না, আর কোনোকিছু বলতে, কিছু করতে চেষ্টা করা নিতান্তই মুখামি। হে নরকের কীটের মতো দুরাত্মা, তোমাকে শতকোটি প্রণাম। তোমার শ্রীচরণে হাজারবার মাথা ঠুকতেও আমি কুণ্ঠিত নই।
দ্য ম্যান দ্যাট ওয়াজ ইউজড আপ
মি. জন এ. বি. সি. স্মিথ!
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জন এ. বি. সি. স্মিথের সঙ্গে আমার কোথায়, কবে আর কখন যে প্রথম পরিচয় হয়েছিল, এখন আর স্মৃতির পাতা ঘাঁটাঘাঁটি করে সে সব কথা উদ্ধার করা সম্ভব নয়।
ভদ্রলোকের চেহারাটা বাস্তবিকই জবরদস্ত, যাকে বলে রীতিমত আভিজাত্যের ছোঁয়া আছে মাথার চুল থেকে আরম্ভ করে পায়ের নখ পর্যন্ত প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে। সত্যিকারের পুরুষ মানুষের বলতে যা বোঝায়, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ছিলেন ঠিক তা-ই।
তার সঙ্গে প্রথম আলাপ কবে আর কোথায় হয়েছিল–আজ আর ঠিক স্মরণ করতে না পারলেও তবে কেউ না কেউ তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল এ কথা কিন্তু মিথ্যা নয়। আর যতদূর আমার মনে পড়ছে, কোনো এক জনসভায় আমাদের প্রথম পরিচয় হয়েছিল। তবে তার সম্পূর্ণ নামটা আজ আর আমি স্মৃতিতে কিছুতেই আনতে পারছি না। মহানুভব সে ব্যক্তিটার নাম আমার এখন আর একদম মনে পড়ছে না।
তবে আমার এটুকু বেশ মনে পড়ছে, তার সঙ্গে প্রথম আলাপের মুহূর্তে আমি অকস্মাৎ ঘাবড়ে গিয়ে একেবারে মিইয়ে গিয়েছিলাম। আর সে কারণেই তো কিছুই স্মৃতিতে আনতে পারছি না। আর আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে কোনো দাগই পড়তে পারেনি।
আমার স্বভাব অনুযায়ী এমনিতেই সহজে ঘাবড়ে যাই। মানসিক সুস্থিরতা হারিয়ে ফেলি। আমার জন্মসূত্রে পাওয়া ভিরু প্রকৃতি। অতএব সে মুহূর্তে যে আমি খুবই ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, এতে আর অবাক হবার কি থাকতে পারে? আমার এ ভিতু প্রকৃতিতে যদি রহস্যের নামগন্ধও লেগে থাকে, তবে আমার প্রাণ উদ্বেগ, আর উত্তেজনায় খাঁচাছাড়া হয়ে পড়ার যোগাড় হয়।
এমন একজনের সম্বন্ধে লিখতে বসেছি, যাকে এক অদ্ভুত প্রকৃতির মানুষ ছাড়া অন্য কিছুই ভাবা সম্ভব নয়। অদ্ভুত বা অত্যাশ্চর্য শব্দের মাধ্যমেও আমি মনের কথাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যক্ত করতে পারছি না।
কেন এরকম কথা বলছি, তার সমর্থনে যুক্তিস্বরূপ বলা যেতে পারে, ভদ্রলোকের দৈহিক উচ্চতা ছয়ফুট। আর মুখ দেখলেই মনে হয়, অস্বাভাবিক রকমের ডাকসাইটে প্রকৃতির। সবার ওপরে ছড়ি ঘোরাতেই অভ্যস্ত। কারো হুকুম তামিল করতে নয়, সবাইকে হুকুম করতেই যেন তিনি ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন।
আরও আছে, বিগ্রেডিয়ার জেনারেল সাহেব জন্মসূত্রেই যিনি সমজের ওপর তলার মানুষ হিসেবে সম্মানলাভের অধিকারী। আর সে মহলের উপযোগি পড়াশুনা আর আদব-কায়দা শিখে নিজেকে সে সমাজের উপযোগি করে তৈরি করে নিয়েছেন। তার চোখমুখ আর চলাফেরাতেও সে প্রমাণই প্রকট।
স্বীকার করতে লজ্জা নেই, বিগ্রেডিয়ার জেনারেল সাহেবের পাশে দাঁড়ালে আমাকে একজন পিগমি সন্তান ছাড়া ভাবতেই পারবে না। আর তাই আমার মন প্রাণ বিষণ্ণভরা তৃপ্তিতে ভরপুর করে তোলে। তার মাথায় একরাশ ঝাকড়া চুল। ব্রুটাস যদি এমন চুলের অধিকারী হতেন তবেনির্ঘাৎ বর্তে যেতেন।
মাথার বড় বড় কোঁকড়ানো চুলগুলোর চাকচিক্য যেমন আকর্ষণীয়, ঠিক তেমনই মনোলোভা কায়দায় সেগুলো বিন্যাস করা হয়েছে। সত্যিকথা বলতে কি, এমন দৃষ্টিনন্দন চুল সচরাচর চোখেই পড়ে না। তার ওপর কালো রঙ, চুলগুলোর সৌন্দর্যকে অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে, সন্দেহ নেই। আর দুপাশের ইয়া বড় জুলপির রঙও একই রকম কালো–চকচকে ঝকঝকে। আর মোটা গোঁফ জোড়াও তার সুখের সৌন্দর্য কম বৃদ্ধি করেনি, আকর্ষণীয়ও কম করে তোলেনি।
সব মিলিয়ে একটা কথা খুব জোর দিয়েই বলা যেতে পারে, সূর্যের তলায় পৃথিবী নামক এ গ্রহে এমন পুরুষোচিত মনোলোভা গোঁফ আর জুলফি আগে তো নয়ই, বর্তমানেও কারো মুখে নজরে পড়ে না। এ দুটো বস্তু প্রায় পুরো মুখটাকেই ঢেকে রাখত।
গোঁফ আর জুলফির দৌলতে, দাপটেও বলা চলে, মাঝে মধ্যে তার মুখটা যেন ছায়াচ্ছন্ন হয়ে থাকত। আবারও না বলে পারছি না, এরকম আর একটা মুখ সারা পৃথিবী ঘুরে এলেও নজরে পড়বে না।
আর তার দাঁত? দাঁতের পাটি দুটোর দিকে তাকালে চোখ ট্যাঁরা হয়ে যাবে। দাঁতগুলোকে যেন এমন সতর্কতার সঙ্গে পাশাপাশি বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনো একটা দাঁত যেন সারি থেকে এতটুকুও বাইরে বেরিয়ে যায়নি সামান্যতমও অসমান নয়।
দুপাটি দাঁতের ফাঁক দিয়ে সুরেলা মিষ্টিমধুর কণ্ঠস্বরনির্গত হয় যাকে একাধারে গানের মতো মাত্রাতিরিক্ত মিষ্টিমধুর, পানির মতো স্বচ্ছ আর বজ্রের মতোই নিরস কর্কশ মনে হয়। কোনো মানুষের কণ্ঠ দিয়ে যে এমন মধুর স্বচ্ছ আর স্পষ্ট হতে পারে, তা নিজের কানে না শুনলে বিশ্বাস করতেই উৎসাহ পাওয়া যাবে না।
আর তার আয়তাকার চোখ দুটোর দিকে এক পলক তাকালেই মনে হবে যেন দুটুকরো কোমল হীরা তার চোখের কোটরে আলতোভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে এ দুটোকে চোখ না বলে চক্ষুরত্ব বললেই বুঝি যথাযথ বর্ণনা দেওয়া হবে। কিন্তু যদি চক্ষুযন্ত্র বা দর্শণেন্দ্রিয় বলা হয়, তবে এদের প্রতি অবিচারই করা হবে।
তার চোখ দুটো যেমন আয়তনে বিশাল, ঠিক তেমনই জ্যোতি সমুজ্জ্বল আর ভাবগম্ভীরও অবশ্যই। মাঝে মাঝে এর চোখের তারার রহস্যের ছাপও মেলে। সব মিলিয়ে এ দুটো মনোভাব অভিব্যক্তি প্রকাশের মাধ্যম মনে করা ছাড়া অন্য কিছু ভাবাই যায় না।
