এবার একটা ফুলস্কেপ কাগজে ডিমের কুসুম আর সাদা অংশ আচ্ছা করে ফেঁটিয়ে ভালোভাবে মাখিয়ে নিলাম। এবার এটার ওপর জলপাইয়ের তেলের টিনটা উপুড় করে ধরলাম। তারপর একের পর এক ছত্র কাগজটার ওপর সাজিয়ে নিলাম। জিনিসটা কিন্তু চমৎকার হয়ে উঠল। বিশ্বের বিস্ময় ছাড়া একে অন্য কিছু ভাবাই যায় না।
লেখাটাকে এবার পাঠিয়ে দেওয়া হলো মণ্ডামিঠাই পত্রিকার দপ্তরে। পরদিন সকালের সংস্করণেই লেখাটা ছাপা হয়ে গেল। ব্যস, আর দেরি নয়, মাছি পত্রিকার সম্পাদক বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে মারা গেলেন। আগে পৃথিবীর কেউ-ই তার নাম শোনেনি।
সম্পাদক কাকড়া সাহেব আমাকে এবার টম্যাহ নামটা দিয়ে দিলেন। আমি এ নামেই পরিচিত হতে লাগলাম। আর আমাকে পত্রিকার অফিসে একটা চাকরিও দিলেন। তবে বেতন কিন্তু দিলেন না। বেতনের পরিবর্তে তার কাছ থেকে কেবল উপদেশই পেলাম। তিনি অবলীলাক্রমে হাসতে হাসতে বললেন–শুনুন জনাব, এর চেয়ে বড় আর কোনো লাভই নেই।
তার উপদেশগুলো হচ্ছে–বিরক্তিকর বাবাকে দূর করে দিতে হবে। আর তা যদি পারা যায় তবে স্বাধীন লেখক হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।
আমি তার উপদেশ শিরধার্য করে সে রকম কাজই করলাম। পৃথিবীর বুক থেকে টমাস বব চিরদিনের মতো সরে গেলেন।
সত্যি বলছি, তারপর থেকেই আমি বাস্তবিকই ভারমুক্ত হয়ে গেলাম। আর কোনো ঝক্কি ঝামেলাই আমার ঝড়ে রইল না।
একটা কথা স্বীকার করতেই হয়, আমার টাকা কড়ির টানাটানি খুবই চলছিল। তবে নাক আর চোখ কাজে লাগিয়ে তা-ও কোনোরকমে সামলে নিতে পারলাম। নাকের সামনে যা-কিছু ঘটেছে, চোখে যা-কিছু দেখেছি–তা নিয়েই আদমি মানবের কায়দা কৌশল অনুযায়ী যুদ্ধ-কুঠার চালিয়েছি।
ব্যস, আমার লেখার ব্যবসা রীতিমত জমজমাট হয়ে উঠল। কুঠার! কুঠারকে সবাই ভয়ে সমঝে চলতে লাগল। কুঠারের ভয়েই পকেটে জোর করে মালকড়ি খুঁজে দেয়।
বেশি দেরি লাগল না। এমন মালকড়ি আমদানি হতে লাগল যে, আমি দু-চার দিনের মধ্যেই ফুলেফেঁপে ঢোল হয়ে গেলাম।
একটার পর একটা পত্রিকা খরিদ করতে লাগলাম। বব-তেলকে নিয়ে যে কাগজগুলোয় আজেবাজে কথা দেখেছিলাম, সবার আগে সেগুলোকেই খরিদ করে নিলাম।
এখন বাজারে আমি একা, একদমই একা। আমি ছাড়া দ্বিতীয় কারো অস্তিত্বই নেই।
সম্পাদক কাঁকড়া আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি অক্কা পেলে তার পত্রিকার মালিকানা স্বত্ত্ব তার ওপরই বর্তাবে। কার্যত হলও তা-ই, তবে এখন আমি বড়ই ক্লান্ত। আসলে বয়স হয়েছে, বুড়ো হতে চলেছি। তবুও দিনের আলোয় আর চাঁদের আলোয় যুদ্ধ-কুঠার সমান তালে চালিয়েই যাচ্ছি। এটা মোটেই ক্লান্তি নয়। যুদ্ধে কিছুমাত্র অনীহাও নেই। আমি পুরোদমে কুঠার চালিয়েই চলেছি।
তার নমুনা তো পেলেনই তাই না? আগামী প্রজন্ম এর থেকে শিক্ষানিক, আমি তবে এখন বিদায় নিচ্ছি। বিদায়!
দ্য সিস্টেম অব ডক্টর টার অ্যান্ড প্রফেসর ফেদার
আঠারো মাস।
সে বছরের হেমন্তকালে ফরাসিদেশের একেবারে দক্ষিণ অঞ্চলে ভ্রমণ করার সময় আমার সমুদ্র-যাত্রাপথের মাইল কয়েকের মধ্যেই একটা পাগলাগারদ পড়ে। বেসরকারি পাগলাগারদ।
আমি যখন প্যারিস শহরে বসবাস করছিলাম তখন ডাক্তার বন্ধুরা আমাকে ওই পাগলাগারদটা প্রসঙ্গে গল্পচ্ছলে অনেক কথাই বলেছিলেন।
সত্যি বলছি, এমন গঠনশৈলীসন্ন আর একটা বাড়ি ইতিপূর্বে কোথাও আমার চোখে পড়েনি। সে কারণেই আমি ভাবলাম, হাতের নাগালের মধ্যে পেয়েও এমন একটা সুযোগ হাতছাড়া করা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
এক ভদ্রলোক ছিলেন আমার সফরের সঙ্গী। তিনি আমার মাত্র দিন কয়েকের পরিচিত।
এক সকালে কথা প্রসঙ্গে তার কাছে প্রস্তাব করলাম–চলুন না, ঘণ্টাখানেকের জন্য একটু ঘুরে আসি।
ভদ্রলোক ভ্রূ কুঁচকে বললেন–ঘুরে আসতে চাইছেন? কিন্তু কবে, কোত্থেকে?
চলুন, পায়ে পায়ে গিয়ে পাগলাগারদটা দেখে আসি গে।
আমার প্রস্তাবটাকে তিনি সানন্দে গ্রহণ করতে পারলেন না। সময়ের অভাব আর একটা পাগলের সঙ্গে সাক্ষাতের স্বাভাবিক ভীতির অজুহাত খাড়া করে তিনি অসম্মতি জানালেন। তবে আমার আগ্রহ কৌতূহলকে দমন করার চেষ্টা না করে কোনোরকম বাধা না দিয়ে ভদ্রলোক আমার কাছে প্রস্তাব রাখলেন–ভালো কথা, আমি একা আস্তে আস্তে এগিয়ে যাব, যাতে আজ বা আগামীকালই আপনি আমাকে ধরে ফেলতে পারেন, কী বলেন?
হুম!
এতে আমার কাজটাও মিটবে আর সে সঙ্গে আপনার কৌতূহলও নিবৃত্ত হবে, ভালো প্রস্তাব নয়?
তিনি যাত্রা করার পূর্ব মুহূর্তে আমি বললাম–সে বাড়িটায় প্রবেশাধিকার পাওয়ার ব্যাপারে কোনো সমস্যা দেখা দিতে পারে, অনুমান করে আমি একটু ভয়ই পাচ্ছি, যদি ঢুকতে না দেয়।
হ্যাঁ, প্রবেশাধিকার পাওয়ার ব্যাপারে ভয় তো একটু-আধটু আছেই। সেখানে যাকে তাকে যখন তখন ঢুকতে দেওয়া হয় না। দেখুন, ওই পাগলাগারদের সুপারিনটেন্ডেন্ট মি. মেলার্ডের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলে, বা কোনো পরিচয়পত্র না থাকলে সেখানে প্রবেশাধিকার পাওয়ার সমস্যা তো আছেই।
কিন্তু–
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বন্ধুবর নিজেই আবার বলতে আরম্ভ করলেন–আপনি সরকারি হাসপাতালের কথা আপনি নিশ্চয়ই বলতে চাইছেন? দেখুন, সরকারি হাসপাতালের নিয়ম-কানুনের তুলনায় বেসরকারি পাগলাগারদের নিয়ম-কানুন অনেক, অনেক বেশি কঠোর। মুহূর্তের জন্য তিনি আবার মুখ খুললেন একটা কথা, সেখানকার সুপারিনটেন্ডেন্টের, মানে মি. –মেলার্ডের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয়-খাতির রয়েছে।
