পরিচারকের পিছন পিছন আমি সম্পাদক সাহেবের বৈঠকখানায় হাজির হলাম। আমাকে একটা চেয়ার টেনে বসতে দিয়ে পরিচারক বুড়োটা অন্দরমহলে চলে গেল।
একটু পরেই আমার বাঞ্ছিত সম্পাদক সাহেব আমাকে আদর-অভ্যর্থনার কোন। ত্রুটিই রাখলেন না।
ভদ্রলোকের নাম মি. কাঁকড়া। তিনি গ্যাড-ফ্লাই পত্রিকাটাকে নিজের মনের মতো করে সংক্ষেপ করে নিয়েছেন। এটাকে তিনি ফ্লাই অর্থাৎ মাছি বলে সম্বোধন করেন।
সত্যি কথা বলতে আমি যখন মাছি-র প্রতি কটুক্তি করেছি তখন সম্পাদক সাহেব যে আমাকে ছেড়ে কথা বলবেন না এ-তো খুবই স্বাভাবিক কথা। আমার ওপর কিছু না কিছু হম্বিতম্বি তিনি করবেনই করবেন। আমাকে তো ঘাবড়ে গিয়ে মুষড়ে পড়লে চলবে না। মনকে শক্ত করতে হবে। সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য তৈরি না থেকে উপায় নেই।
তবে মি. কাঁকড়ার সঙ্গে কথা বলে আমি এটুকু অন্তত বুঝতে পারলাম, তিনিই আমার হয়ে যা জবাব দেবার দেবেন। অবশ্য ব্যক্তিগত কারণেই তিনি আমার প্রতি সহানুভূতিটুকু প্রদর্শন করবেন। অতএব আমাকে ঘাবড়ালে যেমন চলবে না, আবার ঘাবড়াবার দরকারও কিছু নেই।
মি, কাঁকড়ার কথায় আমি পরিষ্কার বুঝে নিলাম, মণ্ডামিঠাই আর মাছি পত্রিকা দুটোর মধ্যে বিরোধ খুবই বেশি। দা-কুমড়ো যাকে বলে। কিন্তু আমার তো মনে হয় যথেষ্ট সদ্ভাব থাকাই উচিত ছিল। কার্যত কিন্তু বিপরীত সম্পর্কই উভয়ের মধ্যে বিদ্যমান।
ব্যস, আর যাবে কোথায়! আমি সম্মান-দক্ষিণা আশা করছি, জানতে পেরেই সম্পাদক ভদ্রলোকের মাথায় যেন আচমকা বজ্রাঘাত হলো। চোখের পলকে মি. কাকড়া হাতলওয়ালা চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিলেন। চোখ-উলটে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলার যোগাড় হলেন তিনি। নিচের চোয়াল থেকে ঠোঁটটা অস্বাভাবিক রকম ঝুলে পড়ল। চোয়াল দুটো ছড়িয়ে প্রকাণ্ড হা সৃষ্টি হলো। হাঁসলে ঠোঁট দুটোকে ফাঁক করলে যেমন বিরাট হা তৈরি হয়, তার মুখটাও অবিকল সে রকমই হয়ে গেল।
সম্পাদক কাকড়া সাহেব এমনি বিশ্রি ভঙ্গিতে কয়েক মুহূর্ত এলিয়ে পড়ে থাকার পর এক সময় অতর্কিতে পালিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে যন্ত্রচালিতের মতো ঘণ্টার দড়িটার দিকে এগিয়ে গেলেন। উদ্দেশ্য–ঘণ্টা বাজিয়ে কাউকে ডাকা। কিন্তু কেন যে তিনি এ-কাজে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন আজও আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি না।
দুপা এগিয়ে গিয়েই মি. কাকড়া থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তিনি কেন যে এমন হন্তদন্ত হয়ে ঘণ্টার দড়িটার দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন, আর কেন যে সামান্য এগিয়ে গিয়েও আবার দুম্ করে থেকে গেলেন, এর কারণ মাথামুণ্ডু কিছুই আমার মাথায় ঢুকল না।
যা-ই হোক, তিনি ঘণ্টার দড়িটার দিক থেকে বিদ্যুঙ্গতিতে ফিরে এসে সুড়ুৎ করে টেবিলের তলায় সিঁধিয়ে গেলেন। ঠিক তেমনি দ্রুত গতিতে বেরিয়ে এলেন হাতে ইয়া মোটা একটা রুলার নিয়ে।
টেবিলের তলা থেকে বেরিয়ে এসেই তিনি হঠাৎ রুলারটা মাথার ওপরে তুললেন। এমন একটা ভাব তার মধ্যে প্রকাশ পেল যেন, মুহূর্তের মধ্যেই ভয়ঙ্কর কিছু একটা করে বসবেন। কিন্তু কার্যত তিনি কিছুই করলেন না। ধীরে ধীরে রুলারটাকে মাথার ওপর থেকে নামিয়ে আনলেন।
দু-তিন পা এগিয়ে তিনি হতের রুলারটাকে নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখলেন।
আবার, আবারও প্রকাণ্ড হা করলেন। হা-করা অবস্থাতেই মুহূর্তের জন্য আমার দিকে তাকালেন। পরমুহূর্তেই আবার ঘাড় ঘুরিয়ে নিলেন। তার এরকম আচরণের উদ্দেশ্যও আজ পর্যন্ত আমার কাছে পরিষ্কার হলো না।
যাক গে, মি. কাঁকড়া এবার মুখে হাঁসের মতোই বিশ্রি স্বর উচ্চারণ করতে করতে এগিয়ে এসে আগেকার সে হাতলওয়ালা চেয়ারটায় ধপাস করে বসে পড়লেন। তারপর যা বললেন, তাকে তোতলানো ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না। তিনি বলতে লাগলেন–
শুনুন, মণ্ডা মিঠাই পত্রিকায় যারা লেখা লেখেন, মানে যাদের লেখা ছাপা হয় তারা সম্মান দক্ষিণাস্বরূপ কিছুতো পানই না, বরং মোটা অর্থের সম্মান দক্ষিণা সম্পাদকের পকেটে গুঁজে দিয়ে যান। অবশ্যই প্রত্যাশা করে না। তবে সম্পাদক মি. কাঁকড়া আপনার ব্যাপারে কিছু ব্যতিক্রম ঘটাতে পারেন।
মি. কাঁকড়া দাঁতের পাটি বের করে, বিশ্রি স্বরে খ্যাক খ্যাক করে হেসে বললেন– দেখুন ভাই, আপনার সম্বন্ধে আমি অন্যরকম ভেবে রেখেছি, বুঝলেন কিছু?
আমি তার অন্যরকম ভাবনাটা সম্বন্ধে সামান্যতমও আঁচ করতে না পেরে বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।
সম্পাদক সাহেব পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে এবার বললেন–আরে ওই যে, বলছিলাম না ভাই, লেখা ছাপার জন্য আপনার কাছ থেকে আমি সম্মান-দক্ষিণাস্বরূপ কিছুই নেব না। কেবলমাত্র এবারের লেখাটার জন্যই নয়, পরপর কয়েকটা লেখা আমার পত্রিকায় ছাপার জন্য কোনোরকম সম্মান-দক্ষিণাই আমি দাবি করব না।
কথা বলতে বলতে মি. কাকড়া আবেগে-উচ্ছ্বাসে এমনই অভিভূত হয়ে পড়লেন যে, চোখের পানি আটকিয়ে রাখা কিছুতেই তার পক্ষে সম্ভব হলো না। তিনি কোটের পকেট থেকে রুমাল বের করে বার বার চোখের পানি মুছতে লাগলেন।
তার আচরণে আমি যারপরনাই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। তাকে প্রতিশ্রুতি দিলাম, আরও লিখব, আর সেগুলো যথা সময়ে তার দপ্তরে পৌঁছে দিয়ে যাব।
আমার এরকম অকস্মাৎ মুগ্ধ হয়ে যাবার পিছনে কারণও রয়েছে যথেষ্টই। আসলে এ রকম সম্মান বরাতে তো এর আগে কোনোদিন জোটেনি। আমি নিজের। অজান্তে, ভালোভাবে তলিয়ে বোঝার চেষ্টা না করেই তার মনে আঘাত দিয়ে ফেলেছি দেখে খুবই কষ্ট হল, আর নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হলো।
