অকস্মাৎ আমার মনের জমাটবাধা বিস্ময়টুকু কেটে গেল। আমি হঠাৎ একেবরে হঠাৎ চমকে উঠলাম। এক সেকেন্ডের অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের মধ্যে আমি যেন চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পেলাম, অখ্যাতির কুটিল ইতিহাসকে।
আমি মুহূর্তের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, রাতের এ অতিথির মুখটাকে কিছুতেই চোখের আড়াল হতে দেব না, কিছুতেই না। মুখটার অধিকারী ছন্নছাড়া লোকটাকে অনুসরণ করব। মোদ্দাকথা, আমি আঠালির মতো তার সঙ্গে লেগে থাকব।
তার পিছন পিছন গিয়ে আমি অজানাকে জানব, অচেনাকে চিনে নিয়ে অভিজ্ঞতার ঝোলাটাকে বোঝাই করে নেব। মুহূর্তের মধ্যেই হাত বাড়িয়ে ওভারকোটটা নিয়ে গায়ে চাপিয়ে নিলাম। বাজপাখির মতোই ক্ষীপ্রগতিতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।
আমি পথে নেমে রাতের অতিথিকে আর দেখতে পেলাম না। এটুকু সময়ের মধ্যে সে যে কোথায় মিলিয়ে গেল, কিছুই ঠাহর করতে পারলাম না। অনুসন্ধিৎসু চোখে এদিক-ওদিক তাকালাম। না ভো ভো।
আপন মনে বলে উঠলাম–যা বাবা! উদ্ভট লোকটা কী কর্পূরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল নাকি?
লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে গেলাম। অতর্কিতে দেখতে পেলাম, আমার বাঞ্ছিত লোকটা লম্বা লম্বা পায়ে চলে যাচ্ছে। আমি ততধিক ব্যস্ত পায়ে হেঁটে অচিরেই তাকে ধরে ফেললাম। সে আপন মনে হেঁটেই চলেছে।
আমি তার সঙ্গে বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে তাকে অনুসরণ করেই চললাম। কোনো পরিস্থিতিতে তার একেবারে কাছাকাছি গেলাম না। সে যাতে বুঝতে না পারে, আমি তার পিছু নিয়েছি, সেজন্য বিড়ালের মতো সন্তর্পণে পা ফেলে ফেলে চলতে লাগলাম। তবে এও সত্য যে, আমি আঠালির মতো তার সঙ্গে সেঁটেই রইলাম।
রাতের অতিথি হাঁটতে হাঁটতে গ্যাস বাতির কাছাকাছি যেতেই আমি এবার তার মুখটাকে ভালোভাবে দেখার সুযোগ পেলাম।
লোকটা কিন্তু খুব ধিঙি লম্বা নয়, বরং মোটামুটি বেঁটেখাটই বলা চলে। আর খুবই রোগাটে। হাড়ের ওপর মাংস নেই বললেই চলে। আপাত দৃষ্টিতে খুবই ক্ষীণজীবি বলেই মনে হয়। তার গায়ের জামাটামা সবই ছেঁড়াফাড়া আর ময়লা তেল চিটচিটে। তবে সবই দামি কাপড়েরর আর ডিজাইনও মনোলোভা।
আমি তাকে অনুসরণ করতে করতে বার-বার তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত নিরীক্ষণ। করতে লাগলাম। এক সময় সচকিত হয়ে একটা বিশেষ বস্তুর ওপর আমার দৃষ্টি স্থিও, নিবদ্ধ হয়ে গেল। পথের ধারের গ্যাসের উজ্জ্বল বাতিতে তার পাতলা পোশাকের আড়াল থেকে লুকিয়ে রাখা ছোরার ফলাটা আর হীরার আর চোখের সামনে ঝলমলিয়ে উঠল।
বস্তু দুটোর দিকে আমার নজর পড়তেই আমার আগ্রহ চড়চড় করে বেড়ে যেতে লাগল। তাকে অনুসরণের ইচ্ছাও মুহূর্তে প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠল।
ইতিমধ্যে রাত বাড়তে বাড়তে অনেকই হয়ে গেছে। কুয়াশাও বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হিমেল বাতাস বইতে লাগল। ব্যস, যা আশঙ্কা করেছিলাম কার্যত হলো তাই। ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামল। সে কী বৃষ্টি। আকাশে যেন কুঁড়েফেঁড়ে গেছে। একা রামে রক্ষা নেই, তার ওপর সুগ্রীব দোসর।
বরফ-শীতল বৃষ্টির পানিতে ভিজে আমি একদম জবজবে হয়ে গেলাম। যাকে বলে একেবারে কাক ভেজা। তার ওপর হিমেল বাতাস যেন রেষারেষি করে আমাকে রীতিমত জেঁকে ধরল। আমার কঙ্কালের ওপর বৃষ্টি আর বাতাস এমন নির্মমভাবে তাণ্ডব চালাতে লাগল যে, আমার হাড়গুলো পরস্পরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি শুরু করে দিল। আর দাঁতের পাটিতে পাটিতে এমন ঠোকাঠুকি চলতে লাগল যেন বাদ্যকর তারনিপুণ হাতে অনবরত বাদ্য বাজিয়ে চলেছে।
আবহাওয়ার এমন আকস্মিক পরিবর্তন পথে মিছিল করে এগিয়ে চলা মানুষগুলোর মধ্যে অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষিত হলো। সবার মধ্যে অস্থিরতা তো দেখা দিলই, সে সঙ্গে ঝপটপ অসংখ্য ছাতা খুলে গেল।
আমি বৃষ্টি আর বাতাসের খপ্পরে পড়ে ঠাণ্ডায় ঠক্ করে কাঁপলেও ভেতরে ভেতরে কেমন যেন একটা অব্যক্ত পুলকানন্দ অনুভব করতে লাগলাম। সবেই তো ব্যামো থেকে উঠেছি, আবারওনির্ঘাৎ ব্যামোর কবলে আত্মসমর্পণ করতে হবে জেনেও অভাবনীয় আনন্দটুকু থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে উৎসাহ পেলাম না।
নিরাপত্তা অবলম্বন করতে গিয়ে আমি কেবলমাত্র মুখে একটা রুমাল বেঁধে নিলাম।
বৃষ্টি নামতেই পথচারীরা এমন ঠ্যালাধাক্কা আর গুঁতোগুতি শুরু করে দিল যে, যেন রীতিমত দক্ষযজ্ঞ বেঁধে গেল।
পথে তুলকালাম কাণ্ড বেঁধে গেলেও আমি কিন্তু বিচিত্র দর্শন বুড়োটাকে কিছুতেই আমার নজরের বাইরে চলে যেতে দিলাম না। বরং অধিকতর সতর্কতার সঙ্গে তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম।
আধঘণ্টা ধরে পথচারীরা এমন তুমুল কাণ্ডে মেতে রইও যার ফলে যে কোনো মুহূর্তে বুড়োটা আমার নজরের বাইরে চলে যেতে পারত। কিন্তু আমার সতর্কতা আর নিষ্ঠা তাকে সে সুযোগ দিল না। তবে এমন আকস্মিক বিপদের মুহূর্তে আমি এগিয়ে গিয়ে সাধ্যমত তার কাছাকাছি–উভয়ের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে নিয়ে বুড়োটাকে অনুসরণ করে চলতে লাগলাম।
খুবই অত্যাশ্চর্য ব্যাপার। আমি এতক্ষণ ধরে বিচিত্র দর্শন বুড়োটাকে নীরবে অনুসরণ করেছি, এর মধ্যে সে কিন্তু মুহূর্তের জন্যও পিছন ফিরে তাকায়নি। রে আমার উপস্থিতি সম্বন্ধেও ধারণা করা সম্ভব হয়নি।
আরও কিছুটা এগিয়ে বুড়োটা আড়াআড়ি একটা গলির মতো পথ ধরল।
