নতুন করে মানুষের ভিড় দেখে বুড়োটার চোখে-মুখে যেন হাসির ঝিলিক খেলে যেতে লাগল। সে যেন ধরে প্রাণ ফিরে পেল, এমনই একটা ভাব তার মধ্যে প্রকাশ পেল। আসলে ঠেলাধাক্কার মধ্যে পড়তেই তার অস্বস্তি ভাবটা কেটে গেল। এতক্ষণ যে ভেতরে ভেতরে মিইয়েছিল এখন সে-ই যেন স্বস্তির নিকাস ফেলে বাঁচল। নৈরাশ্যের মেঘ কেটে যাওয়ায় তার সামনে যেন আশার আলো দেখা দিল।
লোকজনের ভিড় যেদিকে বুড়োটা সেদিকেই লম্বা-লম্বা পায়ে এগিয়ে গিয়ে দলে ভিড়ে গেল। আমি তার কাণ্ডকারখানা সম্বন্ধে তিলমাত্র বুঝতে না পেরে অন্ধের মতো তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম।
নাটক দেখে বেরিয়ে দর্শকরা নিজের নিজের বাড়ির দিকে পা বাড়াল। পথে-পথে ভবঘুরের মতো ঘুরতে যাবেই বা কেন? লোক কমতে কমতে শেষমেশ মাত্র তিনজন এসে ঠেকল।
একটা প্রায় অন্ধকার গলিপথ ধরে এ-তিনজন থেকেও লোক কমে যাওয়ায় বুড়োটা বিমর্ষ মুখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। গম্ভীর মুখে কি যেন ভাবল কয়েক মুহূর্ত ধরে। পরমুহূর্তেই তার মধ্যে যেন অদ্ভুত একটা উত্তেজনা ভর করল। এবার উল্কার বেগে একের পর এক গলি পেরিয়ে সে শহরের একেবারে উপকণ্ঠে হাজির হলো।
এটাকে শহরের সবচেয়ে কুৎসিত এবং সবচেয়ে খারাপ অঞ্চল বলে সবাই জানে। দারিদ্র এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গি, জঘন্যতম অপরাধ করতেও এখানকার মানুষ কিছুমাত্রও ইতস্তত করে না। ঢাকনা-খোলা নালা-নর্দমা প্রতিনিয়ত দুর্গন্ধ ছড়ায়, বাতাসকে বিষাক্ত করে রাখে। পথের দুধারে যেখানে সেখানে কাঠের ভাঙা কুঁড়েঘর দাঁড়িয়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে এটা জঘন্যতম এক পরিবেশ।
এমনই এক বিশ্রি পরিবেশের মধ্যদিয়ে বুড়োটা হুটোপাটা করে এগিয়ে চলতে লাগল। আমি যে এখনও তার পিছনে চিনে জেঁকের মতো লেগে রয়েছি, আশা করি এ-কথা আর নতুন করে না বললেও চলবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কানে ভেসে এলো অগণিত মানুষের চিৎকার চাঁচামেচি হৈ হুল্লোড়। উঁকি-ঝুঁকি মেরে তাদের দেখতে পেলাম। এরা শহরের সবচেয়ে জঘন্যতম মানুষ। সমাজ থেকে বিতাড়িত মানুষের দলে আমরা এসে পড়েছি, নিঃসন্দেহ হলাম।
এখানে, এ পরিবেশে পৌঁছেই বুড়োটা যেন আবার উল্লসিত হয়ে পড়েছে। মিইয়ে পড়া লোকটার মধ্যে যেন প্রাণের স্পন্দন ফিরে এসেছে। চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে হাসির ঝিলিক।
কয়েক পা এগোতেই আমরা আচমকা অত্যুজ্জ্বল আলোতে এসে পড়েছি। বুড়োটা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ফলে বাধ্য হয়েই আমাকেও দাঁড়িয়ে পড়তে হলো। এক ভজনালয়ে গেলাম যেখানে নিয়মিত পিশাচ পূজা হয়।
রাত প্রায় শেষ। পুব-আকাশে দেখা দিল রক্তিম ছোপ।
কয়েকজন পিশাচ প্রকৃতির জন্য নিশীথ অপদেবতার মন্দিরে জনাকয়েক লোক তখনও আনাগোনা চলছে। বুড়োটা অকস্মাৎ প্রায় অশ্রুস্বরে হেসে উঠল। একে ভয়ার্ত চিৎকার বললেই হয়তো ঠিক বলা হবে।
বিচিত্রদর্শন বুড়োটা পৈশাচিক প্রকৃতির মানুষগুলোর ভিড়ে মিশে গেল। তার চোখে-মুখে লক্ষ করলাম, বন্য-শূন্য দৃষ্টি।
অপার্থিব সে ভাবকে প্রকাশ করার মতো ভাব বা ভাষা কোনোটাই আমার নেই।
এভাবে উন্মাদের মতো সবাই বার কয়েক এদিক-ওকিদক ছুটোছুটি হুটোপাটা করল। ব্যাপার দেখে মনে হলো এবার মন্দিরের দরজায় তালা পড়বে।
আমি হঠাৎ বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পড়লাম, বুড়োটার চোখে এক অবর্ণনীয় বেদনার চিহ্ন লক্ষ করলাম। সে কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও থামল না।
সে লন্ডন শহরের কেন্দ্রস্থলের উদ্দেশ্যে বিপুল বিক্রমে ধেয়ে চলতে লাগল। সে কী ক্ষীপ্রতার গতি! মুহূর্তের জন্যও সে থামল না। ফলে তার পিছন পিছন আমি তো প্রায় উন্মাদের মতো ছুটতে লাগলাম।
উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে ছুটতে যখন ডি-হোটেলের সামনে পৌঁছে গেলাম তখন পুব আকাশে সবে সূর্য উঁকি মারতে শুরু করেছে।
শহরের বুকে তখন অল্প অল্প করে ভিড় বাড়তে শুরু করেছে, ঠিক এখানেই আমি চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হলাম। এরই ফলে আমাকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হলো। বুড়োটা কিন্তু থামল না। গত রাতের মতোই সে একে ঠেলে, ওকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল। আর পথচারীদের দিকে বন্যশুন্য চাহনি নিক্ষেপ করে এগিয়ে যেতে লাগল আগের মতোই।
সারাদিন একই রকমভাবে বুড়োটা পথে পথে দাপিয়ে বেড়াতে লাগল। সে থামল না কিছুতেই।
আমি এবার হঠাৎ তার পথ রোধ করে দাঁড়ালাম। তার চোখে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। বুড়োটা কিন্তু আমার সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। একটা কথাও বলল না।
তখনই আমি বুঝতে পারলাম, নিঃসন্দেহ হলাম, এ বুড়োটার পিছন পিছন সারাজীবন ধরে হাঁটলেও তার গোপন কথা, তার গূঢ় রহস্য আর অতীত কাহিনী জানা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না, কোনোদিনই না।
সে যখন পথচারীদের ঠেলে-ধাকে গুতিয়ে গাতিয়ে আমার গা ঘেঁষে হন্তদন্ত হয়ে চলে গেল তখন ঘাড় ঘুরিয়ে আমি স্বগতোক্তি করলাম–চিনেছি, আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি। তুমিই তো এ শহরের পাপাত্মা। পথচারীদের ভিড়ের ছন্নছাড়া ভবঘুরে অপরাধ। একা থাকতে তুমি উৎসাহি নও। ভিড়ের মধ্যে মিশে তোমার অপরাধকে অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেই তোমার যত আগ্রহ। কিছু কিছু বইয়ের ভেতরে প্রবেশ করা যেমন সঙ্গত নয়, ঠিক এমনই বুদ্ধিমানের কাজ নয় কিছু মানুষের নাম-গোত্র জানতে উৎসাহি হওয়াওনির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক।
