মুহূর্তের জন্য থেমে একটু দম নিয়ে তিনি আবার বলতে আরম্ভ করলেন– থমসন সাহেব, আবিষ্কারের জগতে কী যে বিরাট হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটে চলেছে–বিপ্লব ঘটে চলেছেও বলতে পারেন, তা বুঝিয়ে বলার মতো আমার ভাষার একান্ত অভাব।
রোজ! প্রতিমুহূর্তে বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না, যান্ত্রিক আবিষ্কার এখানে ওখানে সর্বত্রই ঘটেই চলেছে।
উফ! কী শান্তি! কী আরাম! না, সর্বত্র বললে যথার্থ বলা হবে না। প্রতি মুহূর্তে উচ্চিংড়ি বা গঙ্গাফড়িংয়ের মতো প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে যান্ত্রিক আবিষ্কার তড়া তড়াক করে বেড়েই চলেছে।
থম্পসন সাহেব, ভাবতে পারেন আবিষ্কারের জগতে কী বিরাট ঘটনা ঘটে চলেছে। আর এসব আবিষ্কারগুলো আমাদের চারদিকে বিরাজ করছে।
আমার নাম কিন্তু অবশ্যই থম্পসন নয়। তাতে আমি কিছু মনে করিনি। কি করে যে তিনি আমাকে এমন একটা নাম ধরে সম্বোধন করতে আরম্ভ করলেন, আমি তো জানিই না, এমনকি তিনি নিজের কিছু জানেন কিনা যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যাক গে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল যে একজনকে ভুল নামে সম্বোধন করে মনের আনন্দে গদগদ হয়ে পড়েছেন তাতেই আমি রীতিমত ধন্য হয়েছে।
আমি দু-চারটি কথাতেই বুঝে নিয়েছি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স্মিথের মানুষের মঙ্গলই একমাত্র কাম্য। মানুষই তার একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা। আর উদারহৃদয় জেনারেল মানুষের সঙ্গে আলাপ জমাতে এবং কথাবার্তার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করতে বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী।
আর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স্মিথের মাথায় যান্ত্রিক আবিষ্কারগুলো চারদিকে যে অভাবনীয় বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে, তা তার মাথায় অনবরত চক্কর মেরে চলেছে।
সত্যি বলছি, তার মুখ থেকে এত কথা শোনার পরও কিন্তু আমার কৌতূহল কিছুমাত্রও নিবৃত্ত তো হয়ইনি, বরং উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স্মিথ সম্বন্ধে আমার মনে অদম্য কৌতূহল সঞ্চারিত হওয়ার ফলে আমি তার সম্বন্ধে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য আগ্রহী হয়ে পড়লাম। এর ওর কাছে তার কথা জিজ্ঞাসা করে জানার চেষ্টা করতে আরম্ভ করলাম।
সবচেয়ে বেশি করে আমি জানতে চেয়েছিলাম, কিকাপু আর বুগাবু অভিযানে কি কি ঘটনা ঘটেছিল। যার ফলে বিগ্রেডিয়ার জেনারেল স্মিথ সমাজের বুকে এমন এক বিশেষ ব্যক্তিত্বপূর্ণ মানুষে পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন।
যা-কিছু শোনলাম ও বুঝলাম তাতে করে আমি মোটামুটি নিঃসন্দেহই হয়ে পড়েছি যে, মহিলা-সমাজে জেনারেল স্মিথের প্রতাপ নাকি অভাবনীয়। মহিলারা তার নাম শুনলেই নাকি একেবারে কুপোকাত হয়ে যায়। তাদের আর দিগ্বিদিক জ্ঞান থাকে না। তাই তাদের মহলে গিয়েই আমার মনের জমাটবাধা কৌতূহল নিবৃত্ত করতে গিয়েছিলাম।
কাজে নামার পর আমার প্রথম কাজ হলো বেছে বেছে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলাদের সঙ্গে মোলাকাত করা। করলামও তা-ই।
আমি তাদের এক-একজনের কাছে গিয়ে জাদরেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের নাম করামাত্রই চোখ দুটো রীতিমত কপালে তুলে ফেলল। পঞ্চমুখে তার বীরত্ব আর কৃতিত্বের কথা অনবরত বলেই চলল। বলতে বলতে তাদের কেউ-কেউ এমনকিছু কথাও বলে ফেলল, যা বাস্তবে কেবলমাত্র অবিশ্বাস্যই নয়, অসম্ভবও বটে।
যা-ই হোক, অবিবাহিতা আর বিবাহিতা মহিলাদের পঞ্চমুখে জেনারেল স্মিথের প্রশংসা শুনে শুনে আমার কান ঝালাপালা হয়ে গেল।
মহিলার তার ভূয়সী প্রশংসা করতে করতে একটা প্রসঙ্গে কথা বলার সময় বিশেষ একটা জায়গায় গিয়ে থেমে গেল। লক্ষ্য করলাম সবাই সে বিশেষ প্রসঙ্গে, বিশেষ জায়গাটা আর কিছুতেই অতিক্রম করছে না। সতর্কতার সঙ্গে বক্তব্যের লাগাম টেনে ধরছে। ব্যাপারটা আমার মধ্যে কৌতূহলের উদ্রেক ঘটাল।
আবার আমার বন্ধুবরও সে প্রসঙ্গটা শুরু করার পর সামান্য গিয়ে হঠাৎ একেবারে হঠাৎ-ই লাগাম টেনে ধরল। আমি যে কথাটা সম্বন্ধে বলতে চাইছি–এটা সেই কথা যখন বলা হয়েছে, তাকে মানুষ বলে গণ্য করা যায় না, বরং তিনি একজন কী সমস্যায়ই না পড়া গেল! একগাদা অবিবাহিতা আর বিবাহিতা মহিলাদের সবাই বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে একই জায়গায় আচমকা লাগাম টেনে ধরলেন, দুম করে থেমে গেলেন দেখে আমার কৌতূহল দ্রুত গতিতে করে বেড়ে গেল।
কেবলমাত্র মহিলাদের কথাই বা বলি কেন? পুরুষ বন্ধুরাও একই রেকর্ড বাজাতে শুরু করেছে দেখে স্তম্ভিতই হয়ে গেলাম। তারাও সব শেষে একই কথা–তাকে মানুষ হিসেবে গণ্য করা যায় না, বরং তিনি একজন…তারাও একই জায়গায় এসে থমকে গেল দেখে, এমন কোনো মানুষ আছে, যার মন কৌতূহলে ভরপুর হবে না, আপনিই বলুন তো?
এরকম একটা কথা যদি একাধিক মানুষের মুখ থেকে শোনা যায় তবে কারো। কৌতূহল উত্তরোত্তর বেড়ে না গিয়ে পারে? আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটল না। সত্যি, আমি নিঃসীম কৌতূহলের শিকার হয়ে পড়লাম। কৌতূহলজনিত অস্থিরতায় টিকতে না পেরে শেষমেশ একদিন জাদরেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের বাসায় হাজির হলাম। আমি আগেই শুনেছিলাম, বাসায় তিনি একাই থাকেন। আর একনিগ্রো চাকর তার যাবতীয় কাজকর্ম করে দেয়।
আমি তার বাসার দরজায় পৌঁছে বার-কয়েক কড়া নাড়তেই, দরজাটা সামান্য ফাঁক হলো। সে সামান্য ফাঁকটুকু দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বুড়োনিগ্রোটা বলল–কাকে চাই?
আমি সুপ্রভাত জানিয়ে অভিপ্রায় ব্যক্ত করলাম–বিগ্রেডিয়ার জেনারেল স্মিথের সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই! বুড়োনিগ্রোটা এবার বলল–না, ওনার সঙ্গে দেখা হবে না।
