বইটার যে সব পাতায় ভূত-প্রেত, দত্যি-দানো আর পরী-টরীর কথা নিয়ে পদ্য ছাপা রয়েছে, সে সব পাতার লেখা ঝটপট নকল করে নিলাম।
এবার হাতে তুলে নিলাম, তেসরা নামের একটা বই। এর লেখক আবার অন্ধ, চোখে মোটেই দেখতে পান না। আর জাতি? হয়তো গ্রিকট্রিক কিছু একটা হবে।
কোনোরকম চিন্তা-ভাবনা না করেই সে বইটা থেকে হাত চালিয়ে গোটা পঞ্চাশেক কবিতা টুকে নিলাম।
এবারের বইটার নাম চৌঠা। এটাও এক অন্ধপুরুষের লেখা। আর এ বিষয়বস্তু পবিত্র বাতি, প্রস্তরখণ্ড প্রভৃতি। এসব ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে বহু জায়গায়ই আলোচনা করা হয়েছে দেখলাম। এ-বইটারও কিছু পাতা ঝপটপ টুকে নিতে ছাড়লাম না।
কবিতাগুলো কিন্তু নিকৃষ্টমানের নয়। একটা কথা আমার মনে বার বার ঘুরপাক খেতে লাগল, একজন অন্ধের পথে আলো দেখা কি করে সম্ভব। বহু ভেবেও এর কিনারা করতে পারলাম না। আবার না বলেও পারছি না, কবিতাগুলো মন্দ নয়– অনায়াসেই ভদ্রলোকের পাতে দেওয়া যেতে পারে।
নকল-করা কবিতাগুলোকে এবার চারটি আলাদা আলাদা খামে ভরে সোজা পাঠিয়ে দিলাম চার নামকরা পত্রিকার দপ্তরে। চারজন সম্পাদক সাহেবের ঠিকানায় তাগ্লোডেলডোে নামটা ছদ্মনাম হিসেবে স্বাক্ষর করে চারটি চিঠি পাঠিয়ে দিলাম। চিঠি কটা ডাকবাক্সে ফেলে দিয়ে তবে আমি স্বস্তি লাভ করি।
চিঠি চারটি পাঠিয়ে ফলাফল লাভের প্রত্যাশায় আমাকে অধীর প্রতীক্ষায় থাকতেই হলো। তারপর যে অভাবনীয় ব্যাপার ঘটে গেল, তা আর বলার মতো নয়। আমার কাছে ব্যাপারটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত মনে হলো। কাণ্ডটা কি, তাই না? বলছি তবে–চার-চারজন সম্পাদক সাহেবই নিজের নিজের পত্রিকার পাতায় আমার কবিতাগুলো আদ্যশ্রাদ্ধ করে ছাড়লেন। শুধু কি তাই? আমার পাঠানো কবিতা গুলোকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে পাতার পর পাতা লিখল–আমি যে নকল-করা কবিতা সম্পাদকের দপ্তরে পাঠিয়েছি এবং সেগুলো সবই ছদ্মনামে পাঠিয়েছি তা-ও তীরের ফলার মতো তীক্ষ্ণ ও জ্বালাময়ী বাছা-বাছা শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে ফাস করে দিল। আমার কুকর্মের সমালোচনার মাধ্যমে আমাকে যতভাবে অপদস্থ করা যেতে পারে। কিছুই লিখতে দ্বিধা করলেন না।
লজ্জায় আমি এতটুকু হয়ে গেলাম। মাথা মাটির সঙ্গে মিশে গেল। অন্যের কবিতা নকল করে কবির সম্মান করার ধান্ধা আমার মন থেকে ধুয়ে-মুছে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। আমার মধ্যে কবি হওয়ার সাধ আর নামমাত্রও রইল না।
কিন্তু এও খুবই সত্য যে, এভাবে আছাড়টা খাওয়ায় আমার কিন্তু শিক্ষা একটা অবশ্যই হলো। সততাই সবচেয়ে বড় কৌশল। ছলচাতুরীর মাধ্যমে কিছুই হবার নয়। মৌলিক কোনো কিছু রচনা না করলে ফায়দা কিছুই হবে না।
আমি এবার মৌলিক কিছু রচনা করার জন্য উঠেপড়ে লেগে গেলাম। এবার কাগজ-কলম নিয়ে বাপ-বেটা উভয়েই বব-তেল সম্বন্ধীয় কবিতা সামনে নিয়ে। উদ্দেশ্য উভয়ের মিলিত প্রয়াসে কবিতা রচনা করা। ঘণ্টা ধরে মাথা চুলকে বার-বার কলমটা নাড়াচাড়া করলাম। না, কাজের কাজ কিছুই হলো না। এখন উপায়? না, কোনো উপায়ই হাতের কাছে পেলাম না। কিন্তু হতাশ হয়ে এত সহজে হাল ছেড়ে দিলে তো আর চলবে না।
শেষপর্যন্ত ভাগ্য ঠুকে, মনের জোর সম্বল করে কোনোরকমে দুটো ছত্র লিখে ফেললাম :
বব-তেল নিয়ে কবিতা রচনা।
কী ঝক্কী ঝামেলা–চালবাজ।
বব-তেল ধারণাটা যেহেতু গ্যাডফ্লাই পত্রিকার সম্পাদক সাহেবের মাথা থেকে বেরিয়েছে, তাই আমার সদ্যরচিত দুছত্রের কবিতাটা প্রতিদ্বন্দ্বি পত্রিকা মণ্ডামিঠাই পত্রিকার সম্পাদক সাহেবের দপ্তরে।
হোক না কবিতাটা মাত্র দুটো ছত্রের। আমি তো জানি, কবিতার বিচার বড় বা ছোট দিয়ে হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ছোট কবিতা উৎকর্ষতার বিচারে ইয়া বড় কবিতাকে ছাপিয়ে যায়। কোন্ বই, নাকি পত্রিকার পাতায় যেন পড়েছিলাম– লেখার আয়তন আর প্রতিভার আয়তন মাপে সমান হয় না। কবিতার আয়তন হোক না ছোট কিন্তু তাতে আকাশছোঁয়া প্রতিভার ছাপ মিলতে পারে।
আমার পাঠানো লেখাটা যথাসময়ে মণ্ডা মিঠাই প্রতিকার সম্পাদক সাহেবের দপ্তরে পৌঁছে গেল। সম্পাদক সাহেব যথার্থ জহুরি বটে। প্রকৃত জহর চিনতে তার এতটুকুও ভুলচুক হয় না। তিনি বিচার-বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতা দিয়ে ঠিক রত্নটাকে চিনতে এতটুকুও ভুল করলেন না।
তিনি মোটেই সময় নষ্ট না করে, পরদিনের পত্রিকার পাতায়ই আমার-পাঠানো দুছত্রের কবিতাটা একটা বর্ণও না পাল্টে হুবহু ছাপিয়ে দিলেন।
কেবলমাত্র কবিতার ছত্র দুটো ছেপে দিয়েই কর্তব্য শেষ করলেন, তা নয়, দুছত্রের কবিতায় তার ছছত্রের সম্পাদকীয় মন্তব্য লিখে তবে ক্ষান্ত হলেন। সম্পাদকীয় মন্তব্যটা মোটামুটি এ রকম–এ নবীন প্রতিভাদর চালবাজ ব্যক্তিটা কে? প্রথম আবির্ভাব মুহূর্তেই বাজীমাত করে দিলেন! গ্যাড ফ্লাই পত্রিকায় চালবাজ ছদ্মনামটা যে এভাবে সম্পাদক সাহেবের মনকে প্রভাবিত করতে পারে তা কিন্তু আমি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি। তিনি যখন আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য অত্যুত্র আগ্রহী, তখন তাকে ধন্য করা তো দরকারই বটে।
এক সকালে গুটিগুটি তার বাড়ির দরজায় হাজির হলাম। কড়া নাড়লাম। দরজা খুলে পরিচারক মুচকি হেসে জানাল, আমার বাঞ্ছিত সম্পাদক সাহেব বাড়িতেই রয়েছেন।
