তবে তো কোনো সমস্যাই নেই ভাই! আমি সোল্লাসে বলে উঠলাম। পাগলাগারদের সদর দরজা পর্যন্ত গিয়ে মি. মেলার্ডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি।
আমি মুচকি হেসে বললাম–যদি সদর দরজা পর্যন্তই কষ্ট করে যাবেন তবে আর ভেতরে ঢুকে কিছু সময় ঘুরে ঘুরে সেখানকার ব্যাপার দেখে আসতে অসুবিধা কোথায়? বুঝতে পারছি না।
ভদ্রলোক আমতা আমতা করে বললেন–সত্যি কথা বলতে কি ওই উন্মাদ রোগটা মানে পাগলদের আমি খুবই ভয় করি। তাই আমি ভেতরে কিছুতেই ঢুকতে চাচ্ছি না।
আমরা সদর রাস্তা ধরে এগিয়ে এক সময় বাঁক ঘুরে সরু একটা রাস্তা ধরলাম। সে রাস্তাটা ধরে আমাদের গাড়িটা এগিয়ে আধঘণ্টার মধ্যেই পর্বতের পাদদেশের গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করল।
জঙ্গলের ভেতরের এক পেশে পথ ধরে গাড়িটা প্রায় দুঘণ্টা এগিয়ে যাওয়ায় একটা বাড়ি আমাদের নজরে পড়ল।
আমার সঙ্গী ভদ্রলোকটি ওই বাড়িটার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন–ওই যে, ওইটাই মাই দ্য মতে পাগলাগারদ।
অদ্ভুতদর্শন একটা গ্রাম্যবাড়ি। বাড়িটা এতই জীর্ণ যে-ভাঙা না হলেও আধ-ভাঙা তো অবশ্যই বলা চলে। দীর্ঘদিন অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকার ফলে আজ নিতান্তই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
দূর থেকে বাড়িটার হাল দেখেই আমার বুকের মধ্যে রীতিমত ঢিবঢিবানি শুরু হয়ে গেল। ভাবলাম, খুব হয়েছে, আর এগিয়ে দরকার নেই। তার চেয়ে বরং ঘোড়ার লাগাম টেনে গাড়িটা দাঁড় করাই। আর মুহূর্তমাত্র দেরি না করে বাড়ির পথ ধরি।
তবে এও সত্য যে, পরমুহূর্তেই নিজের অবাঞ্ছিত ভীতি ও মানসিক দুর্বলতার জন্য লজ্জিত হলাম। আবার ঘোড়ার লাগাম ঢিলে দেওয়ায় গাড়িটা ওই বুকে কাঁপন ধরানো বাড়িটার দিকে এগিয়ে চলল। সদর দরজার কাছে পৌঁছে গাড়িটা দাঁড় করালাম। দরজাটা খোলা সামান্য ফাঁক। আর অদূরে বসে একটা ভদ্রলোক ভোলা দরজাটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছেন।
গাড়িটাকে দাঁড়াতে দেখেই ভদ্রলোক তার আসন ছেড়ে উঠে ব্যস্তপায়ে এগিয়ে এলেন, গাড়ির খোলা-দরজা দিয়ে আমার সঙ্গি ভদ্রলোককে ভেতরে বসে থাকতে দেখেই অধিকতর ব্যস্ততার সঙ্গে এগিয়ে এসে তার সঙ্গে করমর্দন করলেন। তারপর তাকে গাড়ি থেকে নেমে ভেতরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানালেন। মি. মেলার্ডই আমাদের ভেতরে যাওয়ার জন্য সাদর আমন্ত্রণ জানালেন। এক সুদর্শন মাঝ-বয়সী। ভদ্রলোক। পরনে সাবেকি আমালের পোশাক। মার্জিত আচার ব্যবহার। মুখে গম্ভীর ও কর্তৃত্বপরায়ণতার ছাপ সুস্পষ্ট। সব মিলিয়ে তিনি মর্যাদাসম্পন্ন এক ভদ্রলোক।
আমার সহযাত্রী বন্ধুটি সুপারিনটেন্ডেন্ট মি. মেলার্ডের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। তারপর কোনোরকম ভূমিকার আশ্রয় না নিয়েই সরাসরি আমার অভিপ্রায়ের কথা তার কাছে ব্যক্ত করলেন।
মি. মেলার্ড আমাকে সাদরে গ্রহণ করলেন।
আমার সহযাত্রী বন্ধু-ভদ্রলোক মি. মেলার্ড আমার যাবতীয় দায়িত্বভার গ্রহণ এবং আমার থাকার ও ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখবার ব্যবস্থা করবেন প্রতিশ্রুতি আদায় করে তবেই সেখান থেকে ফিরে এলেন। ব্যস, সেটাই তার সঙ্গে আমার শেষবারের মতো দেখা। তারপর আর কোনোদিন কোনো পরিস্থিতিতেই তার সঙ্গে দেখা হয়নি।
আমার সহযাত্রী ভদ্রলোক বিদায় নিয়ে বাঁক ঘুরে দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে সুপারিনটেন্ডেন্ট মেলার্ড আমাকে সাদর আমন্ত্রণসহ ভেতরে নিয়ে চললেন।
কয়েক পা এগিয়ে তিনি আমাকে নিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন–যাকে বলে একেবারে ছিমছাম এক বসবার ঘরে ঢুকলেন। সেখানে চির পরিচায়ক যা-কিছু ছিল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, সুন্দর করে বাঁধানো বহু বই, শিল্পীর নিপুন তুলির টানে আঁকা মুল্যবান কিছু তৈলচিত্র, ফুল-সাজানো ফুলদানি আর কয়েকটা বাদ্যযন্ত্র।
ঘরের একধারে চুল্লিতে আগুন জ্বলছে। এক রূপসি তম্বী যুবতিকে পিয়ানো বাজিয়ে গান গাইতে দেখা গেল। সে বেলিনির একটা গান তন্ময় হয়ে গেছে চলেছে।
আমি চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঘরে পা দিতেই রূপসি যুবতিটা গান বন্ধ করে যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে ভালো-লাগা হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে সে আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল।
যুবতিটার কণ্ঠস্বর ক্ষীণ আর কথাবার্তা ও হাবভাবও একটু চাপা-ই বলা চলে।
আমি অনুসন্ধিৎসু নজর মেলে তার মুখটাকে ভালোভাবে দেখে অনুমান করলাম, তার মুখজুড়ে বিষাদের কালোছায়া। বিরাজ করছে। তার গায়ে শোকের পোশাক। মুহূর্তের জন্য তার মুখটা দেখেই মনের কোণে শ্রদ্ধার উদ্রেক হলো, আগ্রহ উৎসাহের শিকার হয়ে পড়লাম, আর প্রশংসার আগ্রহ মনের গোপন কন্দর থেকে উঁকি দিতে লাগল। যুবতিটা তখনও করজোড়ে অভ্যর্থনার ভঙ্গিতে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল–আপনাকে আমাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
মি. মেলার্ডের এ-প্রতিষ্ঠানটার কথা আমি বহুবার বহুলোকের মুখেই শুনছিলাম। এখানে সশরীরে এসে সবকিছু দেখার আগ্রহও আমার বহুদিনের। আজ তা পূর্ণ হতে চলেছে। আর এও শুনেছিলাম–এখানে প্রশমন পদ্ধতি চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ নিরাময় করা হয়। এ-পদ্ধতিতে রোগীদের কোনোরকম শাস্তি ভোগ করতে হয় না। খুব কম সংখ্যক রোগীকেই ঘরে বন্ধ করে রাখা হয়, রোগীদের মর্জিমাফিক চলাফেরা করার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে তাদের ওপর গোপনে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়। আরও আছে–রোগীদের বিশেষ পোশাক নয়, সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের খুশিমত পোশাক ব্যবহার করার বাধাও কিছু নেই।
