বিশ্বাস করুণ আমার মাথায় একদিন যেন আকাশবাণী, যাকে সবাই দৈববানী বলে, আবার স্বর্গীয় ব্যাপারও বলা চলে। আমি হঠাৎ–একেবারে হঠাৎই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার মানে বিখ্যাত হওয়ার উপায় উদ্ভাবন করে ফেললাম। বাধা-বন্ধনহীন পথের হদিস যাকে বলে না।
ব্যস, আর মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে আমি পরম শ্রদ্ধেয় পিতৃদেবের চরণে লুটিয়ে পড়লাম।
আমার আকস্মিক কাণ্ড দেখে আমার বাবা তো রীতিমত ভড়কে গেলেন। আমি তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে ভাবাপুত কন্ঠে বললাম–বাবা, তোমার চরণে আমার একটা নিবেদন আছে।
বাবা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে নীরবে আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।
আমি পূর্বস্বর অনুসরণ করে বললাম–বাবা, ব্রাশ দিয়ে সাবান ঘেটে ফেণা সৃষ্টি করার জন্য তো আমি পৃথিবীতে আসিনি।
বাবা ক্ষীণকণ্ঠে বললেন–কী বলতে চাইছিস, খোলসা করে বল।
শোনো বাবা। আমি সম্পাদক, কবি, সাহিত্যিক হতে চাই।
সম্পাদক! কবি! কবি-সাহিত্যিক হবি!
হ্যাঁ, আমার একান্ত ইচ্ছা বব-তেল নিয়ে ছড়া আর প্রবন্ধ রচনা করতে চাচ্ছি।
কি বলছিস, কিছুই তো আমার মাথায় ঢুকছে না। নাপিতের ছেলে ক্ষুর ছেড়ে কাগজ-কলম ধরবে–এ কী অসম্ভব খেয়াল তোর মাথায় ঢুকেছে।
হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। বিখ্যাত হওয়ার সুযোগ করে দাও, আমার একান্ত অনুরোধ।
বাবা আমতা আমতা করে বললেন–বাছা, তোর নামটা যেন কী?
এই তো আমার নাম। আমার এক ধনকুবের আত্মীয়, এ-নামে টাকার পাহাড় গড়ে ফেলেছিলেন।
বাবা আর টু-শব্দটিও না করে ঝট করে আমার কান ধরে টেনে পায়ের কাছ থেকে তুলে দাঁড় করিয়ে দিতে দিতে মুখ বিকৃত করে বিশ্রি সুরে বলেছিলেন–বাছা, তোর নামটা যেন কি, হ্যাঁ, অবিকল বাবার মতোই হয়েছিস বটে। মুণ্ডুটা যখন তালের মতো ইয়া বড় তখন মগজও প্রচুর পরিমাণেই আছে।
আমি নিতান্ত অপরাধীর মতো নীরবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।
বাবা পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বলে চললেন–বাছা, তোর ইয়া বড় মাথা আর মগজের কথা বিবেচনা করে আমি মনস্থ করেছিলাম, তোকে একজন আইন ব্যবসায়ী–উকিল বানাব। ও কারবার এখন ভব্যসভ্য-দ্রলোকের নয়। রাজনীতিবিদদের টাক ফাঁকা, টাকা-পয়সা আমদানি ধরতে গেলে বন্ধ। একটু ভালো করে ভাবলে, স্বীকার করতেই হয়, সম্পাদকের ব্যবসা-ট্যাবসায় মালকড়ি ভালোই আমদানি হয়। মোদ্দা কথা, লাভজনক কারবার।
বাবার কথায় আমার আত্মায় যেন একটু হলেও পানি এলো।
বাবা বলে চললেন–সম্পাদকের কারবারে আমদানি তো ভালো হয়-ই, সে সঙ্গে কবিতা-টবিতাও সৃষ্টি করতে পারে। অধিকাংশ সম্পাদক করেনও তা-ই। তা যদি করতে পারিস তবে আর তোকে ঠেকায় কে। ব্যস, একটামাত্র ঢিলে দু-দুটো পাখি কুপোকাত করা হয়ে যাবে–কম কথা!
বাবার কথায় আমার বুকে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ উতাল-পাথাল করতে লাগল।
বাবা আগের মতোই ভাবাপুত কণ্ঠে বলে চললেন–তবে আর মিছে দেরি করে কী হবে। একটা ঘর আর কাগজ, কলম-কালি ও একটা গ্যাড-ফ্লাই পত্রিকা দিচ্ছি ঝুলে পড়। দেখিস, যেন আর কোনোকিছুর জন্য হাত পাতবি না।
আমি মাত্রাতিরিক্ত ভাবাপুত কণ্ঠে বললাম–বাবা, একটা কথা জেনে রাখো, আমি অকৃতজ্ঞ নই। মানে বেইমানি কাকে বলে জানি না। আমি তো ভালোই জানি তোমার দরাজ হাত। কিন্তু আর কোনোকিছুর বাঞ্ছ আমার নেই, চাইছিও না।
বাবা ম্লান হাসলেন, বুঝতে পারলাম।
আমি কিন্তু তাতে এতটুকুও দমলাম না। পূর্বস্বরেই বলে চললাম–বাবা, তোমাকে বেশ জোরের সঙ্গেই আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে একজন রত্নের বাবা বানাবই বানাব।
বাবার সঙ্গে কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আমি কবি হওয়ার সাধনায় জোর কদমে মেতে গেলাম। আমার পরিকল্পনা, কবি হওয়ার পরই সম্পাদক হব। ব্যস, আমাকে আর ঠেকায় কে।
বব-তেলের ছড়াগুলোর মতোই আরও কয়েক ছড়া বা নিয়ে ফেলব–বাসনা নিয়ে আমি ছড়াগুলো আর কাগজ-কলম নিয়ে বসে গেলাম।
কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, কলম আর চলতে চায় না। অবিরাম মাথা চুলকাতে শুরু করলাম। গা দিয়ে ঘাম বেরোতে লাগল, আর মাথার ঝিমঝিমানি তো রইলই। কিন্তু ছড়াগুলো বার-বার পড়েও ছাইভস্ম কিছু উদ্ধার করতে পালাম না।
বহু চেষ্টা চালিয়ে নিঃসন্দেহ হলাম, ছড়াটড়া বানানো আমার কর্ম নয়। আমার কলমের ডগা দিয়ে ওসব মাল বেরোবার নয়। শেষপর্যন্ত হতাশ হয়ে একেবারে হাল ছেড়ে না দিয়ে মনে মনে একটা মতলব আঁটলাম। অবশ্য এরকম এক-আধটা মতলব দুনিয়ার সবার মাথাতেই খেলে যায়।
মতলবটা কি, তাই না। বলছি–এক বিকেলে শহরের একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে এক বইয়ের দোকানে খুবই নামমাত্র দামে একগাদা পুরনো বই খরিদ করে ফেললাম।
বইগুলো পুরনো তো বটেই, কিন্তু কতযুগ আগে যে সেগুলো ছাপাখানা থেকে বেরিয়েছে তার হিসেব পাওয়া ভার। আর তাদের নামও কারো শোনা নেই, পাতা উলটে কেউ দু-চার পাতাও পড়েনি।
বইগুলোর মধ্যে একটা বইয়ের নাম দেখলাম। ইনফারনো-র অনুবাদ। অনুবাদক দান্তে নামে একজন। বইটা খুলে তার বেশ কিছুটা অংশ খস্ খস্ করে বড় বড় হরফে নকল করে নিলাম।
বইটার পাতা নকল করতে গিয়ে আগে লিনো একটা লোকের নাম পেলাম। এ-ই নাকি নানা কাণ্ড কারখানার নাটের গুরু।
তারপর পাঁজা থেকে আরও একটা বই হাতে তুলে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলাম। এখন তার লেখকের নামটা কিছুতেই স্মরণে আনতে পারছি না। বইটায় বেশ কিছু সংখ্যক পদ্য ছাপা ছিল। সেটা থেকেও বেশ কয়েকটা পাতা ঝটপট নকল করে নিলাম।
