গৃহকর্তা মি. মেলার্ড রেগে একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠে বললেন–ওটা হচ্ছে কী শুনি? আপনারা সবাই নিজের নিজের জিভটা টেনে ধরুন।
ব্যস, মিনিটখানেক আর কারো মুখে টু-শব্দটিও নেই। এতবড় কামরাটায় একেবারে কবরখানার নীরবতা নেমে এলো।
একজন মহিলাই কেবল গৃহকর্তা মেলার্ডের হুকুম অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেন। তিনি ইয়া লম্বা জিভটাকে বের করে হাতদিয়ে শক্ত করে চেপে ধরলেন।
আমি মি. মেলার্ডের কানের কাছে মুখ নিয়ে অনুচ্চকণ্ঠে, প্রায় ফিসফিসিয়ে বললাম আর আমাদের যিনি একটু আগেই ক-এ ডুডল্ শোনালেন, তিনি নিশ্চয়ই খুবই নিরীহ নম্র স্বভাব তাই না?
মি. মেলার্ড সবিস্ময়ে আমার কথার জবাব দিলেন নিরীহ, নম্র স্বভাব? কেন? এ-কথা কেন বলছেন মি.।
মানে, ব্যাপারটা হচ্ছে, আঘাতটা খুব অল্পই লেগেছে। মনে করা যেতে পারে তিনি তেমন কিছু আহত হননি।
হায়। এসব কী ভাবছেন আপনি। ধ্যুৎ! এসব চিন্তা-ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে মুছে ফেলে দিন। তিনি আমার দীর্ঘদিনের পরিচিতা। আর মাদাম জয়েসুস সম্পূর্ণ সুস্থ। তিনি আমার মতোই একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ। তবে তার বাতিক যে একটু আধটু আছে, অস্বীকার করা যাবে না। আর আপনার তো আর অজানা নয়। সব বৃদ্ধ মহিলারই কম-বেশি বাতিক থাকেই থাকে।
অবশ্যই অবশ্যই। আর এখানকার অন্যসব ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা সম্বন্ধে আপনার–
আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে মি. মেলার্ড গর্বের সঙ্গে বলে উঠলেন–আমার অভিন্নহৃদয় বন্ধু আর সব বন্ধু, আর সহকারীও বটে।
কী? কী বললেন? সবাই? এখানকার মহিলারা আর সবাই কী–
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই মি. মেলার্ড বলে উঠলেন অবশ্যই। মহিলাদের সাহায্য সহযোগিতা না থাকলে কি আর এ ধরনের কাজকর্ম চলে, আপনিই বলুন? আমি তার কথার কি উত্তর দেব মুহূর্তের মধ্যে গুছিয়ে উঠতে না পেরে মৌনই রইলাম।
মি. মেলার্ড পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে এবার বললেন–আরে বলেন কী মি.। মহিলারই তো পৃথিবীর পাগলের নার্সদের মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি, আর সেরাও বটে।
কিন্তু কেন?
মহিলাদের নিজস্ব যেসব সুবিধা আছে তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, তাদের উজ্জ্বল চোখ দুটো আশ্চর্য কাজ করার ক্ষমতা রাখে, ঠিক যেন সাপের ওপরে কাজ করার ক্ষমতা রাখে, আপনাকে বোঝাতে পেরেছি কী?
অবশ্যই! অবশ্যই! কিন্তু তাদের ব্যাপার স্যাপার যেন একটু কেমন মানে অন্য ধরনের, ঠিক কি না? আমি অদ্ভুত কথাটা ব্যবহার করতে চাইছি আপনি কি স্বীকার করেন না?
কেমন ধরনের? অদ্ভুত? অদ্ভুত? কেন? আপনার এ-রকমটা মনে হওয়ার কারণ জানতে পারি কী? আমরা, মানে দক্ষিণের মানুষরা অন্য অঞ্চলের মতো মোটেই সাবধানী নই। আমরা সব সময় খেয়াল করি বুঝলেন মি.?
চমৎকার! মঁসিয়ে মেলার্ড, এবার বলুন তো, আপনারা যে এখানে প্রশমন পদ্ধতির পরিবর্তে যে পদ্ধতিটা আরোপ করেছেন সেটা কি খুবই কঠোর? মানে প্রশমন। পদ্ধতির চেয়ে–
না, অবশ্যই কঠিন না তবে খুবই সত্য যে, আমাদের আটকে রাখা ব্যাপারটাকে কঠোর বলে স্বীকার না করলে সত্য গোপনই করা হবে। তবে ডাক্তারি চিকিৎসা রোগীরা কিন্তু খুবই পছন্দ করে।
আর একটা কথা আপনার কাছে রাখতে চাচ্ছি, যদি অনুমতি করেন—
এ নতুন পদ্ধতিটার আবিষ্কারক কী আপনি নিজেই?
আংশিক বলতে পারেন, সম্পূর্ণটা অবশ্যই নয়।
অবশিষ্ট অংশ।
অবশিষ্টাংশের আবিষ্কারক অধ্যাপক টার্থার। আশা করি তার কথা আপনার অবশ্যই জানা আছে? আমাকে নীরব দেখে তিনিই এবার বললেন–এ ছাড়া আমার পরিকল্পনার অংশবিশেষ সংশোধন করে নেয়া হয়েছে। আমি আনন্দের সঙ্গে স্বীকার করছি, প্রখ্যাত ফেদার যেগুলো করেছেন আর তার সঙ্গে তো আপনার ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে, ঠিক কি না?
দেখুন মি. মেলার্ড, খুবই লজ্জার সঙ্গে স্বীকার করে নিচ্ছি, আপনার উল্লেখিত ভদ্রলোক দুজনের মধ্যে কারো সঙ্গেই আমার পরিচয় তো নেই, এমন তাদের নামও কোনোদিন শুনিনি। অবাক হলেন?
গৃহকর্তা মি, মেলার্ড তড়াক করে লাফিয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। দু বাহু উধ্বে তুলে প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন–হায় ভগবান! আমি নিশ্চয়ই এ কথাটা ঠিক ঠিকভাবে আমার কানে ঢোকেনি, শুনিনি। ভাই আপনি তো নিশ্চয় এ-কথা বলেননি, আপনি বিখ্যাত অধ্যাপক ফেদার আর ডাক্তারটার নামও কোনোদিন শোনেন, ঠিক কি না?
আমি তার কথার জবাব দিতে গিয়ে বললাম–দেখুন ভাই মেলার্ড, আমার অজ্ঞতাকে আমি স্বীকার না করে পারছি না। কিন্তু সত্য তো সবার শীর্ষে অবস্থান করছে তাই না? সত্যকে জিইয়ে রাখা অবশ্য কর্তব্য। তা সত্ত্বেও দুজন অনন্য ব্যক্তিত্বের কার্যকলাপের সঙ্গে আমার পরিচয় না থাকার জন্য লজ্জায় এতটুকু হয়ে যাচ্ছি। অন্তরে আগ্রহ পোষণ করছি, যত শীঘ্র সম্ভব তাদের লেখা অমূল্য গ্রন্থগুলো সংগ্রহ করে আমার অজ্ঞতাকে দূর করতে যে সাধ্যমত প্রয়াসী হব, এতে কিছুমাত্র দ্বিধা নেই।
হুম!
মি. মেলার্ড, আমাকে স্বীকার করতেই হবে, আপনার প্রশ্নে আমি যারপরনাই লজ্জিত হয়েছি। এবার আমরা পানীয়ের মাধ্যমে সতেজ হয়ে নেয়ার জন্য শ্যাম্পেনের গ্লাস হাতে তুলে নিলাম। আমাদের দেখাদেখি উপস্থিত অন্যানরাও মদের গ্লাসে চুমুক দেয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
ভাই মেলার্ড আর আমি দুজন দুবোতল মদ সামনে নিয়ে গলা ছেড়ে আলোচনা চালাতে লাগলাম। ঘরের অন্যান্যরা কিন্তু মদের গ্লাস হাতে নিয়ে এমন হৈ-হট্টগোল শুরু করে দিল যে, আমরা কেউ-ই কারো কথা শুনতে পাচ্ছি না।
