মি. মেলার্ডের কানের কাছে মুখটাকে এগিয়ে নিয়ে আমি গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলাম–মি. মেলার্ড, একটু আগে আপনার মুখে প্রশমণ পদ্ধতির বিপদের কথা শুনছিলাম। সেটা কেমন অনুগ্রহ করে বলবেন কী?
হ্যাঁ, তা বলেছিলাম, সত্য। যাক, যে কথা বলছিলাম, প্রশমণ পদ্ধতিতে প্রায়ই বেশ বড় রকমের সমস্যা, মানে বিপদের সম্মুখীন হতে হত। দেখুন, পাগলের পাগলামি তো কোনো সীমারেখা মানে না আর তা কোথাও লিখে রাখাও হয় না। অতএব আমি বলব, বিখ্যাত অধ্যাপক ফেদার এবং ডাক্তার টার-এর মতেও কিন্তু বিকৃত মস্তিষ্ক ব্যক্তিদের বিনা পাহারায় স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দেওয়া মোটেই নিরাপদ নয়। তখনকার মতো কোনো একটা পাগলকে সাময়িকভাবে প্রশমিত করা সম্ভব হলেও শেষপর্যন্ত কিন্তু সে ভীষণ গোলমেলে হয়ে দাঁড়ায়। তার চালাকি তো অন্তহীন। সে সাধারণত সুস্থতার ভান করতে থাকে। আসলে কিন্তু আদৌ তা নয়। অতএব কোন একজন বিকৃত মস্তিষ্ক লোককে যখন সম্পূর্ণ সুস্থ-স্বাভাবিক মনে হয়, তখনই কিন্তু তাকে ঘরে বন্দি করে ফেলা দরকার।
ভালো কথা, এবার অনুগ্রহ করে বলুন তো, এ-আশ্রমটা পরিচালনা করতে গিয়ে আপনার লব্ধ অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে বলুন, একটা পাগলকে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দিয়ে সমস্যায় পড়েছেন এমন কোন বাস্তব ঘটনা কি ঘটেছে বলে আপনার মনে পড়ছে?
এখানকার বাস্তব অভিজ্ঞতা? এ কী কথা বলছেন। আমি তো বলবই, সমস্যার, মানে বিপদের সম্মুখিন অবশ্যই হতে হয়েছিল। মনে করুন, খুব বেশি দিন আগের ব্যাপার নয়, বিশেষ একটা ঘটনা এ-আশ্রমেই ঘটেছিল যা অবশ্যই মনে গেঁথে থাকার মতো। আপনার তো ভালোই জানা আছে যে, এখানে যখন প্রশমন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হত তখন এখানকার সব পাগলকেই ছেড়ে রাখা, মানে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দেয়া হত। হঠাৎ এক সকালে অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটতে দেখা গেল।
অবিশ্বাস্য ঘটনা? ঘটনাটা কী, জানতে পারি কী?
ঘটনাটা হচ্ছে, এক সকালে দেখা গেল, আশ্রমের সব রক্ষীকেই পিঠমোড়া করে বাঁধা অবস্থায় পাগলদের থাকার কামরাগুলোর মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছে। ব্যাপার এমন দাঁড়াল যে, রক্ষীরাই যেন পাগল। আর এমন অদ্ভুত কাণ্ডটা করে পাগলরাই রক্ষী বনে তাদের জায়গা দখল করেছে। কাণ্ডটা একবার মন দিয়ে ভেবে দেখুন তো মি.।
এ কী অদ্ভুত কথা শোনাচ্ছেন মি. মেলার্ড! এমনতর অদ্ভুত অবিশ্বাস্য কাণ্ডের কথা তো এর আগে কোনোদিন শুনিনি মি.! এমন কথা ভাবতেও যে আমি উৎসাহ পাচ্ছি নে!
আসলে কিন্তু পুরো ব্যাপারটা এক বুদ্ধিভ্রষ্ট পাগলের কাজ। যে করেই হোক তার মাথায় পোকা ঢুকল, সে এমন এক শাসন-ব্যবস্থার আবিষ্কারক যা ইতিপূর্বে কোথাও কোনোদিন কেউ-ই শোনেনি। হয়তো তার মাথায় মতলবটা ঢুকেছিল নিজের আবিষ্কৃত শাসন-ব্যবস্থাটাকে একবার পরীক্ষা করে দেখবে।
তাই নাকি?
ব্যবস্থাটাকে পরীক্ষা করে দেখার ইচ্ছাটাকে ফলপ্রসু করার আগেই সে বর্তমান শাসন-ব্যবস্থাকে বন্ধ করার ষড়যন্ত্রে যোগদানের জন্য সে আশ্রমের সব রোগীকে বলে কয়ে রাজি করায়। আর তার ষড়যন্ত্রের শিকার হলো আশ্রমের পাহারাদাররা।
তবে সে ষড়যন্ত্রটাকে পরিপূর্ণ সার্থক করে তোলে, এই তো?
অবশ্যই। এতে কিছুমাত্র সন্দেহের অবকাশ আছে কি, বলুন তো?
হুম! অচিরেই।
কার্যত, অচিরেই দেখা গেল, পাগল আর রক্ষী উভয় দলই স্থান পরিবর্তন করে নিল। তবে সম্পূর্ণরূপে বলা যাবে না।
কারণ কী?
কারণ হচ্ছে, পাগলগুলো ছাড়া পেয়ে গেল, আর তাদের ঘরে রক্ষীরা আটকা পড়ে রইল।
ফল কী হল?
রক্ষীদের অকারণে কঠোরভাবে চিকিৎসা করা আরম্ভ হয়ে গেল। কী অদ্ভুত কাণ্ড, বলুন তো?
আমার কিন্তু বিশ্বাস, অনতিবিলম্বে পাল্টা বিপ্লব আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। এরকম উদ্ভট ব্যবস্থা তো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। প্রতিবেশি অঞ্চলের মানুষ, যারা আশ্রম দেখতে আসে, তাদের মধ্যে ব্যাপারটা চাউর হয়ে গেলে তারা অবশ্যই তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে দিয়েছিল, আর এটা খুবই স্বাভাবিক।
ঠিক এ-জায়গাটাতেই আপনি ভুল করে বসলেন। বিদ্রোহের সর্দারটা ছিল খুবই ধূর্ত। সে ও-পথই মাড়াল না। আশ্রম দেখার জন্য বাইরের লোকজনের ভেতরে ঢোকা সে পুরোপুরি বন্ধ করে দিল। একদিন এক বিপত্তি ঘটল। নিয়মটা ভাঙা হলো।
নিয়মটা ভাঙা হলো বলতে আপনি কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছেন, মি. মিলার্ড?
ব্যাপারটা তবে খোলসা করেই বলছি–একদিন ভদ্র চেহারারও সজ্জিত পোশাক পরিহিত এক বোকা হদ্দ যুবক আশ্রমের সদর দরজায় এলো। তার ভাবগতিক দেখে মনে হলো তার কাছ থেকে ভয়ের কোনো আশঙ্কাই নেই। এরকম ভেবে সে আগন্তুক যুবককে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিয়ে দিল। আসলে একঘেয়েমির হাত থেকে অব্যাহতি পাবার জন্যেই এ-কাজটা করা হয়। ভাবল যুবকটাকে নিয়ে একটু আধটু হাসি-মস্করা করে মনটাকে একটু চাঙা করে নেয়া যাবে। তারপর করলও তা-ই। তাকে নিয়ে চুটিয়ে মজা করে শেষমেশ তাকে আশ্রম থেকে ঘাড় ধরে তাড়িয়ে দেওয়া হলো।
আচ্ছা, বলুন তো, এখানে পাগলের জমানা কতদিন টিকেছিল?
অনেকদিন চলেছিল। এক মাস তো হবেই। তবে একেবারে সঠিক সময় বলা। মুশকিল।
তারপর?
তারপর পাগলরা বহাল তবিয়তে, মানে পরমানন্দে দিনাতিপাত করতে আরম্ভ করল। তারা সবচেয়ে লক্ষণীয় কাজ করল, নিজেদের ছেঁড়া ও নোংরা পোশাক রেখে দিয়ে আমাদের পরিবারের লোকজনদের পরিবারের পোশাক পরিচ্ছদ এবং অলঙ্কারাদি পড়ে মনের শখ মেটাতে লাগল।
