তবে খাবার টেবিলগুলো যত্ন করে সাজানো হয়েছে। প্রচুর খাদ্য সমগ্রিতে থালাগুলো সাজানো হয়েছে আর থালার সংখ্যাও যথেষ্টই। ভদ্রতা বহির্ভূত প্রাচুর্যের দিকে আমার নজর পড়ল। এর আগে এত অপচয় কোথাও কোনোদিনই আমার চোখে পড়েনি।
আরও আছে, ব্যবস্থাদিতেও কিছুমাত্র সুরুচির স্বাক্ষর লক্ষিত হয় না। আমার চোখ দুটো হালকা আলোতেই অভ্যস্থ, আর এ ঘরের ঝাড়বাতি আর অগণিত মোমবাতি অত্যুজ্জ্বল আলোকচ্ছটা আমার চোখ দুটোকে ঝলসে দিতে লাগল।
কামরাটার এক কোণে সাত-আটজন একটা টেবিল ঘিরে বসে হরেকরকম বাদ্যযন্ত্রে এমন সব উদ্ভট সুর বাজিয়ে চলেছে, যাতে আমি ছাড়া উপস্থিত সবার মনেই। দোলা দিচ্ছে।
আমি ধীরে সুস্থে এগিয়ে গিয়ে মি. মেলার্ডের ডানদিকের একটা চেয়ার টেনে বসলাম। উপযুক্ত পরিমাণ খাদ্যবস্তু দিয়ে উদরপূর্তি করলাম।
ইতিমধ্যে আশপাশের টেবিলগুলোতে গল্প বেশ জমে উঠেছে দেখলাম। বুঝতে পারলাম, সবাই উচ্চশিক্ষিত। গৃহকর্তাও মাঝে-মধ্যে টুকরো টুকরো রসের কথা ছুঁড়ে দিয়ে আসরকে আরও জমিয়ে তুলতে লাগলেন।
আমি সবচেয়ে বেশি বিস্মিত হলাম, সবার কথাই পাগলামির প্রসঙ্গ নিয়ে। রোগীদের হরেকরকম খেয়াল নিয়ে চটকদার গল্প হচ্ছে আসরের আলোচনার বিষয়বস্তু।
আমার ডানদিকের চেয়ারটা দখর করে বসে বেটেখাট পেটমোটা এক ভদ্রলোক। তিনি প্রসঙ্গক্রমে বলে উঠলেন–এক সময় এখানে এমন একজন ছিল যে নিজেকে একটা চায়ের পাত্র জ্ঞান করত। এ উদ্ভট ভাবনাটা কিভাবে সে সব পাগলের মাথায় জাগে, সেটা কি খুবই অবাক হবার মতো নয়? সারা ফরাসি দেশ ঘুরে এলে দেখা যাবে এমন একটাও পাগলাগারদ নেই এমন একটা মানব-চায়ের পাত্র না মিলবে। আমাদের এখানকার লোকটা এমন এক চায়ের পাত্র ছিল, যে রোজ সকালে নিজেকে সাদা রং দিয়ে মাজা ঘষা করত।
আর বিপরীত দিকের চেয়ারে বসা ইয়া লম্বা লোকটা বলতে আরম্ভ করল–মাত্র কদিন আগেই তো এখানে একজন লোক থাকত, যে নিজেকে গাধা মনে করত। তবে। এও সত্য যে, রূপক অর্থে বিচারে করলে আপনারাও মেনে নেবেন, সে যথার্থ কথাই বলত। তবে লোকটা খুবই জেদি ছিল। তাকে বশে রাখতে আমাদের নাকের পানি আর চোখের পানি এক হয়ে যেত। দীর্ঘদিন ধরে ঘাস ছাড়া অন্য কিছুই তার আহার্য ছিল না। আর আমরাও তাকে ঘাস ছাড়া অন্য কিছু খেতে না দেওয়ায় তার গাধা রোগটা সেরে যায়। তবে তখন সে সর্বদা এরকম–এরকমভাবে লাথি চালাত। সত্যি অবাক হবার মতো কাণ্ডকারখানাই বটে।
গল্পকথকের ঠিক পাশের চেয়ারে বসে-থাকা মহিলা বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন– মি. সিক, অনুগ্রহ করে ভালো আচরণ করাটা শিখুন। আপনার পা-টাকে সামলে সুমলে রাখুন। পায়ের ময়লা লাগিয়ে আমার বোকেটাই যে বরবাদ করে দিলেন! একটা কথা, যাকে কথার মাধ্যমে প্রকাশ করছেন তাকে কি এরকমভাবে বাস্তবভঙ্গিতে দেখানোর কোনো প্রয়োজন আছে বলে আপনি মনে করেন কী? আপনার বক্তব্যে এসব ছাড়া এমনিতেই সবাই বুঝতে পারবে বলেই আমি অন্তত মনে করছি। আমার মনে হয় সে ভাগ্যাহত লোকটি নিজেকে যেমন গাধা ভাবত, আপনি তো দেখছি তার চেয়ে কম বড় গাধা নন। তবে স্বীকার করছি, আপনি খুবই স্বাভাবিক অভিনয় করেছেন।
তার কথার জবাবে মি. ডি কক বললেন–মাদমোয়াজেল! মিলে পারদো। হাজারবার মার্জনা ভিক্ষা করে নিচ্ছ। আপনার মনে ব্যথা দেবার মতো ইচ্ছা আমার আদৌ ছিল না। মাদামোয়াজেল পাপ্লাস, আপনার সঙ্গে বসে মি. ডি কক একটু মদ খেতে পারলে নিজেকে সম্মানিত ভাববেন।
এবার মাদামোয়াজেল পাপ্লাসের সঙ্গে মি. ডি কক খুশিমনে করমর্দন সারলেন। তারপর উভয়ে মদের গ্লাস হাতে তুলে নিলেন।
এবার মাইস দ্য আমার দিকে সঁতের সুপারিনটেন্ডেন্ট মি. মেলার্ড নজর দিলেন। আমাকে লক্ষ করে বললেন–মি., আপনি রাজি থাকলে এই বাছুরের মাংসের একটা টুকরো আপনাকে খেতে দিচ্ছি, ভালো লাগবে।
তার কথা চলাকালীনই তিনটি গাট্টাগোট্টা যুবক পরিবেশক গোটা একটা বাছুর সেদ্ধ একটা বড়সড় থালায় চাপিয়ে, হাঁটুর ওপর তোলা-অবস্থায় বয়ে এনে দুম্ করে টেবিলের ওপর রেখে দিল।
আমি বি বিনয়ের সঙ্গে বললাম–আপনার নিখাদ আন্তরিকতার জন্য ধন্যবাদ জানাতেই হয়। বিশ্বাস করুন, মনের কথা বলছি, বাছুরের মাংসের ওপর আমার কোনোরকম লিপ্সা নেই।
স্লান হেসে তিনি বললেন–তাই বুঝি?
হ্যাঁ, সত্যি বলছি। আমি বরং বাছুরের মাংসের পরিবর্তে সামান্য খরগোশের মাংস তুলে নিচ্ছি।
মি. মেলার্ড এবার পিয়ের নামধারী এক পরিচারককে ডেকে আমার সামনের বাছুরের মাংসের থালাটা তুলে নিয়ে এক থালা খরগোশের মাংস দিয়ে যেতে বললেন।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলামনা, না এ-নিয়ে আপনি এত ব্যস্ত হবেন না। আমি বরং নিজেই শুয়োরের মাংস থেকে কিছুটা তুলে নিচ্ছি।
ব্যাপার স্যাপার দেখে আমি ভাবতে লাগলাম– এখানকার মানুষদের সঙ্গে এক। টেবিলে বসে কী যে খায় কে জানে! আমি তো এসবের কিছুই খাওয়ার জন্য উৎসাহি নই।
কুৎসিত, একেবারেই কুদর্শন একটা লোক টেবিলের পায়ের কাছে বসে পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বলতে লাগল–নিজেকে কার্ডোভা পনির জ্ঞান করত এরকমই একজন এক সময় এখানে থাকত। সে সর্বদা একটা ছুরি হাতে নিয়ে ঘুরত। কোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলেই অনুরোধ করে বসত–আপনার পা থেকে এক টুকরো মাংস কেটে নেব?
