আমার আচরণ এবং কৃতকর্মের জন্য মার্জনা ভিক্ষা প্রভৃতি নিয়ে আমি দিব্যি একটা ছোটখাট ভাষণও দিয়ে ফেললাম। তারপর মি. কাঁকড়ার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।
এ-ঘটনার দিন কয়েক পরেই আর এক পকেট সুনাম আমার বরাতে জুটে গেল। আর এবারের সুনামটা এলো প্যাচা পত্রিকা মারফত। সে পত্রিকার পাতাতে যে কী ফলাও করে আমার প্রশংসা করা হলো যা বাস্তবিকই আমার ধারণার বইরে।
তারপর মাত্র দিন দুই যেতে না যেতেই ব্যাঙ পত্রিকা আমাকে তো রীতিমত তুঙ্গে তুলে দিল। তারা নানাভাবে আমার লেখার সুখ্যাতি করল।
আরও আছে। এবার ছুঁচো পত্রিকা আমাকে নিয়ে বাজারে রীতিমত হৈ চৈ বাধিয়ে দিল। তারা পঞ্চমুখে আমার লেখার প্রশংসা করে প্রবন্ধ ছাপল।
আমার নামযশ বাতাসের কাঁধে ভর দিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে না পড়তেই আরও একটা খবর আমার কানে এলো।
খবরটা কি?
মণ্ডা মিঠাই পত্রিকার বিক্রি দিন দিন বাড়তে বাড়তে এখন পাঁচ লক্ষে পৌঁছে গেছে। আর এ-পত্রিকা কর্তৃপক্ষ লেখকদের ইদানিং খুব বেশি সম্মান দক্ষিণা দিচ্ছে। হিংসায় জ্বলেপুড়ে খাক হয়েই দুটো ব্যাঙ আর পেঁচা পত্রিকা এ-খবরটা ফলাও করে ছেপে ফাঁস করে দিল। আসলে প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকাগুলো যা করে থাকে, এ ই আর কি।
সম্পাদক কাঁকড়া সাহেব এবার একদিন আমাকে বললেন–আপনাকে একটা কথা বলা খুবই জরুরি হয়ে পরেছে।
আমি হাসতে হাসতে বললাম–জরুরি যদি হয়েই থাকে তবে আপনি নির্দিধায় বলতে পারেন। বলুন, কি আপনার বক্তব্য?
আপনি এবার থেকে মি. টমাস হককে কিছু কিছু করে মালকড়ি দেবেন।
আমি ভ্র দুটো কুঁচকে তার মুখের দিকে নীরব চাহনি মেলে তাকালাম।
আমার আকস্মিক ভাবান্তরটুকু তার নজর এড়াল না। তিনি ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললেন–সে কী ভাই! এমন ভাব নিয়ে তাকাচ্ছেন যেন কিছু বুঝতে পারেননি।
আমি বার কয়েক ঢোঁক গিলে আমতা আমতা করে বললাম–নামটা যেন কি বললেন, মি. টমাস হক, তাই না?
হ্যাঁ, টমাস হক।
কিন্তু এ-ব্যক্তিটা কে তা তো আমাকে সবার আগে জানতে হবে? এ মহাপুরুষটি কে, বলুন তো?
আমার মুখের কথাটা শেষ হতে না হতেই মি. কাঁকড়া আবার আগের মতোই বিশাল হা করলেন। এমন একটা ভাব করলেন যে সবে আকাশ থেকে পড়লেন। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন–আরে ভাই, টমাস হক একটা ছদ্মনাম। আর এটা আমার নিজের নাম।
আমি বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে তার মুখের দিকে নীরবে তাকিয়েই রইলাম।
তিনি পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বলতে লাগলেন–টমাস হককে সংক্ষেপে টম্যাহক বলা হয়। টমাহক মানে আদিম আমেরিকানদের যুদ্ধ-কুঠার। তবে সাহিত্যের ক্ষেত্রে অবশ্য টমাহক মানে নিষ্ঠুর সমালোচক–নিষ্ঠুরভাবে সমালোচনা করা, এবার ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো তো?
হু! আমি গম্ভীর মুখে প্রায় অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলাম। পর মুহূর্তেই ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লাম।
আমার অবস্থা দেখে কাঁকড়া সাবেব বললেন–আপনার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, মালকড়ি ছাড়া আপনার পক্ষে এখন সম্ভব নয়, ঠিক ধরিনি?
আমি চেয়ার আগলে বজ্রাহতের মতো শক্ত হয়ে চেয়ার আগলে বসেই রইলাম।
কাঁকড়া ভদ্রলোকটি বলে চললেন–মালকড়ি যদি নেহাৎ-ই এখন ছাড়তে না পারেন, তবে কুছ পরোয়া নেই ভাই। অনবরত লেখা ছেড়ে যান।
মুহূর্তের জন্য আমার মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে তিনি আবার মুখ খুললেন– এক কাজ করুন না ভাই, মাছি পত্রিকার সম্পাদককে আপনিই টম্যাহক ছদ্মনামে লেখালেখির মধ্য দিয়ে আচ্ছা করে একটু জব্দ করে দিন।
আমি? মাছি পত্রিকার সম্পাদককে আমি–
আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন–আরে ভাই, আপনার যা প্রতিভা, তার কাছে এটা নেহাৎ-ই একটা ছেলে খেলামাত্র।
ভদ্রলোক কথার মারপ্যাঁচে আমাকে এমন ওপরে তুলে দিলেন যে, আমি ফুলেফেঁপে ঢোল হয়ে যাবার যোগাড় হলাম। তারপরই বাড়ি ফিরে সোজা আমার লেখার ঘরে চলে এলাম।
আমি তো আগেই বলে রেখেছি, নকলিবাজি ছেড়ে দিয়েছি। এখন আমার ঝোঁক মৌলিক রচনার দিকে। ফলে লেখার ঘরে ঢুকেই আমি পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাগজ কলম নিয়ে মৌলিক কিছু রচনা করতে প্রয়াসী হলাম। তাই বলে মামুলি কোনো কিছু লিখে নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। আমাকে সে যুদ্ধ কুঠারে কোপ মারতেই হবে। কাগজ-কলম নিয়ে কিছুক্ষণ দাপাদাপি করার পর হতাশ হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লাম।
বুঝে নিলাম, এত সহজে এবারের যুদ্ধে জয়ী হওয়া যাবে না। জোর কসরৎ চালাতে হবে। ভাবতে ভাবতে নিলামের দোকানে হাজির হলাম। সস্তাদামে কিছু পুরনো বই খরিদ করে বাড়ি ফিরলাম।
পড়ার ঘরের দরজা বন্ধ করে গভীর সাধনায় লিপ্ত হলাম। সাধ্যমত ব্যস্ত হাতে একটা বইয়ের একের পর এক পাতা ওলটাতে আরম্ভ করলাম। দরকারি কিছু অংশ কাচি চালিয়ে ঝটপট কেটে নিলাম। তারপর ছত্রগুলোকে লম্বালম্বা টুকরো করে আলাদা করে ফেললাম।
এবার ভাড়ার ঘর থেকে একটা খালি জলপাই তেলের টিন নিয়ে আবার পড়ার ঘরে ফিরে এলাম। টিনটার মাথায় একটা ছিদ্র করে তার ভেতর দিয়ে কেটে রাখা। ছত্রগুলোকে ভেতরে গলিয়ে দিতে লাগলাম। আচ্ছা করে ঝাঁকালাম। এবার কিছু কঠিন কঠিন শব্দও আলাদা করে কেটে একই রকমভাবে ভেতরে ঢুকিয়ে আবার বার কয়েক ঝাঁকিয়ে নিলাম।
