মি., প্রশমন পদ্ধতি সম্বন্ধে আপনাকে অল্প কথায় কিছু বলছি। আশা করি তাতে পদ্ধতিটা সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণা নিতে পারবেন। তখন আমরা রোগীর পাগলামির প্রশ্রয় দিয়েই তার রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসা চালাতাম। উদাহরণস্বরূপ এখানে এমন অনেকেই আসতেন, নিজেদের যারা মুরগিশাবক জ্ঞান করতেন। তাকে পুরোপুরি মুরগি শাবক জ্ঞান করাই ছিল আমাদের চিকিৎসার ধরণ। যেমন মনে করুন, একটা সপ্তাহ রোজ তাকে স্রেফ মুরগির আধারই খেতে দেওয়া হতো। অন্য কিছুই নয়। এতে আমরা যে ফল পেয়েছি, তা বাস্তবিকই অবাক হবার মতোই বটে।
ব্যস, এটুকুই?
অবশ্যই না। হালকা ধরনের আনন্দ–যেমন ধরুন, নাচ-গান বাজনা, তাস খেলা, বিশেষ বিশেষ কিছু বই পড়া আর শারীরিক কসরৎ প্রভৃতির ওপর আমাদের খুবই আস্থা ছিল। আমাদের দৃষ্টিতে সবাই ছিল সাধারণ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি। ভুলেও কারো সম্বন্ধে পাগল বা উন্মাদ কথাটা অবশ্যই প্রয়োগ করতাম না।
আর কিছু?
হ্যাঁ, আরও আছে। আমাদের চিকিৎসাপদ্ধতির একটা বিশেষ দিক ছিল, এক পাগলকে অন্য আর এক পাগলের পাহারায় নিযুক্ত করতাম।
আমি চোখ দুটো কপালে তুলে বলে উঠলাম–সে কী অবিশ্বাস্য কথা শোনাচ্ছেন মি.! এক পাগল অন্য পাগলকে পাহারা দিত!
আরে, একটা পাগলের বিবেচনাবোধের ওপর আস্থা রাখার অর্থই তো হচ্ছে, তার দেহ-মনকে পুরোপুরি জয় করে নেওয়া, বুঝছেন না? আর এতে বহু প্রহরীর খরচও তো কমে যেত, তাই না?
আপনাদের চিকিৎসা-ব্যবস্থায় কোনোরকম শাস্তিদানের ব্যবস্থাই ছিল না?
না, মোটেই না।
রোগীদের খুপড়ির মধ্যে আটকে রাখা–
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই মি. মেলার্ড আবার বলতে আরম্ভ করলেন–হ্যাঁ, কখন সখন রাখতে হতো বৈকি কারো পাগলামি যদি সিমা ছাড়িয়ে যেত, রোগীর বিকার অত্যাধিক বেড়ে গেলে অন্য রোগীর মঙ্গলের কথা বিবেচনা করে তাকে তখনই গোপন ঘরে চালান দেয়া হতো। আর প্রয়োজন মনে করলে তাকে সেখান থেকেই সরকারি হাসপাতালে বদলির ব্যবস্থা করা হতো।
সম্প্রতি আপনারা সে সব ব্যবস্থা সবই বদলে দিয়েছেন, এই তো? আপনারা কী বিশ্বাস করেন, মঙ্গলের জন্যই সে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন?
অবশ্যই। অতীতের পদ্ধতিতে গলদ, অসুবিধা অনেকই ছিল, বিপদও ছিল কম নয়। আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, সম্প্রতি ফরাসি দেশের সব পাগলাগারদেই সে পদ্ধতি বন্ধ করে–
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই আমি বলে উঠলাম–মি. মেলার্ড, আপনার বক্তব্য আমাকে যারপরনাই বিস্মিত করেছে। আমার কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয় ছিল, সম্প্রতি দেশের কোনোঅংশেই পাগলদের চিকিৎসার অন্য কোনো চিকিৎসাপদ্ধতি অনুসৃত হচ্ছে না।
মি. আপনি আজও যৌবনের চৌকাঠ পেরোতে পারেননি। এক সময় আপনার জীবনে এমন সময় আসবে যখন অন্যের চটকদার গল্পের ওপর আস্থা না রেখে পৃথিবীর কোথায় কী ঘটে চলছে, আপনার নিজের পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।
হুম!
আমার এ-কথাটা মনে রাখবেন, অন্যের মুখ থেকে শোনা-কথার ওপর কিছুমাত্রও আস্থা রাখবেন না। আর যা নিজের চোখে দেখবেন, তার পুরোটা নয়, মাত্র অর্ধেকটা বিশ্বাস করে অবশিষ্টটুকু কেটে হেঁটে বাদ দিয়ে দেবেন, বুঝলেন? আপনার কথাবার্তা আমাকে এ-কথাই ভাবতে উৎসাহিত করছে যে, আমাদের আশ্রম সম্বন্ধে কিছু ভ্রান্ত ধারণা মাথায় নিয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছেন।
আমি, মানে–
এখন এসব প্রসঙ্গ ছাড়ান দিন। আপনি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত। আহারাদি সেরে বিশ্রাম করুন। তারপর আমি নিজে সঙ্গে করে আশ্রমের সবকিছু দেখাব। এমন একটা চিকিৎসা-পদ্ধতি আপনাকে দেখাতে পারব যা আমার বিশ্বা, আর অন্য যত মানুষ এ কর্মকাণ্ড দেখেছেন তাদেরও বিশ্বাস, আজ পর্যন্ত যত পদ্ধতি আবিস্কৃত হয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী। আমার মুখের কথা নয়। নিজের চোখে সবকিছু দেখে তবেই বিচার বিশ্লেষণ করবেন, কেমন?
আপনি যে পদ্ধতির কথা বলছেন তার আবিষ্কারক কী আপনি নিজেই?
হ্যাঁ, আমিই বটে। পুরোটা না হলেও একটা বড় অংশের আবিষ্কার তো অবশ্যই। আর এটাও স্বীকার করতে আমি মনে প্রাণে গর্বিত।
মি. মেলার্ডের সঙ্গে একনাগাড়ে এক বা দুঘণ্টা কথাবার্তা বললাম। আর এ অবসরে তিনি সেখানকার কাঁচের কক্ষ আর বাগান আমাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন।
তিনি এক সময় আমাকে নিয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর বললেন–মি., এ-মুহূর্তে আমার পক্ষে রোগীদের দেখানো সম্ভব হচ্ছে না। আগে আহারাদি করে একটু শক্ত হয়েনিন। তারপর আপনার বাঞ্ছা পূর্ণ করা যাবে, কী বলেন?
আমি ঘাড় কাৎ করে তার প্রস্তাবে সম্মতি জানালাম।
ছটার সময় নৈশভোজের জন্য গৃহকর্তা মি. মেলার্ড বড়সড় একটা ঘরে আমাকে নিয়ে হাজির হলেন। আমরা ছাড়া আরও পঁচিশ-ত্রিশজন আগেই সে ঘরে উপস্থিত হলেন।
চারদিকে চোখ বুলিয়ে বুঝলাম, অতিথিদের কম করেও দুই তৃতীয়াংশই মহিলা। তাদের পোশাক পরিচ্ছদ দেখে বর্তমান প্যারিস শহরবাসী কিছুতেই সেগুলোকে রুচিসম্মত বলে স্বীকার করবে না। যেমন বয়স সত্তরের কম নয়, এমন বহু মহিলাই গায়ে প্রচুর গয়নাপত্র–ব্রেসলেট, আংটি, মাকড়ি চাপিয়ে দিব্যি সেজেছেন। আর সবারই বুক আর বাহু দুটো অস্বাভাবিক রকম খোলামেলা। কারো গায়েই মাপ অনুযায়ী পোষাক তৈরি করা হয়নি। সংক্ষেপে বললে, সবার পোশাক আশাকই কিছু না কিছু বৈচিত্রে ভরপুর। খাবার কামরাটা কিন্তু সাজানো গোছানো নয়।
