদে আমি আমার পারিবারিক পদবীই কেবল নয়, খোল নলচে সবই বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। আর ধ্যুৎ! যদি হাতছাড়া হয়ে যায় তবে পারিবারিক নাম পদবী ধুয়ে কি পানি খাব?
আমার পারিবারিক প্রথম আসল নাম, যাকে বলে আমার জন্মসূত্রে পাওয়া নাম ছিল নেপোলিয়ান বোনাপার্ট। আরও খোলসা করেই বলছি-আমার আগেকার নামের প্রথম ও দ্বিতীয় অংশ ঠিক এরকমই ছিল। কিন্তু সেটাকে তো আর আঁকড়ে রাখতে পারলাম না। এখন আর তা নিয়ে মিছে আক্ষেপ করে ফায়দা তো কিছু নেই।
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে পারিবারিক নামটাকে কবরস্থ করে সিম্পসন নামটাকে বেছে নিয়েছিলাম।
আমার পৈত্রিক নামটা এবার বলেই ফেলি–ফ্যয়সার্ট। এ-নামটা বলতে গিয়ে আমি ভেতরে ভেতরে যে কী গর্ববোধ করতাম, তা কাউকে বলে বোঝাতে পারব না, শত চেষ্টা করেও না।
তবে এটাও ঠিক যে, আমি সিম্পসন নামটার মাধ্যমেও মনে গর্ব জাগিয়ে তুলতে কম প্রয়াস চালাইনি। ভেতরে ভেতরে সাব্যস্ত করেও ফেলেছিলাম–কোষ্ঠী ঠিকুজী ঘাটাঘাটি করে পূর্বপুরুষের কৌলিন্য কোনোরকমে বের করে ফেলতে পারলেই বাজিমাৎ করে দিতে পারব, ঐতিহ্যের গর্বে বুকটা একেবারে কাণায় কানায় ভরে উঠবে, অহঙ্কারে তখন আর আমার মাটিতে পা ই পড়বে না।
দেখুন কথায় কথায় নামের প্রসঙ্গ যখন উঠেই গেল তখন আর কিছু বলে, কিছু বাদ দিয়ে ফায়দাই বা কি?
