কিন্তু একটা কথা জানবেন, সব সমস্যারই যান্ত্রিক সুরাহা কিছু না কিছু আছেই আছে। এ-কথা তো আপনাকে গোড়া থেকেই বলে এসেছি।
যদি মনে করেন, সাঁড়াশি দিয়ে জিভটাকে আচ্ছা করে চেপে ধরে জোরসে টেনে ইয়া লম্বা করে ফেলেন তখন আর অন্য কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা বোনফানতি-র কারখানায় হাজির হবেন।
সারা আমেরিকা মহাদেশটা চক্কর মেরে এলেও এমন আর একজন কারিগর খুঁজে বের করতে পারবেন না। আপনার চাহিদাটা কেবল জানিয়ে দেবেন। যেমন যার মাপ দেবেন, অবিকল সে রকমটাই পেয়ে যাবেন। তখন দেখবেন, ঠিক এক রকম গলার মালিক আপনিও বনে গেছেন!
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালেন। আমি আর মুহূর্তমাত্র। সেখানে না দাঁড়িয়ে তাকেও অভিভাধন জানালাম। তারপর তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।
এবার আমার ধন্ধ পুরোপুরি ঘুচে গেল। আমার আর তিলমাত্র সন্দেহও রইল না যে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জন এ. বি. সি স্মিথ অন্য পাঁচজনের মতো একজন সম্পূর্ণ মানুষ নন।
তবে? তবে তিনি কী? তিনি অর্ধেক যান্ত্রিক মানুষ–কলকজা দিয়ে তার দেহের অর্ধেকটা তৈরি না।
দ্য লিটারারি লাইফ অব থিংগাস বব এসকোয়ার
মেঘে মেঘে বেলা তো আর কম হলো না। বয়স যে বেড়েছে, এ তো আর মিথ্যা নয়, শেক্সপিয়র কখন পরলোকগমন করলেন, আমাকেও অচিরেই তার পথ ধরতে হবে। তাই ভেবেচিন্তে মনস্থির করে ফেললাম, আর নয়, যথেষ্ট হয়েছে, এবার সাহিত্য-জগৎ থেকে অবসর নিতে হবে।
খ্যাতিট্যাতি যেটুকু পেয়েছি তা ভাঙিয়েই সারাটা জীবন কাটিয়ে দেব।
কিন্তু মাথায় যে কর্তব্যও রয়েছে কম নয়, ভবিষ্যৎ-সাহিতব্রতীদের জন্যও তো কিছু রেখে যাওয়া কর্তব্য। তাই মনস্থ করে ফেললাম, ভবিষ্যৎ সাহিতব্রতীদের জন্য কিছু সাধনার কলাকৌশল রেখে যাব।
বিশ্বাস করি, আমার সাহিত্য-জীবনের গোড়ার দিককার ছবিটা তাঁদের সামনে তুলে ধরতে পারলেই সে কাজ সম্পাদন করা হয়ে যাবে।
এ তো মিথ্যে নয়, জনসাধারণের চোখের সামনে বহুদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। আমার নাম বহু লেখার মাধ্যমে পড়েছে–জেনেছে।
আমাকে নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের অন্ত নেই। তাদের অন্তরের গোপন করে আমার মানটা বহু উত্তেজনারই তো সঞ্চার করেছে।
তাই ভেবেচিন্তে আজ আমি বুঝতে পারছি, যে পথ ধরে আমি শীর্ষে পৌঁছেছি, সে পথের অন্তত কিছু নজির ভবিষ্যতের পথচারীদের সুবিধার্থে রেখে যাব, আমার উচিতও বটে, তা-ই যদি করি তবেই তো আমি নিজেকে মহত্বের অধিকারী বলে মনে করতে পারব।
একটা কথা তো খুবই সত্য যে, বহুদূরের পূর্বসূরীদের নিয়ে বেশি ঘ্যানর ঘ্যানর করা যে কোনো মানুষের পক্ষে মাত্রার বাইরে চলে যাওয়া বলে মনে করা হয়। বেশি ধানাইপানাই সীমা ছাড়িয়ে গেলে তাকে তো বাড়াবাড়ি করা ছাড়া অন্য কিছু ভাবাই যায় না।
আমি এখন কেবলমাত্র আমার বাবার সম্বন্ধে দু-চার কথা বলব। আমার বাবা ছিলেন একজন খুবই সাধারণ মানুষ–ক্ষৌরকার। গোড়ার দিকে লোকের বাড়ি বাড়ি ঘুরে চুল-দাড়ি কামিয়ে তাদের মাথা-মুখ সাফসুতরা করে দেওয়াই ছিল তার পেশা। পরে অবশ্য একটা চুল-দাড়ি কামাবার কারখানা খোলেন। স্মাগ নগরের একজন নামজাদা ক্ষৌর ব্যবসায়ী।
নগরের সম্ভ্রান্ত, গণ্যমান্য মানুষগুলো বাবার চুলদাড়ি কাটার দোকানে ভিড় জমাতেন। তারা অনেকেই এমন এক-একজন পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন, যার মুখের দিকে চোখ পড়লেই বুকের ভেতরে রীতিমত ধুকপুকানি শুরু হয়ে যেত, সম্মান, খাতির দেখানোর জন্য মন ছটফট করত।
সত্যি কথা বলতে কি, বাবার দোকানের খরিদ্দারদের এক-একজনকে আমি ভগবানের সমান মনে করতাম।
তাদের দাড়িতে সাবান মাখাবার সময় তারা যখন মুখ দিয়ে অনর্গল বাছাবাছা কথা বলতে আরম্ভ করত, তখন আমি জ দুটো কুঁচকে, হাঁ করে যেসব কথা শুনতাম, না, শুনতাম বললে একটু কমিয়েই বলা হবে, গিলতাম বলাই উচিত।
দাড়ি কামাতে বসে গ্যাডফ্লাই পত্রিকার সম্পাদক সাহেব একেবারে পঞ্চমুখে বিশুদ্ধ বব-তেল-এর প্রশংসা শুরু করতেন। এ যে কী তোফা তোফা শব্দের ফুলঝুরি নিজে না শুনলে কাউকে বলে বুঝানো সম্ভব নয়।
আসলে বিশুদ্ধ বব-তেল-এর আবিষ্কারক আমার পরম পূজনীয় বাবা। সত্যি বলছি, সম্পাদক সাহেবের বক্তব্যের তোড়ে এ-তেলের বিক্রি তরতর করে বাড়তে বাড়তে একেবারে পঞ্চমে উঠে গিয়েছিল। ব্যস, আমার বাবাও ভাবে একেবারে গদগদ হয়ে গিয়েছিলেন। ওই সম্পাদক সাহেবের কাছ থেকে চুল-দাড়ি কামানোর মজুরি বাবদ একটা কানাকড়িও নিতেই না। ব্যস, মুফতেই দিব্যি তার কাজ চলে যেতে লাগল।
আরে, তখন থেকে আমার বাবা আর তার কারবার সম্বন্ধে কেবল ধানাইপানাই-ই করে যাচ্ছি, কিন্তু এখনও তার নামটাই আপনাদের বলতে ভুলে গেছি! যাকগে, বলছি শুনুন–টমাস বব ছিল আমার বাবার নাম। আর তার প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল টমাস বব অ্যান্ড কোম্পানি। আর আমার নিজের নাম? সে না হয় পরেই বলব, ঠিক আছে তো?
কেবলমাত্র গল্প-কথার মাধ্যমেই নয়, গ্যাড-ফ্লাই পত্রিকার সম্পাদক সাহেব দাঁড়িতে সাবান মাখার সময় আমার বাবার তৈরি ববতেল নিয়ে ছড়া বা নিয়ে গুনগুন করে আবৃত্তি করে যেতেন। চমৎকার ছড়া। শ্রুতিমধুর তো বটেই। আমি পাশে দাঁড়িয়ে উল্কীর্ণ হয়ে শুনতাম আর মনে রীতিমত পুলকের সঞ্চার ঘটত।
