পাশ থেকে একজন মন্তব্য করে উঠলেন আরে, ওটা তো একটা নিরেট আহাম্মক, মুখের শিরোমণি ছিল। আমি এমন একজনের কথা বলছি, তার জুড়ি খুঁজে পাবেন না। সে নিজেকে এক বোতল শ্যাম্পেন মনে করত। আর পথ চলার সময় হরদম হু হুস্ ফুস্ ফুস্ আওয়াজ করত। কী বিশ্রি ব্যাপার বলুন দেখি।
কথা বলতে বলতে লোকটা তার বাঁ দিককার গালের ওপর ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা রেখে মুখ দিয়ে বোতলের ছিপি খোলার মতো আওয়াজ করে আঙুলটাকে দুম্ করে তুলে নিলেন। এর পর মুহূর্তেই জিভটাকে দাঁতের ওপর ঘষতে ঘষতে এমন অদ্ভুত দক্ষতার সঙ্গে শ্যাম্পেনের বোতলের মুখ দিয়ে ফেণা বেরিয়ে আসার ভঙ্গি নকল করে, মিনিট কয়েক ধরে অনবরত হুস হুস ফুসফুস আওয়াজ করতে আরম্ভ করলেন।
আমার নিশ্চিত ধারণা, লোকটার এরকম ব্যবহারে মি. মেলার্ডের মোটেই মনপুত নয়। তবে তিনি মুখে কিছুই প্রকাশ করলেন না।
এবার মাথায় ইয়া লম্বা পরচুলা চাপানো একটা বেটেখাট শুকনো লোক মুখ খুললেন–আর এক আহাম্মক এখানে থাকত, যে লোকটা নিজেকে একটা ব্যাঙ মনে করত। তবে এও সত্য যে, সে অবিকল ব্যাঙের মতোই দেখতে ছিল। ইস্! মি. তাকে যদি একবারটি চোখে দেখতে পেতেন, তবে আপনি নির্ঘাৎ অবাক তো হতেনই চোখ দুটো রীতিমত ছানাবড়া হয়ে যেত।
আমার মুখের দিকে তাকিয়ে এবার বলল–মি., সে লোকটা যে প্রকৃতই ব্যাঙ সেটা বড়ই পরিতাপের ব্যাপার। সে থেকে থেকে ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙর আওয়াজ করে ডাকাকাকি করত। আর বললে বিশ্বাস করবেন না ভাই, লোকটা যখন দু-এক বোতল মদ সামনে রেখে টেবিলের ওপর দু-কনুইয়ে ভর দিয়ে বসত, মুখটাকে বার বার এভাবে ফাঁক করত। চোখ দুটোকে এভাবে এদিক-ওদিক ঘোরাত, খুবই ব্যস্ততার সঙ্গে মিট মিট করে তাকাত। আমি রীতিমত দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি–তার প্রতিভা আপনাকে তাজ্জব বা নিয়ে দিত! আপনার চোখ ট্যারা হতোই হতো।
আমি সঙ্গে জবাব দিলাম–এ ব্যাপারে আমার এতটুকুও দ্বিধা নেই।
এবার কোন টেবিল থেকে কে যেন বলল–আরও ছিল। পেতিত মেলার্ড নামে এক অদ্ভুত চরিত্রের লোক ছিল। সে নিজেকে এক টিপ্ নস্যি ভাবত। তার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ কি ছিল, জানেন মঁসিয়ে?
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তার দিকে নীরবে তাকালাম। সে এবার বলল–একটা আক্ষেপই তাকে সবচেয়ে বেশি করে মর্মাহত করত, আঙুল দুটোর ফাঁকে সে নিজেকে ধরে রাখতে পারত না।
আরও ছিল। জ্বলেস দেসুলিয়েরেস নামে একজন ছিল। তার মতো প্রতিভাবান সচরাচর দেখা যায় না। সে নিজেকে একটা কুমড়া ভেবে সর্বক্ষণ গুম হয়ে বসে থাকত। সে সর্বদা পাচককে জ্বালিয়ে খেত। বলত–আমাকে টুকরো-টুকরো করে কেটে কড়াইয়ে চাপিয়ে পাকসাক করে ফেল। তার ঘ্যানঘ্যানানিতে বিরক্ত হয়ে পাচক বেচারা তাকে দেখলেই দশ হাত তফাতে চলে যেত।
আমি চোখ-মুখে বিস্ময়ের ছাপ এঁকে বললাম–আপনার কথা শুনে আমি তাজ্জব বনে গেলাম! এও কি কখন হয়, নাকি হতে পারে!
পরমুহূর্তেই ঘাড় ঘুরিয়ে গৃহকর্তার দিকে তাকিয়ে বললাম–মি. মেলার্ড–
আমার দিকে দৃষ্টি না ফিরিয়েই তিনি অট্টহাসিতে একেবারে ফেটে পড়ার জোগাড় হলেন। তারপর বলে উঠলেন–চমৎকার! চমৎকার।
এবার আমাকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন–আপনি কিন্তু মোটেই অবাক হবেন না মি.। আমার এ বন্ধুবর একজন সত্যিকারের রসিক। রসে একদম টইটম্বুর। মনে করতে পারেন, একজন কৃতি ভড়। দয়া করে ওর কথাগুলোকে যেন সত্যি বলে ভেবে বসবেন না।
উপস্থিত ভদ্রলোকদের মধ্য থেকে অন্য আর একজন মুখ খুললেন–বুফে লি এঁদ নামে আর একজন ছিল। তাকে এক অনন্য ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ মনে করা যেতে পারে। ভালোবাসায় মজে যাওয়াই তার একেবারে গড়বড় হয়ে গিয়েছিল। সে ভাবত, তার কাঁধে দুটো মাথা রয়েছে। তার মধ্যে একটা ডেমোস্থিনিস-এর আর দ্বিতীয়টা সিসেরোর মাথা। তার বিশ্বাসটা যে ভ্রান্ত এতে কোনোই সন্দেহ নেই। কিন্তু আজব ব্যাপার হচ্ছে, সে আপনার মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন করে তবেই রেহাই দিত যে, তার ধারণাটাই অভ্রান্ত।
আমি সিবস্ময়ে তার মুখের দিকে তাকালাম।
সে বলে চলল–আরে ঠিক তা-ই। আসলে সে যে একজন জবরদস্ত বক্তা ছিল। ধরুন, ভাষণ দিতে দিচ্ছে সে, একসময় তড়াক করে লাফিয়ে একেবারে খাবার টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ত। আরও আছে–
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে তার পাশের বন্ধুটা তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কি যেন বলল। তারপরই সে আর একটা কথাও না বলে দুম্ করে নিজের চেয়ারটায় বসে পড়ল।
সে বসার পর তার পাশের বন্ধুটা এবার যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুত খাড়াভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে বেশ জোর গলায়ই বক্তব্য রাখতে লাগল–বুলার্ড নামে আর একজন জাদরেল লোক ছিল। তাকে একটা লাটু মনে করতে পারেন।
লাট্টু বলার যুক্তিটা জানার কৌতূহল দমন করতে না পেরে আমি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকলাম।
আমার কৌতূহলের গভীরতাটুকু অনুমান করতে পেরে বক্তা এবার বলল–তার ঘোরার প্রক্রিয়াটা দেখলে হাসতে হাসতে আপনার পেটে খিল ধরে যেত। লোকটা একটা গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে অদ্ভুত কায়দায় এক ঘণ্টা অনবরত ঘুরতে পারত। কথাটা বলেই সে গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে ঘোরার কায়দাটা দেখাতে চেষ্টা করল।
এবার এক বৃদ্ধা গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠল–আরে মি., ওনার কথা আর বলবেন না। ওই মি. বুলার্ড নামে লোকটা তো পাগল–বদ্ধ পাগল ছিল। আমি জিজ্ঞেস করছি, লাটুর কথা কে, কবে শুনেছে, বলতে পারেন? এক্কেবারে অবাস্তব একটা কথা! মাদাম জুরেস যে একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন, তা কার না জানা আছে, বলুন তো?
