মি. বেডলো ঘরে ঢুকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে তাতে শরীর এলিয়ে দিলেন। আমরাও তার মুখোমুখি চেয়ার দখল করলাম। আমরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
মি. বেডলো এক সময় সোজা হয়ে বসলেন। আমাদের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে তিনি বাড়ি ফিরতে বিলম্বের কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বললেন–আশা করি আপনাদের অবশ্যই মনে আছে, সকাল নয়টার কাছাকাছি আমি চার্লোটেসৃভিল ছেড়ে বেড়াতে বেরোই। সদর দরজা থেকে বেরিয়েই সোজা হাঁটার পর দশটা নাগাদ একটা গিরিখাতের কাছে হাজির হই। আমার কাছে সে জায়গাটা একেবারেই নতুন, অপরিচিত। আমি মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে থেকে গুটিগুটি পায়ে তার ভেতর ঢুকে গেলাম। সত্যি কথা বলতে কি, আমি খুবই উৎসাহের সঙ্গে এঁকে বেঁকে হেলে দুলে এগিয়ে যাওয়া গিরিখাতটা ধরে কিছু সময় হাঁটলাম। সেখানের চারদিকের দৃশ্যাবলী এমনকিছু মনলোভা না হলেও তাতে এমন এক ভয়ঙ্কও নির্জনতা বিরাজ করছিল যা আমাকে অভিভূত করছিল। তাই আমি অকৃত্রিম আগ্রহের সঙ্গেই পথ পাড়ি দিচ্ছিলাম, অস্বীকার করতে পারব না।
হাঁটতে হাঁটতে একটা কথাই বার বার আমার মনে হচ্ছিল, আমি যে ধূসর পাহাড়–সবুজ ঘাস আর লতা-গুল্মের ওপর দিয়ে হাঁটছি এখানে ইতিপূর্বে কোনো মানুষের পায়ের ছাপ দেখা যায়নি। অর্থাৎ আমিই প্রথম মানুষ যে প্রথম এই গিরিখাত ধরে পথ পাড়ি দিচ্ছি। গিরিখাতের প্রবেশ পথটা খুবই নির্জন ছিল। আশপাশ থেকে সামান্যতম শব্দও ভেসে আসছিল না, তার ওপর পথটা খুবই দুর্গম ছিল। অতএব আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি, আমিই সে- যে গিরিখাতটার প্রথম অভিযাত্রী। ব্যাপারটা কিছুমাত্রও অসম্ভব নয়, আর সম্পূর্ণ সত্যও বটে।
ঘন কুয়াশার একটা চাদর, ধোয়াও হতে পারে, সবকিছুকে মুড়ে রেখেছে। সবই অস্পষ্ট, একেবারেই ঝাপসা, আর এজন্যই পরিবেশটা সম্পর্কে আমার ধারণাটা ক্রমে গভীর থেকে গভীরতর হয়ে পড়তে লাগল।
অসম্ভব! আমি সামনে-পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরিস্থিতিটা সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা নেবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। কি করেই বা সম্ভব হবে? কুয়াশার আস্তরণটা এতই গাঢ় ছিল যে, আমার সামনের পথটার বারো গজ দূরের কোনোকিছুকেও দেখতে পাচ্ছিলাম না, সবই সম্পূর্ণ অস্পষ্ট, ঝাপসা, আর পথটা ছিল খুবই দুর্গম। সত্যি কথা বলতে কি, এমন পথে হাঁটাচলা করা নিতান্তই সমস্যার-ব্যাপার।
কুয়াশায় চারদিক এমনভাবে ছেয়ে রেখেছে যে, সূর্যের অস্তিত্বও বুঝা যাচ্ছে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অল্প সময়ের মধ্যেই দিক হারিয়ে ফেললাম। কোন্ দিকে যে চলেছি কিছুই ঠাহর করতে পারছিলাম না।
দিকভ্রম হলেও আমি কিন্তু চলা অব্যাহত রাখি। এরই মধ্যে আমার ভেতরে আফিমের কাজও শুরু হয়ে যায়। ব্যাপারটা আমি কিছুটা অনুমানও করতে পারছিলাম। আর এরই ফলে সমস্ত বৰ্হিজগষ্টা সম্বন্ধে আমার মনে আগ্রহ-উৎসাহ অনেকাংশে বেড়ে গেছে। সবকিছু জানার, বুঝার আগ্রহের কথা বলতে চাচ্ছি।
আমার মধ্যে অদ্ভুত একটা ভাবনার উদয় হল। বিশ্বব্যাপী এক ইঙ্গিতের কথা বলতে চাইছি, এলোমলো ভাবনা-চিন্তার এক আনন্দমধুর ধারা। একটা পাতা তির তির করে কেঁপে ওঠার মাধ্যমে, ঘাসের ডগার ঘন সবুজ রঙে, একটা ত্রিপটের আকৃতির মধ্যে একটা মৌমাছির গুণ গুণ ধ্বনিতে, ঘাসের ওপর জমে-থাকা একটা শিশির বিন্দুর ঝকমকিতে হালকা বাতাসের একটা নিশ্বাসের মধ্য দিয়ে আর বনের ভেতর থেকে ভেসে-আসা অজানা অচেনা অস্পষ্ট গন্ধের মধ্য দিয়ে আমি বিশ্বব্যাপী একটা ইঙ্গিত খুঁজে পাই। আর সব মিলে আমার মধ্যে জেগে ওঠে এলোমেলো চিন্তার অদ্ভুত একটা ধারা। সত্যি, সে কী বিচিত্র এক ধারা তা সত্যি আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না–আমার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার।
এমন বহু কথা ভাবতে ভাবতে আমি পথ পাড়ি দিতে লাগলাম। আমি ঘন কুয়াশার আস্তরণ অগ্রাহ্য করে হাঁটছি তো হাঁটছিই। একটু একটু করে এগোতে এগোতে কয়েক ঘণ্টায় অনেকখানি পথ পাড়ি দিয়ে ফেললাম। কিন্তু কয় ঘণ্টা ধরে হাঁটলাম, আর পথই বা কতখানি পাড়ি দিয়েছি, কিছুই সঠিক করে বলতে পারব না।
ইতিমধ্যে কুয়াশার চাদরটা ক্রমে গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে হতে এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছাল যে, পথ চলাই আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দেখা দিল। কিন্তু তবুও আমার গতি স্তব্ধ করে দিতে পারল না। কোন্ মোহের বশবর্তী হয়ে, কোন্ আকর্ষণে যে আমি এগিয়ে চলার দুর্নিবার আকর্ষণ ভেতর থেকে অনুভব করতে লাগলাম তার কিছুই আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। আসলে আমি যেন তখন বাধা বন্ধনহীন এক আজন্ম পথিক। পথ যেন আমাকে অনবরত হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকছে। আর সে ডাকে সাড়া না দিয়ে আমার যেন দ্বিতীয় কোনো উপায়ই ছিল না।
কুয়াশা! কুয়াশা! আর কুয়াশা! কোনো অদৃশ্য হাত যেন ঘন কুয়াশার পাহাড়, পার্বত্য উপত্যকা আর অদূরবর্তী পার্বত্য বনানীর ওপর ছড়িয়ে দিয়েছে। আর এরই জন্য আমার অতি কাছের একেবারে হাতের নাগালের মধ্যের জিনিসগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম না। এখন উপায়। এ পরিস্থিতিতে পথ পাড়ি দেওয়া যে বাস্তবিকই মহাসমস্যার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল।
