এখানকার এসব ব্যবস্থাদির কথা মাথায় রেখেই আমি সতর্কতার সঙ্গেই বসার ঘরে অবস্থানতর মেয়েটার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে লাগলাম। কেন এরকম সতর্কতা অবলম্বন করেছি, তাই না? কারণ, যুবতিটা আদৌ সাধরণ কেউ, অর্থাৎ সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কিনা এ-বিষয়ে আমি নিশ্চিত হতে পারিনি।
সত্যি কথা বলতে কি, যুবতিটার চোখের তারা দুটো এমন অত্যুজ্জ্বল, রীতিমত জ্বলজ্বল করছে যার ফলে আমি প্রায় নিঃসন্দেহ হয়ে পড়েছি যে, তার মাথা সুস্থ স্বাভাবিক নয়। তাই আমি লাগাম টেনে রেখে, যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে ধরতে গেলে সাধারণ ব্যাপার স্যাপার নিয়েই তার সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে লাগলাম।
যুবতিটাও সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মতোই আমার একের পর এক কথার জবাব দিতে লাগল।
কিন্তু উন্মাদ দশার তত্ত্বগত ব্যাপার-স্যাপারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় থাকার জন্য সুস্থ মস্তিষ্কের এসব প্রমাণ সম্বন্ধে আমার মনে তেমন আস্থা নেই। ফলে উপায়
দেখে আমি যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে বেছে বেছে আলাপ পরিচয় চালিয়ে যেতে লাগলাম। আমি তো ভালোই জানি, কোনোক্রমে ভুলচুক কিছু হয়ে গেলেই কেলেঙ্কারির চূড়ান্ত হয়ে যাবে।
আমি যুবতিটার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় সারার সময় উর্দিপরা তকমা আঁটা এক কর্মী একটা ট্রে-তে কিছু ফল, অন্যান্য খাদ্যবস্তু আর মদ নিয়ে ঘরে ঢুকল। আমার সামনে, টেবিলের ওপর ট্রে-টাকে রাখল।
কথা বলার ফাঁকে আমি ট্রে-টা থেকে কিছু খাদ্যবস্তু তুলে নিলাম। আর কথার ফাঁকে ফাঁকে সেগুলোর সদ্ব্যবহার করতে লাগলাম।
আরও দু-চারটি কথার পরই যুবতিটা আমার কাছ থেকে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। যুবতিটা ঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে সামনের বারান্দায় পা দিতে না দিতেই আমি গৃহকর্তা মি. মেলার্ডের দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালাম।
আমার দৃষ্টির ইঙ্গিত বুঝতে পেরেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন–আরে, না মি., এ-আমার ভাইঝি। আমার পরিবারেরই একজন সদস্যা। আর বহুগুণে, গুণান্বিতাও বটে।
কিছু মনে করবেন না মি.। আমার অজ্ঞতাবশত সন্দেহ করার জন্য আমি যারপরনাই অনুতপ্ত, ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
মি. মেলার্ড নীরবে মুচকি হাসলেন।
আমি এবার বললাম–আমি প্যারিস শহরে বসেই এ-সংস্থাটাকে পরিচালন ব্যবস্থার সুখ্যাতির কথা শুনেছি। আর এ-কারণেই হয়তো বা বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই–
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই তিনি বলে উঠলেন–ঠিক আছে, ঠিক আছে–আর বলতে হবে না। বরং আমার দিক থেকেই আপনাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা দরকার। কারণ, আপনি যে এতক্ষণ ধরে প্রশংসনীয় জ্ঞান ও বিবেচনার পরিচয় দিয়ে চলেছেন তাতে আপনি অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।
আমি সঙ্কোচে ঠোঁটের কোণে ছোট্ট করে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুললাম।
মি. মেলার্ড পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বলে চললেন–একটা কথা কি জানেন মি.? আজকালকার যুবকদের মধ্যে এমন বিবেচনাবোধ সচরাচর চোখেই পড়ে না।
দেখুন, সত্যি কথা বলতে কি, আমি পূর্বে অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করতাম। তখন রোগিদের মেজাজ মর্জিমাফিক চলাফেরা করার অবাধ স্বাধীনতা দিতাম। তখন যে-সব উৎসাহি এ-আশ্রম দেখতে আসত তাদের মধ্যে জন কয়েকের সুযোগের অপব্যবহারের জন্য রোগীদের মধ্যে ভয়ানক অসন্তোষ, বলতে পারেন উত্তেজনার সঞ্চার ঘটত। তাই নিতান্ত অনন্যোপায় হয়েই আমাকে আশ্রমে প্রবেশাধিকারের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করতেই হয়েছে। আমার মনের কথা বলছি, যে-সব। দর্শকের বিবেচনাবোধের ওপর আস্থা রাখতে পারি না, তাদের এখানে প্রবেশাধিকার। দেওয়া হয় না, কিছুতেই না।
আমি ভ্রূ কুঁচকে বললাম–মি. মেলার্ড, পূর্বে অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করতেন, বলতে আপনি কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছেন? সম্প্রতি আপনি কী এখানকার পদ্ধতির পরিবর্তন করেছেন।
অবশ্যই।
তবে কি আপনি এটাই বোঝাতে চাইছেন যে, বর্তমানে আপনি প্রশমণ পদ্ধতিটা বাতিল করে দিয়েছেন?
হ্যাঁ।
কতদিন?
বেশ কয়েক সপ্তাহ যাবৎ আমরা প্রশমণ পদ্ধতিটা চিরদিনের জন্য বাতিল করে দিয়েছি। তা ছাড়া উপায়ও কিছু ছিল না, আপনাকে তো খোলাখুলিই বললাম।
আমি কপালের চামড়া পর পর কটা ভাঁজ এঁকে সবিস্ময়ে বললাম–সত্যি বলছেন, মি. মেলার্ড!
চাপা দীর্ঘশ্বাস ঘরময় ছড়িয়ে দিয়ে তিনি বললেন–আপনাকে আমার মনের কথাই বলছি মি., আগেকার পদ্ধতিটা আবার প্রয়োগ করা আমি আর প্রয়োজন বোধ করছি না। প্রশমন পদ্ধতির সমস্যাগুলো সর্বদাই ছির, আর তার সুযোগ, সুবিধার কথা ফলাও করে প্রচার করা হতো। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এ-আশ্রমে সে পদ্ধতিটার পরীক্ষা নিরীক্ষার যথেষ্ট সুযোগ দেয়া হয়েছে, মিথ্যা নয়। বিবেকসম্মত যাবতীয় কাজই আমরা করেছি, খুবই সত্য।
মুহূর্তে সময় থেমে তিনি আবার সরব হলেন–মি., কিছুদিন আগে যদি আপনি এ আশ্রমে পদার্পণ করতেন, তবে আমাদের তখন প্রচলিত ব্যবস্থাদি নিজের চোখেই দেখতে পেতেন। সবকিছু দেখে শুনে বিচার-বিশ্লেষণও করতে পারতেন। আমার বিশ্বাস, প্রশমন পদ্ধতির যাবতীয় বিষয়ই আপনার ভালোই জানা আছে ঠিক বলিনি?
আমি আমতা আমতা করে বললাম কিছু কিছু জানি ঠিকই, কিন্তু সব অবশ্যই নয়। আসলে আমি যতটুকু জানতে পেরেছি, পুরোটাই তৃতীয় বা চতুর্থ পক্ষের কাছ থেকে শোনার মাধ্যমে। মোদ্দা কথা, সবই পরোক্ষভাবে।
