আমি বিমর্ষমুখে তার দিকে নীরব চাহনি মেলে তাকিয়ে রইলাম।
বুড়ো নিগ্রোটা এবার বলল–জেনারেল এখন সাজগোজ করতে ব্যস্ত। অতএব তার সঙ্গে এখন কিছুতেই দেখা হবার নয়।
আমি রেগে গিয়ে বললাম–আরে রেখে দাও তোমার সাজগোজ! বুড়োনিগ্রো চাকরটাকে তোয়াক্কা না করে আমি গটমট করে ভেতরে ঢুকে গেলাম। তারপর সোজা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল স্মিথের শোবার ঘরে হাজির হলাম।
বুড়ো নিগ্রোটা কিন্তু আমার সঙ্গে চীনে-জোঁকের মতো লেগে রইল। মুহূর্তের জন্য সে আমার পিছন ছাড়ল না। আমি দরজা দিয়ে সোজা ঘরের ভেতরে ঢুকেই ঘরের মালিকের খোঁজে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলাম। কিন্তু তিনি যে কোথায় অবস্থান করছেন তার চিহ্নও নজরে পড়ল না।
হঠাৎ আমি নিজের পায়ের দিকে তাকালাম, দেখলাম, মেঝেতে, আমার ঠিক পায়ের কাছেই বিচিত্ৰদৰ্শন কীসের যেন একটা মোড়ক পড়ে রয়েছে।
এত চেষ্টা করেও ঘরের মালিকের দেখা না পাওয়ায় আমার মেজাজ এমনিতেই তিরিক্কি হয়েছিল। ফলে মোড়কটাকে দেখেই বিরক্তিভাবে সেটাকে লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা আমার মনে জাগল।
আমি লাথি মারার জন্য পা বাড়াতেই সে মোড়কটা আচমকা বলে উঠল–সে কী সাহেব! সামান্যতম শিষ্টাচারও কি আপনার জানা নেই!
আমি থমকে গিয়ে পা-টাকে টেনে আবার জায়গামতো নিয়ে এলাম।
আমার এত বয়স হয়েছে কিন্তু এরকম অদ্ভুত–একেবারেই অত্যাশ্চর্য কোনো কণ্ঠস্বর আগে কোথাও, কোনোদিন শুনিনি। কোৎ কোঁৎ কুঁই কুঁই আর শিষ দেওয়ার শব্দ মিলিয়ে বিচিত্র একটা শব্দ আমার কানে ভেসে এলো। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, আওয়াজটা বাস্তবিকই বড়ই মজাদার। কিন্তু কোনো শব্দ যে এমন বিশি হতে পারে আমি কিন্তু স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবিনি।
তাই আমার মধ্যে অকস্মাৎ ভীতির সঞ্চার হলো। আমি আকস্মিক আতঙ্কে উন্মাদের মতো গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠলাম। আচমকা লম্বা একটা লাফ দিয়ে ঘরের দূরতম কোণে চলে গিয়ে আকস্মিক আতঙ্কে কাঁপতে লাগলাম।
আমি যেন স্পষ্ট শুনতে পেয়েছি–কোৎ কোঁৎ, কুঁই-কুঁই আর শিস দেওয়ার স্বরের মিশ্রিত আওয়াজটা যেন আমাকে লক্ষ্য করে বলে উঠল–আরে ভাই, ব্যাপারটা কী, বল তো?
আমি ঘরের কোণটায় দাঁড়িয়েই আকস্মিক আতঙ্কে আগের মতোই নীরবে কেঁপেই চললাম।
আবার সে অদ্ভুত কণ্ঠস্বরটা কানে এলো–কী ব্যাপার, বলুন তো ভাই! আপনি চোখে-মুখে এমন আতঙ্কের ছাপ এঁকে সেই তখন থেকে অনবরত ঠক-ঠক করে কেঁপেই চলেছেন, কারণ কী? এমন ভাব করছেন যে, জীবনে কোনোদিনই আমাকে। দেখেননি।
কথাটা আমার কাছে আরও অদ্ভুত বলেই মনে হলো। এ-কথার কি-ইবা জবাব দেব? আদৌ এর কোনো জবাব হয় কি?
আমি হাতের কাছে একটা হাতলওয়ালা চেয়ার পেয়ে গেলাম। কাঁপা-কাঁপা হাতে আমি সেটাকে টেনে নিয়ে ধপাস করে বসে পড়লাম। হুমড়ি খেয়ে পড়েই যাচ্ছিলাম। কোনোরকমে চেয়ারটার হাতল ধরে সামলে নিলাম। নিরবিচ্ছিন্ন জমাটবাঁধা আতঙ্কে আমার চোখের মণি দুটো কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল। চোয়াল ঝুলে পড়ায় ইয়া বড় হা সৃষ্টি হয়ে গেছে। শ্বাসক্রিয়া ঘন ঘন বইতে লাগল।
এমন সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতেও আমি শিকারি বিড়ালের মতো ওৎ পেতে দাঁড়িয়ে রইলাম। উত্তর্ণ হয়ে পরিস্থিতিটা সম্বন্ধে ধারণা করে নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম।
এবারই রহস্যটা আমার কাছে ফাঁস হয়ে যাবে। আমার যাবতীয় উৎকণ্ঠার অবসান ঘটে যাবে। আবারও সে বিচিত্র শব্দটা মেঝের মোড়কটা থেকে উঠে বাতাসের। কাঁধে ভর দিয়ে আমার কানে এসে তীব্র স্বরে বাজল।
মোড়কটা কিন্তু এখন আর আগের মতো নিশ্চল-নিথরভাবে পড়ে রইল না। এবার সেটা তিরতির করে কাঁপতে লাগল। এ যে রীতিমত একেবারেই অবিশ্বাস্য কাণ্ড? এমন কোনো দৃশ্য চাক্ষুষ করতে হবে স্বপ্নেও যে কস্মিনকালে ভাবিনি।
মোড়কটা কেবলমাত্র তিরতির করে নড়ছে না। আকারও ক্রমেই বেড়ে চলেছে। অনুসন্ধিৎসু নজরে তাকিয়ে দেখলাম, মোড়কটা যেন সোজা পড়ছে। একটামাত্র পা দেখা যাচ্ছে। সেটাতেই কোনো অদৃশ্য হাত মোজাটাকে গলিয়ে দিচ্ছে।
বিদঘুঁটে কণ্ঠস্বরটা আবারও কানে এলো–সে কী ভাই, এখনও আমাকে চিনতে পারলেন না। চেনা কিন্তু উচিত ছিল, অবশ্যই উচিত ছিল। ওরে পম্পি, পা-টা নিয়ে আয় তো।
পম্পি একটা ছিপি-পা এগিয়ে দিল। তারপর আরও একটা। পোশাক গায়ে চাপানোই ছিল। দুটো পা লাগিয়ে দেওয়া মাত্র অদ্ভুত সে বস্তুটা তিড়িং-বিড়িং করে হাঁটাহাঁটি শুরু করে দিল।
আমি তো বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে অত্যাশ্চর্য বস্তুটার কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগলাম। সেটা এবার অনুচ্চ, প্রায় সগতোক্তির সুরে বলতে লাগল–রক্তাক্ত সে অভিযানটার কথা এত সহজে ভোলা সম্ভব? সত্যি বলছি, আমার খুব শিক্ষা হয়েছে। আমি বার বার বলছি ভুলেও যেন কেউ কিকাপু আর বুগাবুদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে উৎসাহি না হয়। তা সত্ত্বেও যদি কেউ ওপথে পা-বাড়ায় তবে আর তাকে জ্যান্ত ফিরতে হবে না, বলে রাখছি। পম্পি তোমার হাতটা বাড়াও। ধন্যবাদ!
এবার আমার দিকে ফিরে অদ্ভুত সে বস্তুটা বলল–টমাস, এ-হাত ছিপি পায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সক্ষম। তবে মনে রেখো, কোনো সময় যদি হাতের দরকার হয় তবে আমার সুপারিশ, বিশপের কাছে নিয়ে যেও।
অদ্ভুত সে মোড়কটার বক্তব্য শেষ হলো। পম্পি এবার সেটার সঙ্গে হাতটা পেঁচিয়ে লাগিয়ে দিল।
