তিনি এমনই দোদণ্ড প্রতাপশালী ছিলেন যে, মন চাইলে তিনি আকাশের বাজকেও কোৎ করে গিলে ফেলতে পারতেন।
একটু দম নিয়ে আমার সে বন্ধুবর তারপর বলেছিল–শোন বন্ধু, সত্যি কথা যদি বলতেই হয় তবে না বলে উপায় নেই, মানুষ বলতে যা বোঝায় তিনি আদৌ তা না। নয়। ওনাকে একমাত্র–
ব্যস, এ পর্যন্ত বলার পর আমার সে বন্ধুবরের কণ্ঠ হঠাৎ হ্যাঁ, একেবারে হঠাৎ যেন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
কথা বলতে বলতে সে যে হঠাৎ-ই থেমে গিয়েছিল তার কারণও ছিল যথেষ্টই। কারণ, ইতিমধ্যেই ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল আমাদের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। তিনি এগিয়ে এসে বিশাল দেহটাকে বার কয়েক দুলিয়ে, হাসতে হাসতে বন্ধুর সঙ্গে করমর্দন সারলেন।
আমি তখন মুগ্ধ নয়নে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এমন বিস্মিত হয়েছিলাম যে, আমি চোখের পলক পর্যন্ত ফেলতে পারছিলাম না। সে মুহূর্তে আমার বিস্ময়ের কারণ ছিল, তার মুক্তোর মতো ঝকঝকে চকচকে দাঁত, চোখের মণির উজ্জ্বল্য আর মিষ্টি মধুর কণ্ঠস্বর। এমন চমৎকারিত্বে মুগ্ধ না হয়ে কেবলমাত্র আমার পক্ষেই না, কারোরই সম্ভব ছিল না।
আমি আফসোস করছি, হা-পিত্যেশই বলা চলে–ইস্ বন্ধুর বক্তব্যের শেষটুকু শুনতে পেলাম না। যদি তা সম্ভব হতো তবে কিন্তু আমাকে রহস্যের উঙ্কণ্ঠায় এমন করে পৌণে-মরা হয়ে থাকতে হতো না। এখন আর ভেতরে ভেতরে গুমড়ে মরা ছাড়া উপায়ই বা কি?
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাহেবের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েই প্রাণের দোসরটা কোথায় যেন সুরুৎ করে কেটে পড়ল। আমি তার খোঁজে এদিক-ওদিক তাকানোর আগেই সে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে একেবারে বেপাত্তা হয়ে গিয়েছিল।
ব্যস, সে ঘটনার পর থেকে সে আমার চোখের আড়ালেই চলে গেল। আজ অবধি তার হদিস আমার জানা নেই। এমনকি, তাকে মুহূর্তের জন্যও চোখে দেখার সুযোগ আমার হয়নি। আর একই কারণে তার নামটা পর্যন্ত আমি কিছুতেই স্মৃতিতে আনতে পারিনি।
আজও আমার ভালোই মনে আছে, জাদরেল জেনারেল সাহেবের সঙ্গে সেদিন আমি জোর গল্প জমিয়ে বসেছিলাম। তার মধ্যেও উৎসাহের এতটুকুও ঘাটতি দেখা যায়নি।
তার সঙ্গে দু-চারটি কথা বলেই আমি বুঝে নিয়েছিলাম, ভদ্রলোক কথার জাহাজ বটে! আরে কি আর বলব, আমাকে মুখ খোলার ফুরসত-ই দিলেন না।
আমি তো মনে-মনে স্থিরই করে রেখেছিলাম, যদি আমি মুহূর্তের জন্যও মুখ খোলার অবসর পেতাম তবে অবশ্যই তাকে সরাসরি প্রশ্ন করে বসতাম, আপনি অমিত শক্তিধর ও দুর্ধর্ষ রেড ইন্ডিয়ান দুজনের সঙ্গে তুমুল লড়াই করেছিলেন, সেটা কি রকমের ছিল, খুব জানতে ইচ্ছা করছে। অবশ্যই-গায়ের রোম খাড়া হয়ে যাবার মতোই, কি বলেন?
আমি অবাক, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাহেব কিন্তু যুদ্ধ সম্বন্ধে একটা কথাও বললেন না। আমি হতাশ না হয়ে পারলাম না।
তিনি আলোচনার শুরুতেই আধুনিক যান্ত্রিক আবিষ্কারের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন। ব্যস, শেষপর্যন্ত একই প্রসঙ্গে আলোচনায় লেগে রইলেন।
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, কিকাপু আর বুগাবু যুদ্ধের রহস্যের প্রতি আমার মন খুবই আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল, সত্যি। কিন্তু কেবলমাত্র ভব্যতার জন্যই আমি সে প্রসঙ্গে না গিয়ে সতর্কতার সঙ্গে নিজের আগ্রহ কৌতূহলকে সামলে-সুমলে রেখেছিলাম।
কিন্তু কিকাপু আর বুগাবু যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়ঙ্করতা সম্বন্ধে কিছু হলেও আলোচনা করার জন্য আমি ভেতরে ভেতরে গুমড়ে মরছিলাম।
তবে আমি যখন লক্ষ্য করলাম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাহেব আমার আকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধের কাহিনী নিয়ে নিতান্তই অনাগ্রহী তিনি সবচেয়ে বেশি–একমাত্র আগ্রহই বলা চলে, দর্শনশাস্ত্রের আলোচনা নিয়ে তিনি উৎসাহি, আর যান্ত্রিক আবিষ্কারের অত্যাশ্চর্য যন্ত্র আবিষ্কারের আলোচনাতেই পুরোদস্তুর মেতে পড়েছেন, তখন অনন্যোপায় হয়েই গল্পের প্রসঙ্গ নির্ধারণের ব্যাপারটা পুরোপুরি ওনার হাতেই ছেড়ে দিয়ে আমি কেবলমাত্র শ্রোতার ভূমিকা পালনেই ব্রতী হলাম।
ব্যস, আর কোনো কথা নয়, বক্তা ভদ্রলোক পরম উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে যান্ত্রিক আবিষ্কারের প্রসঙ্গ নিয়ে জোর আলোচনায় মেতে গেলেন। আর আমি নিতান্ত নিরীহ অনুগত শ্রোতার মতো তার শ্রীমুখ নিঃসৃত বাণী নীরবে শুনতে লাগলাম।
আমাকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন–জনাব, আপনি যা-ই বলুন না কেন, আমরা বাস্তবিকই চমৎকার মানুষ। আর বাসও করছি এক চমৎকার যুগেই। আজ আমাদের অবলম্বন রেলপথ আর প্যারাসুট। আর স্প্রিংয়ের বন্দুক আর কলের কাদও একে বলা যেতে পারে! আমাদের স্টিম-বোট সাত-সাগরের বুকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
অচিরেই ন্যাশো বেলু এক অত্যাশ্চর্য, একেবারেই অবিশ্বাস্য এক কাণ্ড করে বসবে, দেখে নেবেন। কিছুদিনের মধ্যেই সেটা লন্ডন শহর আর টিকটুর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করবে, মানে যাতায়াতের কথা বলতে চাইছি, আশা করি বুঝতে পারছেন, এর জন্য এক পিঠের ভাড়া মাত্র বিশ পাউন্ড স্টার্লি দিলেই আপনি দায়মুক্ত হয়ে যাবেন। তারা আপনাকে লন্ডন শহর থেকে চিম্বাকটু বা টিকটু থেকে লন্ডন শহরে পৌঁছে দেবে।
তারপর ইলেকট্রো-ম্যাগনেটের কথা বলছি–এটি আমাদের সমাজজীবন, বাণিজ্য-সাহিত্য আর কলাশিল্প–সব ব্যাপারের ওপর দারুণ প্রভাব বিস্তার করবেই করবে!
জনাব কেবলমাত্র তাই নয়, আরও আছে। আরও অনেক আছে থমসন সাহেব। ভালো কথা, আপনার নাম তো থমসনই বললেন, তাই না। আবিষ্কারের স্রোত কিন্তু এখানে থমকে যায়নি। থামেনি ভাই। ক্রমান্বয়ে এগিয়েই চলেছে–আরও চমৎকার। সব কাজে নামবার মতো আবিষ্কার একের পর এক ঘটেই চলেছে।
