সে মোড়কটা থেকে এবার ক্রোধোন্মত্ত স্বর বেরিয়ে এলো–ওরে নচ্ছাড় কাহাকার! ওরকম আহাম্মকের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছিস কী? হাত গুটিয়ে না থেকে আমার বুক আর কাঁধ ঝটপট লাগিয়ে দে। স্বীকার করতেই হবে, পেটিট সবচেয়ে ভালো কাঁধ তৈরি করতে পারে বটে। যদি চ্যাপ্টাবুক চাইলে সোজা ডুক্রোর দোকানে চলে যান, পছন্দ-মাফিক বুক পেয়ে যাবেন।
আমি তার কথা শুনে বলেছিলাম–চ্যাপ্টা বুক?
ওহে পম্পি, এত সময় নষ্ট করছ কেন? সামান্য পরচুলা লাগাতে এত সময় লাগিয়ে দিচ্ছ! হতচ্ছাড়া নচ্ছাড়! ছালবাকল ছাড়ানো মাথাটাকে তো আর এত সহজে ঢেকে দেওয়া সম্ভব নয়। জ্ঞান আর অভিজ্ঞতার সমন্বয় না ঘটলে এমন একটা শক্ত কাজ কিছুতেই সারা সম্ভব নয়। তবে পছন্দমাফিক কাজ যদি পেতে চান তবে কোনো চিন্তা না করে সোজা ডা, এল ওর্মসের কারখানায় গেলেইনির্ঘাৎ বাঞ্ছা পূর্ণ হয়ে যাবে।
ছাল-বাকলা ছাড়ানো মাথা! এ আবার কোন
হতচ্ছাড়া দাঁড় কাকের ছা! তাড়াতাড়ি দাঁত দাও! দেরি না করে দাঁত দাও। হ্যাঁ, মনের মতো দাঁতের চাহিদা যদি থাকে তবে কোনো চিন্তা-ভাবনা না করেই পামলি-র কাছে চলে যাও। ব্যস, নিশ্চিন্ত হতে পারবে। ঠকার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তবে স্বীকার করছি, দামটা আকাশ ছোঁয়া। তবে এও খুবই সত্য যে, জিনিস পাবেন একেবারে এক নম্বরের।
মুহূর্তে নীরব থাকার পর সেটা আবার সরব হল–ওহে, আসল কথাটা শোনো, বন্দুকের কুঁদোর আঘাতে বুগাবু বেশ কয়েকটা দাঁতকে ভেঙে পেটের ভেতরে সিঁটিয়ে দিয়েছিল বলেই না মুক্তোর মতো এমন ঝকঝকে চকচকে আর প্রতিটা সমান দাঁত পাওয়া সম্ভব হয়েছিল। আহা! চমৎকার! চমৎকার দাঁত!
আরে বাবা! এ কী ভয়ঙ্কর কথা শুনছি! বন্দুকের কুঁদোর আঘাতে দাঁত ভেঙে খুঁড়িয়ে দিয়েছিল! পেটের ভেতরে দাঁত সিঁধিয়ে যাওয়া! আমি তবে জেগে আছি, নাকি খোয়াব দেখছি! নিজের চোখ আর কানের ওপর আমি আস্থা হারিয়ে ফেলছি নাকি?
চোখ? এর চেয়েও অনেক, অনেক ভালো চোখ আমার আছে। এখনই তা দেখতে চাইছ? ভালো কথা, দেখতে পাবে। ওরে হতচ্ছাড়া শয়তান পম্পি, পেঁচিয়ে লাগাতে এত সময় লাগিয়ে দিচ্ছিস! অপদার্থ কিকাপুটা তো চোখের পলকেই চোখ উপড়ে নিয়েছিল। ডক্টর উইলিয়ম তো সেটা তৈরি করতে অনেক, অনেক বেশি সময় লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তবে হ্যাঁ, যা তৈরি করছেন তাকে যথার্থই চক্ষুরত্ব বলা যেতে পারে। একেবারেই স্বচ্ছ দেখা যাচ্ছে সবকিছু। আপনার চেয়েও যে ঢেড় ভালো
অবশ্যই দেখতে পাচ্ছি, এতে সন্দেহের কিছুমাত্রও অবকাশ নেই। সত্যি এ যান্ত্রিক। চোখ আর আপনার সত্যিকারের চোখের মধ্যে ফারাক যথেষ্টই!
তবে এবার কিন্তু স্পষ্ট–একেবারেই স্পষ্ট দেখলাম। আমার সামনে যে দাঁড়িয়ে রয়েছে যে অদ্ভুত বস্তুটা, সেটা অবশ্যই জাঁদরেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স্মিথই, এতে সন্দেহের তিলমাত্রও অবকাশ নেই।
বীরসৈনিক পুরুষ অমিত শক্তিধর, সাহসিও বটে দুর্দান্ত।
পম্পির হাতের কেরামতিকে বাহবা না দিয়ে পারা যায় না। তার হিম্মৎ আছে বটে। সামান্য এ সময়টুকুর মধ্যেই একটা পুটলির মতো মোড়ককে সে কেমন পুরুষ তৈরি করে ফেলল–কম কথা!
তবে একটা ব্যাপার, বিদঘুঁটে কণ্ঠস্বরটা তখনও রীতিমত ধাপ্পা দিয়ে চলেছে। আরও কিছুক্ষণ উৎকর্ণ হয়ে এবং অনুসন্ধিৎসু চোখে ব্যাপারটা লক্ষ্য করার পর কণ্ঠস্বরের রহস্যটা অচিরেই ভেদ করা সম্ভব হলো।
ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল আগের মতোই বিশ্রি আর রীতিমত কর্কশ স্বরেই বলে উঠলেন–ওরে কুত্তার বাচ্চা, মড়া খেকো পম্পি, তোর মতলবটা কি, জানতে পারি! আমাকে কি তালু ছাড়াই বেরিয়ে পড়তে বলছিস! তোর ধান্ধাটা তো ভালো নয়, দেখছি!
পম্পি কাচুমাচু হয়ে গুনগুন স্বরে মার্জনা ভিক্ষা করতে করতে নিতান্ত অপরাধীর মতো প্রভুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
সে এবার ঝট করে ঘোড়ার নাল বের করার যন্ত্রের মতোই দেখতে কটা যন্ত্র হাতে নিয়ে তৈরি হয়ে পড়ল। এবার যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুততার সঙ্গে মুখ বিবরে ঢুকিয়ে দিল। পর মুহূর্তেই সেটাকে চাড় দিয়ে আরও ভেতরে সিঁধিয়ে দিয়ে মুখটাকে ফাঁক করে এতবড় হা করিয়ে দিল। এবার জটিল ও অত্যাশ্চর্য একটা যন্ত্র চোখের পলকে সেখানে বসিয়ে দিল।
সে এমনই দ্রুততার সঙ্গে পুরো কাজটা সেরে ফেলল যে, অতু আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও পুরো ব্যাপারটা আমার পক্ষে ভালোভাবে দেখা সম্ভব হলো না। যে কলকজা ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের মুখবিবরে বসিয়ে দিল, সেটার গঠনবৈচিত্র্য সম্বন্ধেও পুরোপুরি ধারণা করতে পারলাম না।
তবে ঘোড়ার নাল বের করার যন্ত্রের মতো যে যন্ত্রটাকে বিগ্রেডিয়ার জেনারেলের মুখের ভেতরে বসিয়ে দেওয়া হলো তাতে করে তার পুরো মুখটার আকৃতিই একেবারে বদলে গেল। আরও অবাক হলাম, যখন যান্ত্রিক কণ্ঠ দিয়ে মিষ্টিমধুর স্বর বেরোতে লাগল। কোন যন্ত্র যে এমন মিষ্টি স্বরনির্গত করতে পারে তা এর আগে কোনোদিন। কল্পনাও করতে পারিনি।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চিনির দানার মতো মিঠে অথচ রুক্ষ স্বরে বললেন নচ্ছাড় কোথাকার! আমার মুখ থেকে শুধুমাত্র তালুটাকেই হেঁটে বাদ দিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারেনি। জিভটাকেও প্রায় কেটে-হেঁটে বাদ দিতে ছাড়েনি। জিভের আট ভাগের সাত ভাগই কেটে-হেঁটে বাদ দিয়ে দিয়েছিল। নচ্ছাড়গুলো আমার জিভটাকে টেনে ইয়া লম্বা করে নিয়ে ক্যাচ করে কেটে ফেলছিল। নরকের কীট, ছন্নছাড়া বাউণ্ডুলে উজবুক!
