আর তার দেহসৌষ্ঠব! এরকম দেহের অধিকারী মানুষ পথে-ঘাটে একজনও চোখে পড়ে না। নির্দিধায় একে পুরুষশ্রেষ্ঠ বলে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। কেউ যদি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, অনুসন্ধিৎসু চোখে নিরীক্ষণ করে তবুও তার অঙ্গ-প্রতঙ্গের অনুপাতে তিলমাত্র ত্রুটিও খুঁজে বের করতে পারবে না।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের সমুন্নত কাঁধ দুটোকে দেখলে অ্যাপোলোরর শ্বেত পাথরের নিখুঁত মূর্তিও লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠবে। আঃ! কী চমৎকার! সত্যি পুরুষোচিত কাধই বটে। একটা বদ-খেয়াল অনেকদিন ধরেই আমার রক্তের সঙ্গে যেন মিশে রয়েছে। পথেঘাটে চলতে চলতে যথার্থ পুরুষোচিত কাঁধের খোঁজ করা।
অতএব আমার কথার ওপর নির্দিধায় বিশ্বাস রাখতে পারেন, সৃষ্টিকর্তা বিধাতা এমন দৃষ্টিনন্দন, এমন নিখুঁত মনোলোভা কাঁধ সৃষ্টি করে একজনকে কেবলমাত্র একজনকেই ধরাধামে পাঠিয়েছেন সে ব্যক্তিটিই হচ্ছেন আমাদের এ সুপুরুষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ছাড়া কেউ নন।
তার বাহু দুটোতে অখ্যাতি করার মতো কোনো চিহ্নই কারো নজরে পড়ে না। কারণ এমন নিখুঁত-নিটোল বাহুর অধিকারী মানুষ দ্বিতীয় আর একজনও চোখে পরে না।
তার বাহু দুটো যেমননিম্নমানের নয় ঠিক তেমনই নিখুঁত তার পা-দুটোর গড়ন। এ দুটোর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলতেই হয়–অধিকতর মাংসল তো নয়ই আবার কম মাংসলও নয়। আবার যেমন কাঠিন্য বেশি নয়, তেমনই কোমলতাও তেমন লক্ষিত হয় না। ভালোভাবে নিরীক্ষণ করলে স্বীকার না করে উপায় থাকবে না, তার পা দুটো বেশি বেঁটেখাট নয়, আবার চোখে লাগাল মতো লম্বাও নয়। মোদ্দাকথা, ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের চেহারার বিবরণ দিতে গিয়ে সমানুপাতৎ শব্দটাকে বার বার ব্যবহার না করে উপায়ই থাকে না।
পা দুটোর কথা বলতে গিয়ে আরও বলতেই হয়, উরুদেশ, হাঁটু আর গোড়ালি– সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে কথাটা প্রযোজ্য। পৃথিবীর সেরা কারিগরের পক্ষেও এমন সব দিক থেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ দুটো পা-গড়া সম্ভব নয়, কিছুতেই নয়।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের চালচলনে একটা অত্যাশ্চর্য সংযম ফুটে উঠত। হাঁটাচলার সময় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নির্দিষ্ট একটা ছকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত–এতটুকুও হেরফের হত না। কেউ যদি একে আড়ষ্টতা মনে করেন তবে কিন্তু দারুণ ভুলই করবেন।
এ রকম দশাসই চেহারা, চটকদার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জ্যামিতিক নিয়মে সঞ্চালিত হবে, এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে পিগমি চেহারার ব্যাপারটা মানানসই না হতে পারে, বিশালদেহী এটাই অদ্ভুত একটা আর্টে পরিণত হয়েছে। যার ক্ষেত্রে যা মানানসই তার হেরফের ঘটলেই তো চোখে বিসদৃশ্য ঠেকবে।
এবার জাঁদরেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়ের বিশেষ মুহূর্তটা সম্বন্ধে দু-চার কথা বলা প্রয়োজন বোধ করছি। যে বন্ধুর দৌলতে এমন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আমার প্রথম মোলাকাৎ ঘটে, চেনা-পরিচয় হয়, তিনি তখন আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে সাধ্যমত অনুচ্চ কণ্ঠে, ধরতে গেলে রীতিমত ফিসফিসিয়ে একটা কথাই পরিচয়ের মুখবন্ধ হিসেবে আমাকে বলেছিল–সত্যি এক অদ্ভুত প্রকৃতির মানুষ এ-ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাহেবটি। আর যাকে অদ্ভুত–অতাশ্চর্য বলতে চাইছি তা কিন্তু সব ব্যাপারেই পুরোপুরি প্রযোজ্য। এর কথাবার্তা, হাবভাব আর চলাফেরা সবকিছুতেই আশ্চর্যের ছোঁয়া ছিল পুরোদস্তুর। আমি অদ্ভুত আর অত্যাশ্চর্য শব্দ দুটো ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছি বটে, কিন্তু আসলে এদের উভয়কে হাজারগুণ বাড়িয়ে দিলেও তার সম্বন্ধে আমার মনের ভাব পুরোপুরি ব্যক্ত করা হবে কিনা সন্দেহ।
মুহূর্তের জন্য থেমে আমার সে বন্ধু এবার বলল–বন্ধু, এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাচ্ছি, আমাদের এ-ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাহেব আরও একটা বিশেষ কারণের জন্য মহিলাদের কাছে যারপরনাই আকর্ষণীয়–সেটা হচ্ছে, এর অটুট মনোবল আর অতুলনীয় সাহসিকতা। এমন অপরিমিত সাহস আজ অবধি কোনো পুরুষই প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়নি–একমাত্র তিনি ছাড়া।
আমি এর সম্বন্ধে যতটুকু জানি তাতে করে না বলে পারছি না, এমন একজন মনে-প্রাণে বেপরোয়া মানুষ হয় না, হবে না। প্রাণের মায়া তিলমাত্রও এর নেই। এ প্রসঙ্গে একটা কথাই বলা যেতে পারে, মণ্ডা-মিঠাইয়ের মতো তিনি অবলীলাক্রমে আগুনও গিলে ফেলতে পারেন। সব মিলিয়ে তার মতো পুরুষ-সিংহ পৃথিবী ঘুরে এলেও দ্বিতীয় আর একজনকে খুঁজে বের করা যাবে না–আমার দৃঢ় প্রত্যয়।
কথা বলতে বলতে আমার বন্ধুটি তখন এমন ভাব-বিমুগ্ধ হয়ে পড়েছিল, যাকে একমাত্র শ্রদ্ধায়-ভক্তিতে গদগদ বলেই বর্ণনা করা চলতে পারে।
কথা বলতে বলতে তার কণ্ঠস্বর শেষের দিকে এমন আপুত, এমন ভাঙা-ভাঙা হয়ে পড়েছিল যে, সে বক্তব্য শেষ করাই তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সত্যি কথা বলতে কি, তার কণ্ঠস্বরের ক্রম-পরিবর্তনটুকুর অব্যক্ত রহস্যে আমার ভেতরটা যেন কেমন মিইয়ে যেতে লাগল। শেষপর্যন্ত কহু কষ্টে আমি যে নিজেকে সামলে-সুমলে নিতে পেরেছিলাম এটাই যথেষ্ট।
আমার বন্ধুটি কয়েক মুহূর্তের জন্যনির্বাক-নিস্তব্ধ হয়ে কাটানোর পর আবার মুখ খুলল। আমি কিন্তু একতিলও বা নিয়ে বলিনি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাহেব সত্যি সত্যি আগুন গেলার হিম্মৎ রাখেন। আরে বন্ধু, তিনি এভাবেই কি কাপু আর বুগাবু রেড ইন্ডিয়ার দুজনের সঙ্গে যুদ্ধ করেই তো ধরাশায়ী করে ছেড়েছিলেন। নইলে কি আর অমিত শক্তির আধার জংলি দুটোকে কজা করতে পারতেন, আমি জোরগলায় বলতে পারি, অবশ্যই না।
