ঘটনাটা এবার চরম পরিণতির দিকে দ্রুত এগিয়ে চলতে লাগল।
সত্যি কথা বলতে কি, যেহেতু বাইরের বিক্ষোভকারী দলটাকে প্রতিরোধ করার জন্য বাজনা-বাদ্যি, হরেকরকম আওয়াজ উদগীরণ আর ককে-ডুল….গান গাওয়া ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হলো না, তাই অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে জানালাটা ভেঙে ফেলল। ব্যস, সবাই মুহূর্তের মধ্যেই হুড়মুড় করে আশ্রমের ভেতরে ঢুকতে আরম্ভ করল। এবারের দৃশ্যটা কোনোদিন একটা মুহূর্তের জন্যও আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে মুছে যাবে না। কিছুতেই না।
ব্যাপার দেখে তো আমি একদম থ বনে গেলাম। আমি বিস্ময়ভরা চোখে হা করে পুরো ব্যাপারটা দেখতে লাগলাম। অভাবনীয় আতঙ্ক আমার বুকের ভেতরে, কলিজাটা যেন আচমকা দরকচরা মেরে গেল। সৈন্য? কেমন সৈন্য তারা? ওরাংওটাং, শিম্পাঞ্জি অথবা উত্তমাসা অন্তরীপের বিশালদেহী ক্রোধোন্মত্ত বেবুন ছাড়া আর কিছু নয়। তারা লাফিয়ে লাফিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় ভয়ঙ্কর হুঙ্কার দিচ্ছে, যা অতীতে কোথাও শোনা তো দূরের ব্যাপার, কল্পনাও করতে পারিনি।
তারা ভেতরে ঢুকে হম্বিতম্বি করতে করতে আমাকেও অন্যান্যদের মতো অনবরত কিল-চড়-লাথি মারতে লাগল। বেদম প্রহার খেয়ে আমি যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুত একটা সোফার তলায় নিজেকে চালান দিয়ে দিলাম। ব্যস, আর কথা নয় মড়ার মতো নিশ্চল-নিথরভাবে পড়ে রইলাম।
সোফার তলায় শুয়ে আমি ফাঁক-ফোকর দিয়ে দেখতে লাগলাম, অসভ্য জানোয়ারগুলো প্রচণ্ড হুঙ্কার দিতে দিতে রীতিমত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, আর যাকেই হাতের কাছে পাচ্ছে দমাদম্ ঘা কতক বসিয়ে দিচ্ছে। সে যে কীরকম দক্ষযজ্ঞ বেঁধে গেল, তা বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার রপ্ত নেই।
এ যেন নাটকের তাণ্ডব-দৃশ্য অভিনীত হচ্ছে। তাণ্ডব-নাচটা মিনিট পনেরো ধরে চলার পরই প্রত্যক্ষ করলাম বিয়োগান্ত নাটকের এক প্রীতিকর পরিণতি।
এ-বিদ্রোহের সর্দারের যে কেরামতির কথা মি. মেলার্ড আমাকে শোনালেন, আমি কিন্তু ধরেই নিলাম সেগুলো তার নিজের দ্বারাই সম্পন্ন হয়েছে।
মি. মেলার্ড নামধারী এ-ভদ্রলোক বছর দু-তিন আগে সত্যি সত্যি এ পাগলাগারদের সুপারিনটেন্ডেন্টের পদে বহাল ছিলেন।
ব্যস, তারপরই একটু-একটু তার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটতে থাকে। অচিরেই তিনি বদ্ধ পাগল বনে যান। এবার তিনি চাকরিটা খুইয়ে এখন রোজই কুঠুরিতে ঢোকেন।
আমার যে সহযাত্রী-বন্ধু পাগলাগারদটার সদর-দরজা পর্যন্ত এসে আমার সঙ্গে তার, মানে মি. মেলার্ডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বিদায় নিয়ে ছিলেন, তিনি তার ব্যাপার-স্যাপার সম্বন্ধে জানতেন না।
দশজন রক্ষীকে কোনোরকমে বাগে এনে প্রথমেই তাদের গায়ে মগে করে নরম আলকাতরা ঢেলে দেওয়া হলো। তারপর চটচটে আলকাতরার ওপর পাখির পালক ছড়িয়ে দিয়ে তাদের জানোয়ারের মতো টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে মাটির তলায় গোপনে বন্দি করে রাখা হলো।
সেখানে তাদের কম করেও এক মাস কয়েদ করে রাখা হয়েছিল। তবে এটাও সত্যি যে, মি. মেলার্ড এ-সময় তাদের প্রচুর পরিমাণে পালক সরবরাহ করেছিল। আর করবেন না-ই বা কেন। কারণ, এটাই তো তার চিকিৎসা পদ্ধতির বিশেষত্ব। আর তদের কিছু কিছু রুচি আর প্রচুর পরিমাণে পানিও সরবরাহ করা হত। আর পানি দেওয়ার উপায়টা? নর্দমা দিয়ে প্রচুর পরিমানে-পানি ঘরের মধ্যে নিয়মিত ঢুকিয়ে দেয়া হত এ-ব্যবস্থাটাকেই তারা মওকা হিসেবে গ্রহণ করে। পানির স্রোতের সঙ্গে ভেসে কয়েদিদের একজন নর্দমা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। ব্যস, কাজ হাসিল করার উপযুক্ত পথ তৈরি হয়ে গেল। নর্দমা দিয়ে পালিয়ে আসা কয়েদিটা এবার অন্যন্যদের অনায়াসেই মুক্ত করে দিল।
এবার নতুন করে পূর্বের প্রচলিত প্রশমণ পদ্ধতিটা আবার আশ্রমে চালু করা হয়। পদ্ধতিটার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করেই এ-রোগীদের ওপর আরোপ করা হলো।
আশ্রমটাকে ঘুরে ঘুরে দেখে ও সবকিছু শুনে আমি মি. মেলার্ডকে সমর্থন না করে পারলাম না যে, তার আরোপিত নিজস্ব পদ্ধতিটাই ছিল পুরোদস্ত তোফা পদ্ধতি।
প্রথম পরিচয়ের মুহূর্তে পদ্ধতিটা সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি নিজেই বলেছিলেন–পদ্ধতিটা খুবই সহজ-সরল। ঝামেলা-হাঙ্গামা নেই বলতে কিছুই নেই। যাকে বলে একেবারেই ছিমছাম।
মি. মেলার্ডের বক্তব্যের সঙ্গে আমি মাত্র একটা কথাই জুড়ে দিতে চাচ্ছি। অধ্যাপক ফেদার আর ডাক্তার টারের লেখা বইগুলো সংগ্রহ করার জন্য আমি ইউরোপের সবগুলো লাইব্রেরিতেই ঢু মেরেছি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় একটা বইও আজ অবধি আমার পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তবে এও সত্য যে, আমি কিন্তু হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেইনি।
দ্য স্পেকট্যাকল
প্রেম:
প্রথম দর্শনেই চোখে লেগে গেল?
ব্যস, আর দেরি নয়–প্রেমে মজে গেল! প্রথম চোখে দেখামাত্রই প্রেম?
বেশ কিছু বছর আগে যদি এমন কথা কেউ বলত তবে সঙ্গে সঙ্গে ঠাট্টা রঙ্গ রসিকতার হৈ হুল্লোড় শুরু হয়ে যেত। হাসতে হাসতে কারো দম বন্ধ হয়ে যাবার যোগাড় হত, আবার কেউ বা মাটিতে গড়াগড়ি খেতে আরম্ভ করত।
অনেকেই কিন্তু ব্যাপারটা সম্বন্ধে বিপরীত কথাই বলেন। আসলে ব্যাপারটাকে যারা একটু তলিয়ে দেখার চেষ্টা করে, মাথা খাটায় তারা সত্যি বলে।
