ভদ্রলোক একেবারে চুপসে গেল। বৃদ্ধার ধমক ধামক খেয়ে আর টু-শব্দটাও করতে পারল না।
বৃদ্ধা পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে এবার বললেন–তবে মাদাম জয়েয়ুস-এরও একটা বিদঘুঁটে ধারণা ছিল, সহজবোধ্য, ছিল সেটা। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, একটা দুর্ঘটনায় তিনি একটা মোরগ ছানায় পরিণত হয়ে গেছেন। কিন্তু তার আচার আচরণে সামঞ্জস্যের ঘাটতি ছিল না। এবার হাত দুটো শরীরের দুদিকে ডানার মতো সোজাভাবে ছড়িয়ে দিয়ে বললেন–তিনি এভাবে অনবরত ডানা ঝটপটানির মতো হাত দুটোকে অনবরত নাড়িয়েই যেতেন। তার মুখে বার বার কুকুরকু-কুকুরকু আওয়াজ করতেন।
আমি লক্ষ্য করছি, গৃহকর্তা যেন রাগে ফুঁসছেন। এবার দপ করে জ্বলে উঠে তিনি বললেন–মাদাম, আপনি নিজের আচরণ শুধরে নিলেই আমি আনন্দিত হব। আপনাকে একজন মহিলার মতো স্বাভাবিক আচরণ করতে হবে। তা যদি না করেন তবে আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে যেতে বাধ্য হব, বলে দিচ্ছি–এবার আপনি যা ভালো। বোঝেন করুন।
এমন বয়স্কা এক মহিলাকে মাদাম সম্বোধন করায় আমি খুবই বিস্মিত হলাম।
যা-ই হোক, গৃহকর্তা মঁসিয়ে মেলার্ডের বক্তব্যে তার মুখটা টকটকে লাল হয়ে। উঠল। শরীরের সবটুকু রক্ত যেন তার মুখে এসে ভর করেছে। বুঝতে দেরি হলো না, তিনি খুবই মর্মাহত হয়েছেন। তিনি মুখ গোমড়া করে মেঝের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বসে রইলেন।
আমাদের পূর্ব পরিচিতা সেই রূপসি তন্বী যুবতিটা এবার আলোচনার সূত্রটি ধরে বলে উঠলেন–উফ! মাদাম জয়েয়ুস একটা বোকার হদ্দ বোকা! আমি ইউজেনি সালসাফেওর কথা কিছু শোনাতে চাই। তার কথাবার্তার মধ্যে সারপদার্থ বলে কিছু থাকত। সে একজন যথার্থই রূপসি–রূপ-সৌন্দর্যের আকর ছিল। আর সে ছিল মাত্রাতিরিক্ত বিনয়ী এক তম্বী যুবতি। আমরা যে পোশাক পরিচ্ছদ ব্যবহার করি তা খুবই অশোভন, ভদ্র সমাজে অচল। তাই সে সব সময় এমন পোশাক পরিচ্ছদ পড়তে উৎসাহি ছিল যাতে নিজেকে পোশাকের বাইরে রাখতে পারে। আরে, কাজটা তো অনায়াসেই করা যেতে পারে। ধরুন না কেন প্রথম এভাবে, তারপর এভাবে–এভাবে আর এভাবে ব্যস।
একডজন গলা একই সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল–হায় ভগবান! মাদামায়ে সালসাফেও! এ আপনি করছেন কী! করছেন কী! খুব হয়েছে আর নয়! এবার থামুন, থামুন! আপনার বক্তব্য আমরা সবাই বুঝতে পেরেছি। এবার থামুন! আর দরকার নেই।
কথাগুলো চলাকালীনই জনকয়েক লোক চেয়ার ছেড়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে। মদময় জেল সালসাফেও মেডিসি ভেনাম মূর্তির রূপ ধারণ করার আগেই তাকে মাঝ পথে থামিয়ে দিল।
অন্য দিকে বহুকণ্ঠের আর্তনাদে কামরাটা যেন রীতিমত নরকের দক্ষিণ দুয়ারে পরিণত হয়ে গেল।
চারদিকে এমন ভয়ঙ্কর হৈ-হট্টগোল, আমার স্নায়ুর ওপর এতই চাপ পড়ল, যা সহ্য করা আমার পক্ষে রীতিমত কষ্টকর হয়ে উঠল। আমি নিজের কথা না ভেবে অন্য সবার কথা ভাবতে গিয়ে করুণায় অস্থির হয়ে পড়লাম।
সত্যি কথা বলতে কি, এক সঙ্গে এতগুলো সুবিবেচক মানুষের এমন করে ভয়ে মুষড়ে পড়ার দৃশ্য ইতিপূর্বে কোনোদিনই আমার চোখে পড়েনি।
আমি কামরাটার চারদিকে মুহূর্তের জন্য চোখ বুলিয়ে নিয়ে লক্ষ্য করলাম, সবার মুখই চকের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আতঙ্কে সবাই এমন মিইয়ে গেছে যে অনবরত থর থর করে কেঁপেই চলেছে।
ক্রমে চিৎকার চাঁচামেচি বন্ধ হতে হতে এক সময় একেবারে থেমে গেল। সবার মুখে আবার আগেকার স্বাভাবিকতা ফিরে এলো।
এবার আমি মনে সাহস সঞ্চয় করে আকস্মিক হৈ-হট্টগোলের কারণ কি জানতে চাইলাম। আমার মনের অবস্থাও অল্প-বিস্তর প্রকাশ করতে বাদ দিলাম না।
আমার মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে মি. মেলার্ড বললেন–মনে করতে পারেন এটা একটা বাগাটেলি খেলা ছাড়া আর কিছুই নয় না। দেখুন মি., এসব ব্যাপার আমাদের গা-সহা হয়ে গেছে। এখন আর এসব নিয়ে মোটেই ভাবি না। এখানকার পাগলগুলো প্রায়ই একাট্টা হয়ে এ রকম হামলা-হুঁজ্জতি করে থাকে। রাতে রাস্তার কুকুরগুলোর ডাকের মতোই একজন আর একজন ক্ষেপা।
মুহূর্তের জন্য থেমে আমার মানসিক অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করে তিনি আবার মুখ খুললেন–দেখুন মি., তবে মাঝে-মধ্যে কনসার্টের মতো চিল্কারের পর সবার মধ্যে এখান থেকে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা জেগে ওঠে। কিন্তু তখন যে কিছু কিছু বিপদের আশঙ্কা দেখা দেয় না তাও বলা যায় না।
আমি নিজেকে একটু সামলে সুমলে নিয়ে বললাম–মি. মেলার্ড, এখানে আপনার তত্ত্বাবধানে কজন আছে, অনুগ্রহ করে বলবেন কী?
এখন দশজনের বেশি নয়।
অধিকাংশই হয়তো মহিলা, তাই না?
আরে না। সবাই পুরুষ। আর শক্ত সাবুতও বটে।
হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। আমার ভালোই জানা ছিল যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়েদেরই মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে।
হ্যাঁ, কথাটা আংশিক সত্য বটে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আপনার কথাই খাটে সত্য। কিন্তু সব সময় নয়। কিছুদিন আগে এখানে সাতাশটা রোগী ভর্তি ছিল। সাতাশটার মধ্যে আঠারো জনই মহিলা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি যে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে তা তো নিজের চোখেই দেখছেন, কী বলেন?
হ্যাঁ, তা অবশ্য দেখতে পাচ্ছি।
মাদামোয়াজেলকে যে ভদ্রলোক লাথি দিয়েছিলেন সে ভদ্রলোক হঠাৎ আগবাড়িয়ে বলে উঠলেন–ঠিকই তো, নিজের চোখেই তো দেখতে পাচ্ছেন মি.।
তার কথা শেষ হতে-না-হতেই উপস্থিত সবাই সমস্বরে বলে উঠল–শতকরা একশো ভাগই সত্যি। নিজের চোখেই তো দেখছেন।
