না, এত সহজে হার মানার পাত্র আমি নই। আমাকে এগিয়ে যেতেই হবে, দেখতে হবে এ পথের শেষ কোথায়।
আমি পথ হাতড়ে হাতড়ে কোনোরকমে ধীর-পায়ে পথ পাড়ি দিতে লাগলাম। ঠিক তখনই আমি একটা অভাবনীয়, একেবারেই অবর্ণনীয় অস্বস্তির শিকার হয়ে পড়লাম। কোন্ অসতর্ক মুহূর্তে যে আমার পা দুটো থেমে গেছে বলতে পারব না।
অস্বস্তি! হ্যাঁ, অবর্ণনীয় অস্বস্তিই বটে। এক অভাবনীয় স্নায়ুবিক দ্বিধা আমার মধ্যে ভর করল। এক অভাবনীয় কম্পনও অনুভব করতে লাগলাম। একেই বুঝি বলে, অনিশ্চিত বিপাশঙ্কায় কুঁকড়ে যাওয়া।
.
হায়! এ কী মহাসঙ্কটে পড়ে গেলাম। আতঙ্কে বুকের ভেতরে রীতিমত ঢিবঢিবানি শুরু হয়ে গেল। পা ফেলতেও ভরসা হচ্ছে না, ভয় হচ্ছে, পা ফসকে যদি কোনো গভীর ফাঁদে পড়ে যাই তবে মৃত্যুর নিশ্চিত শিকার হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না।
কুয়াশার চাদর গায়ে চাপিয়ে, ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে পথের মাঝে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কর্তব্য নির্ধারণে মগ্ন হলাম। সে অবস্থানকালে কতসব অদ্ভুত গল্প-কথা যে মনের কোণে উঁকি দিতে লাগল তা বলে শেষ করা যাবে না। এখানকার পাহাড়ের গুহা আর বনজঙ্গলে নাকি বিচিত্র আর খুবই হিংস্র প্রকৃতির মানুষ বাস করে। তারা সুযোগের সন্ধানে এখানে ওখানে ওৎ পেতে বসে থাকে। মওকা বুঝে অতর্কিতে পথচারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ব্যস, তারপরের কথা না-ই বা বললাম।
একের পর এক, হাজার হাজার অদ্ভুত কল্পনা আমার মধ্যে ভর করল। আমার মন-প্রাণ সে সব কাল্পনিক বিপদাশঙ্কায় অবশ হয়ে পড়তে লাগল। তবে এও স্বীকার না করে উপায় নেই, আবছা বলেই সেগুলো আমার মধ্যে আরও বেশি করে প্রভাব। বিস্তার করেছে, আরও–বেশি আতঙ্ক সঞ্চার করেছে।
আমি যখন কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশে, অন্ধকার পথের মাঝে দাঁড়িয়ে কর্তব্য স্থির করতে ব্যস্ত ঠিক তখনই মাদলের বাদ্য বাতাস বাহিত হয়ে আমার কানে এসে লাগল। আওয়াজটা খুব জোরোলোই শোনাল। মনে হল, কাছেই কে বা কারা জোরে জোরে। মাদল বাজাচ্ছে।
আমি উকর্ণ হয়ে সে আওয়াজটা শুনলাম। নিঃসন্দেহ হলাম, মাদলই বটে।
ব্যস, মুহূর্তে আমার বিস্ময় তুঙ্গে উঠে গেল। মুহূর্তের জন্য হলেও আমার সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। বিস্ময় বিমূঢ় অবস্থায় আমি ভাবতে লাগলাম, এখানকার পর্বত আর পার্বত্য বনাঞ্চলের মানুষ তো কোনোদিন মাদল দেখেছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে? এখানে কে বা কারা মাদল বাজাচ্ছে। এ কী অদ্ভুত কাণ্ডরে বাবা!
।মাদলের বাদ্য না শুনে আমি যদি শ্রেষ্ঠ দেবদূতের বাঁশির সুর শুনতে পেতাম তবুও হয়তো বা বিস্ময়ে এমন হতবাক হয়ে পড়তাম না। আমি যখন মাদলের বাদ্যের রহস্য ভেদ করতে ব্যস্ত ঠিক সে মুহূর্তেই আমার বিস্ময়, আগ্রহ, বিহ্বলতার মধ্যে আরও অদ্ভুত, একেরারেই অবিশ্বাস্য একটা কারণ আমার সামনে দেখা দিল। আচমকা একটা শব্দ আমার কানে এলো। মনে হল, আমার কাছে, একেবারে হাতের নাগালের মধ্যে অবস্থানরত কেউ একজন একটা চাবির গোছা হাতে নিয়ে ঘন ঘন নাচিয়ে চরেছে। আগের বারের মতোই উকর্ণ হয়ে ব্যাপারটা লক্ষ্য করলাম। হ্যাঁ, চাবির ‘গাছার শব্দ ছাড়া অন্য কিছুই হতে পারে না।
আরে বাবা। আমি সচকিত হয়ে মুহূর্তের মধ্যে এক লাফে দুপা পিছিয়ে গেলাম। বুকের মধ্যে ধড়ফড়ানি শুরু হয়ে গেল। নাড়ির গতি হয়ে পড়ল দ্রুততর।
পরমুহূর্তেই এক দীর্ঘাকৃতি কালো অর্ধনগ্ন মানুষ বিকট স্বরে আর্তনাদ করতে করতে আমার পাশ দিয়ে ধরতে গেলে প্রায় গা-ঘেঁষে উদ্ধশ্বাসে ছুটতে ছুটতে চলে গেল। সে আমার এত কাছ দিয়ে দৌড়ে গেল যে আমার মুখে তার গরম নিশ্বাস পর্যন্ত স্পষ্ট অনুভব করলাম। অজানা-অচেনা জায়গায়, জমাটবাধা অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে এমন অভাবনীয় একটা দৃশ্যের মুখোমুখি হলে এমন কোন্ বীরপুরুষ আছে যে নিজেকে স্থির রাখতে পারে? সত্য গোপন না করলে, বলতেই হয় সে মুহূর্তে আকস্মিক আতঙ্কে আমি রীতিমত মুষড়ে পড়েছিলাম। পরিস্থিতি খারাপ অনুমান করে আমি যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুততার সঙ্গে সাধ্যমত পথের একধারে সরে গেলাম। আমার হাঁটু দুটো অজানা বিপদাশঙ্কায় থর থর করে কাঁপতে লাগল।
ভয়ালদর্শন লোকটার হাতে নোঙরেরর মতো ইস্পাতের একটা যন্ত্র অনেকগুলো ইস্পাতের আংটা একত্রিত করে যন্ত্রটা তৈরি করা হয়েছে।
লোকটা আমাকে অতিক্রম করে যেতে না যেতেই প্রকাণ্ড একটা জন্তুকে তার দিকে ধেয়ে যেতে দেখলাম।
অনুসন্ধিৎসু নজরে ভয়ঙ্কর সে জন্তুটার দিকে তাকিয়ে খুবই আবছা আলোয় মনে হলো সেটা অতিকায় একটা হায়না। প্রচণ্ড আক্রোশে সেটা অনবরত তীব্র গর্জন করে চলেছে। গর্জন করার ফাঁকে ফাঁকে ইয়া বড় হাঁ করছে। চোখ দুটো জ্বল জ্বল করছে।
এবার ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। লোকটা কেন তার হাতের ইস্পাতের আংটার মতো যন্ত্রটাকে বার বার এদিক-ওদিক দোলাতে দোলাতে ছুটে চলেছে। হায়না। ক্ষুধার্ত হায়না।
ক্ষুধার্ত রাক্ষসটাকে দেখার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত আতঙ্কে, অনিশ্চিত বিপদামঙ্কায় আমার বুকের ভেতরে ধড়ফড়ানি শুরু হয়ে গিয়েছিল। অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু অতিকায় হিংস্র জন্তুটাকে দেখামাত্র আমার আতঙ্ক বেড়ে না গিয়ে বরং দ্রুত কমে গিয়ে স্বাভাবিকতা ফিরে পেতে লাগলাম।
