এবার কিন্তু বড়টার মধ্যে হঠাৎ একটা পরিবর্তন লক্ষ করা গেল। সে এখন যেন আগের চেয়ে ধীর-পায়ে এবং উদ্দেশ্যহীনভাবে পথ পাড়ি দিতে লাগল। ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল, যেন নিছক হেঁটে যাওয়ার জন্যই সে হেঁটে চলেছে। তার এ-হাঁটার পিছনে সামান্যতম উদ্দেশ্যও নেই।
আমি এবার গতি আর একটু বাড়িয়ে দিলাম। কারণ হারিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক আমার মন-প্রাণ জুড়ে বসল।
গলি-পথটা যেমন সরু, ঠিক তেমন দীর্ঘও বটে। অহেতুক এমন একটা পথে চক্কর মারতে গিয়েই পুরু একটা ঘণ্টা কেটে গেল। শেষের দিকে ভিড় কিছুটা হালকা হয়ে এলো দেখলাম, একটা পার্কের দিকে বুড়োটা এগিয়ে চলেছে।
পার্কটা চৌকোণা, বেশ বড়সড়ই। চারদিকে গ্যাসের আলো জ্বলছে। দিনের আলোর মতোই ঝলমল করছে। আর ভেতরে লোক গিজগিজ করছে।
পার্কে ঢোকামাত্র বুড়োটার মধ্যে আবার পরিবর্তন লক্ষিত হলো। আগের সেই আচরণ তার মধ্যে আবার প্রকাশ পেল।
দেখলাম, তার থুতনিটা নিজের দিকে অনেকটা ঝুলে পড়েছে। চোখের মণি দুটো আগের মতোই অনবরত ঘুরতে লাগল। তার ধারের কাছ দিয়ে যারা যাচ্ছে, তার না। গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে ফেলছে, তাদের দিকে এমন কটমট করে তাকাচ্ছে, যেন জ্যান্ত গিলে ফেলবে এক-একজনকে।
এতক্ষণ পথচারিদের ঠেলে, ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এত যার ব্যস্ততা, যাকে বলে ছটফটানি পার্কে ঢোকার মুখে গিয়ে কিন্তু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, ভেতরে ঢুকল না।
পার্কের গেটের কাছে কয়েক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে থাকার পর এক সময় সে সচল হলো। পর পর সাতবার পার্কটাকে চক্কর মারল।
পার্কটাকে চক্কর মারার কাজ সেরে বুড়োটা যে-পথে এখানে এসেছিল, ঠিক সে পথ ধরেই আবার ফিরতে লাগল। কিন্তু ফিরল না। যাওয়া আর ফিরে আসা–আবার যাওয়া আবার ফিরে আসা চলতে লাগল বার কয়েক। আরে ব্যস! এ কী কাণ্ড করছে বিচিত্র দর্শন বুড়োটা!
একটু পরে হঠাৎ পিছন ফিরে সে একেবারে আমার সামনে চলে এসেছিল। তার হাবভাব দেখে আমিও সুড়ৎ করে এক পাশে চলে এসেছিলাম।
ভিড়ের মধ্যে এভাবে আসা-যাওয়া করে বুড়োটা আরও একটা ঘণ্টা কাটিয়ে দিল। বৃষ্টির বেগ আরও বেড়ে গেল সে সঙ্গে বাতাসের তীব্রতাও গেল অনেকাংশে বেড়ে। ফলে পথচারীদের সংখ্যা কমতে কমতে অনেকটা হালকা হয়ে এসেছে।
এখন বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল ব্যাপারটা লক্ষ করেই বুড়োটা যেন রাগে ফেটে পড়ার যোগাড় হলো। ক্রোধে সে ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে লাগল। ক্রোধের চেয়ে তার মধ্যে হতাশার সঞ্চারই যেন হয়েছে। ফলে মধ্যে যেন হঠাৎ অস্বাভাবিক অস্থিরতা দেখা দিল। হঠাৎ সে যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুত পা চালিয়ে সে পাশের একটা প্রায় জনবিরল পথে ঢুকে পড়ল।
লম্বা-লম্বা পা রেখে সে প্রায় সিকি মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ফেলল। তার ভাবগতিক দেখে আমি তো একেবারে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলাম। এ বয়সে এমন লম্বা লম্বা পায়ে কেউ যে হাঁটতে পারে, এটা ভেবেই আমি থ বনে গেলাম।
বুড়োটাকে নজরে নজরে রাখতে গিয়ে আমার তো মাথার ঘাম পায়ে পড়ার যোগাড় হলো।
আর কিছুটা পথ এগোতেই বুড়োটার সামনে একটা বাজার পড়ল। ব্যস, মুহূর্তের মধ্যে সে যেন আগেকার আচরণ ফিরে পেল। মনে হলো বাজারটা তার খুবই চেনাশুনা। সে একে ধাক্কা দিয়ে, ওকে গুতো দিয়ে ভিড় ঠেলে বাজারটার ভেতরে যেতে লাগল। এমনও আগেকার মতো চোখ কটমট করে প্রত্যেকের দিকে তাকাতে আরম্ভ করল, যা দেখে আমারই যারপরনাই বিরক্তি বোধ করতে লাগল।
বাজারে চক্কর মেরেই বুড়োটা দেড় ঘণ্টা কাটিয়ে দিল। সে তো দুকনুইয়ের চাপে ভিড় ঠেলে হন্তদন্ত হয়ে চলতে লাগল। কিন্তু আমি? আমার ভাগ্য সত্যি ভালো যে পায়ে পড়া ছিল এমন একটা জুতা, যা পড়ে এক মাইল হাঁটাহাঁটি করলেও সামান্য। আওয়াজও হয় না। এ জন্যই বুড়োটা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি আমরা তার পিছনে জোকের মতো লেগে রয়েছি।
লোকের ভিড়ের মধ্যেই সে দোকানে দোকানে ঢুকে এটা-ওটা অনেক কিছুই দেখল। কিছু তো কিনলই, না এমনকি কোনোকিছুর দাম-দর পর্যন্ত করল না।
তার অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা আমার বিস্ময়কে অধিকতর বাড়িয়ে দিল। আমি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, কিছুতেই বুড়োটার পিছন ছাড়ব না। এর শেষ কোথায় আমাকে দেখতেই হবে।
সুবিশাল ঘড়িটায় এগারোটার ঘণ্টা বাজল। বাজারের, এমনকি পথে লোকজনের মধ্যে ঘরে ফেরার ব্যস্ততা দেখা গেল।
একটা দোকানি দোকানের ঝাঁপ ফেলার সময় তার একটা কোণা আচমকা বুড়োটার মাথায় লাগল। সে ক্রুর দৃষ্টিতে তার দিকে নীরব চাহনি মেলে তাকাল। মুখে টু-শব্দটিও করল না। হন হন করে হাঁটতে হাঁটতে এ-গলি, সে-গলি পেরিয়ে সে আবার ডি-হোটেলের সামনের পথে ফিরে এলো। বলাবাহুল্য আমিও এলাম তার পিছন পিছন।
রাত অনেকই হয়েছে। তবুও এ অঞ্চলনিরিবিলি হয়ে তো পড়েইনি বরং এখন প্রায় জমজমাটই রয়েছে। উজ্জ্বল আলোয় পথঘাট দিনের মতোই ঝলমল করছে। বৃষ্টি জোরেই পড়ছে।
লোকজনের ভিড় কিছুটা কমে যাওয়ায় বুড়োটার চোখে-মুখে কেমন যেন বিতৃষ্ণার ছাপ ফুটে উঠল। ভিড়ের অভাবে যেন, সে মিইয়ে গেছে।
ফুসফুস নিঙড়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বুড়োটা আগের মতোই লম্বা-লম্বা পায়ে নতুন একটা পথ ধরে নদীর দিকে এগিয়ে চলল। সে কিন্তু একের পর এক গলি পেরিয়ে নদীর পাড়ে না গিয়ে হঠাৎ একটা রঙ্গালয়ের সামনে পৌঁছে গেল। সবেমাত্র একটা শো ভেঙেছে। পিঁপড়ের ঝাঁকের মতো লোক রঙ্গালয়ের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল, আনন্দ-তৃপ্ত দর্শকরা।
