তারপর? আর কী করল?
মাটির তলাকার গুদামে প্রচুর মদের পিপে মজুদ থাকত। হৈ হৈ করে সেগুলোকে বের করে এনে মৌজ করে পান করতে লেগে গেল। মোদ্দা কথা, তারা পরমানন্দে দিন গুজরান করতে লাগল। সত্যি কথা বলতে কি, এখানকার পাগলরা যেন রীতিমত উৎসবে মেতে গেল।
বুঝলাম। এবার চিকিৎসার ব্যাপারটা সম্বন্ধে কিছু বলুন তো। মানে বিদ্রোহীদের সর্দার এখানে কি রকম চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করেছিল?
এতক্ষণ পরে আবার এ-কী প্রশ্ন করছেন মি.! আমি তো বলেছিই, পাগলমাত্রই বোকা হাঁদা এমন তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমার মনের ঠিক ঠিক কথা যদি শুনতে চান তবে আমি বলব, সত্যিকারের চিকিৎসা-পদ্ধতি পুরোপুরি উৎখাত করে দিয়েছিল। আর তার নিজের চিকিৎসা-পদ্ধতি অনেকাংশে ভালো ছিল। চমৎকার! সত্যি চমৎকার! চিকিৎসাপদ্ধতি সহজ সরল-ছিমছাম। কোনোরকম হাঙ্গামা-হুঁজ্জতি নেই। স্বাদুও বটে খুবই চমৎকার।
গৃহকর্তা মি. মিলার্ড আরও কিছু বলতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ আবার নতুন করে হৈ-হট্টগোল একে বারে আগেকার মতোই বহুকণ্ঠের চিল্লচিল্লি শুরু হয়ে যাওয়ায় তার পক্ষে বক্তব্যকে আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না।
হৈ-হট্টগোলটা আগেকার মতো জোরদার হলেও মনে হল, তারা যেন অতি দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।
আমি প্রায় আর্তনাদ করে উঠলাম–পাগল! পাগল! অবশ্যই পাগলারা একজোট হয়ে সব কটা অবরোধ ভেঙে ফেলেছে। তারা ক্ষেপে গিয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বেশি মিইয়ে যেতে দেখলাম, মি. মিলার্ডকে। তিনি চকের মতো। ফ্যাকাশে মুখে বললেন–মঁসিয়ে, সে আশঙ্কা আমার মধ্যেও ভর করেছে! পাগলারা দারুণভাবে ক্ষেপে না উঠলে তো এমনটা কিছুতেই ঘটতে পারে না।
তার কথা শেষ হবার আগেই একেবারে জানালার তলা থেকে ভয়ঙ্কর বুক কাঁপানো তর্জন গর্জন ভেসে এলো। ঠিক সে মুহূর্তেই বুঝতে পারলাম, বাইরের কিছু ক্রোধোন্মত্ত লোক ভেতরে ঢুকে আসার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইয়া বড় হাতুড়ি দিয়ে দরজার গায়ে দমাদম আঘাত হানছে। আর জনা কয়েক শরীরের সবটুকু শক্তি নিঙড়ে জানালার শার্সি ধরে নাড়ানাড়ি–ঠেলা ধাক্কা দিয়ে চলেছে। সে যে কী উত্তেজনা, তা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না।
ব্যস, মুহূর্তের মধ্যে হৈ-হট্টগোল তুঙ্গে উঠে গেল। বিক্ষুব্ধরা সবকিছু ধ্বংস করে দেবার জন্য যেন উঠে পড়ে লেগে গেছে।
আমি ঘাড় ঘুরিয়েই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়লাম। আমাকে যাপরপরনাই অবাক করে দিয়ে মেলার্ড পাশের আলমারিটার পিছনে নিজেকে খুঁজে দিয়ে অনবরত ঠক্ঠক্ করে কেঁপে চলেছেন।
মি. এরকম আকস্মিক আচরণে আমি কেন অবাক হলাম, তাই না। কারণ, আমি তার কাছ থেকে অনেক, অনেক বেশি দৃঢ়তাই প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে বিপরীত আচরণ প্রত্যক্ষ করলে অবাক হবার কথাই তো বটে।
এদিকে আর একটা অত্যাশ্চর্য দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে আমি একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। ব্যাপারটা হচ্ছে, বাদ্যকররা গত পনেরো মিনিট ধরে নেশায় বুঁদ হয়ে এলিয়ে পড়েছিল। বাহ্যিক জ্ঞান তিলমাত্রও তাদের ছিল না। আকস্মিকতার হৈ-হট্টগোল তাদের নেশা পুরোপুরি ছুটে যাওয়ায় তারা হুড়মুড় করে সোজাভাবে বসেই নিজের নিজের বাদ্যযন্ত্র হাতে নিয়ে একই সুরে ইয়াংকি ডুডুল বাজাতে শুরু করে দিল। তারা সুর-তাল মাফিক বাজনা না বাজালেও মাত্রাতিরিক্ত প্রচেষ্টা যে চালিয়ে যাচ্ছে, এতে কিছুমাত্রও দ্বিধা নেই।
এতক্ষণ যে ভদ্রলোককে অনেক কষ্টে লাফালাফি থেকে বিরত রাখা হয়েছিল, তিনি এখন তড়া করে এক লাপ দিয়ে মদের বোতল-গ্লাস আর খাবার দাবার সাজানো টেবিলের ওপর উঠে পড়ল। তিনি কিন্তু কোনোরকম উত্তেজনা প্রকাশ না করে ধীর-স্থিরভাবেই লম্বা একটা ভাষণ দিয়ে ফেললেন, যা কারোই কান অবধি পৌঁছল না।
ভাষণরত লোকটা শান্ত হতে না হতেই যে লোকটার লাটুর মতো চক্কর মারা স্বভাব তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘরময় অনবরত চক্কর মেরে চলেছে। শুধুই কি চক্কর মারা? হাত দুটো মাথার ওপর তুলে এমন অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গিও করতে লাগল যা হাসির উদ্রেকই কেবল করল না, তার ধারে কাছে যারা ছিল তারা প্রচণ্ড ধাক্কার চোট সামলাতে না পেরে দুম দুম করে যে যেদিকে পারল ছিটকে পড়ে কাতরাতে শুরু করল।
পর মুহূর্তেই ওদিকে শ্যাম্পেনের হু-হুঁস্ ফুসফুস শব্দ শুনে অতর্কিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। অনুসন্ধিৎসু নজরে লক্ষ্য করে প্রকৃত ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। কিছুক্ষণ আগে যে লোকটা খাবার শুরু হবার পরপরই মদের বোতলের ছিপি খোলার ব্যাপারটার অনুকরণ করে অনবরত তার মুখ না। দিয়ে উপরোক্ত শব্দ সৃষ্টি করে চলেছে।
এবার অধিকতর বিস্ময়ের সঙ্গে আমি কামরাটার চারদিকে অনুসন্ধিৎসু চোখের মণি দুটোকে ঘোরাতে লাগলাম। এক অবাঞ্ছিত কণ্ঠস্বর–গাধার ডাক, ঘরের বাজনা আর চিৎকার চাচামেচিকে ছাপিয়ে ঘরময় ঘুরে বেড়াতে লাগল। অনবরত গাধার ডাক চলতেই লাগল।
আবার আমার বেচারি বৃদ্ধা বন্ধু মাদাম জয়েয়ুসের পরিস্থিতি? সত্যি তার দুঃখে আমার বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে লাগল। বাস্তবিক তিনি খুবই মুষড়ে পড়েছেন। চকের মতো ফ্যাকাশে বিবর্ণ মুখে তিনি ঘরের কোণের জ্বলন্ত চুল্লিটার গায়ে দাঁড়িয়ে গলা ছেড়ে অনবরত কএ ডু… গানটা গেয়েই চলেছেন। এ-যেন বাস্তবিকই এক বিষণ্ণতার প্রতিমূর্তি।
