কিন্তু সৈস্নব-বিদ্যার শরবারীর চৌম্বকন্দ্রিালু সৃষ্টির প্রথম প্রয়াস পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে গেল। তিনি কিন্তু এত সহজেই দমলেন না। একের পর এক প্রয়াস চালিয়েই যেতে লাগলেন–চার-চারবার তার প্রয়াস ব্যর্থ হলেও তিনি হাল ছেড়ে দিলেন না। শেষপর্যন্ত তিনি পঞ্চম বারের প্রয়াসে আংশিক সাফল্য লাভ করলেন। তারপরের বার অর্থাৎ ষষ্ঠবারের প্রয়াসেও তিনি কিছুটা সফল হলেন। অবশ্য প্রতিবারেই তিনি কঠোর পরিশ্রম, নিরবচ্ছিন্ননিষ্ঠা ও অধ্যাবসায়ের সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন।
কিন্তু আংশিক সাফল্যে তার মন তো ভরার নয়। তাঁকে পুরোপুরি সাফল্য লাভ করতেই হবে। অতএব অধিকতর ধৈৰ্য্য ওনিষ্ঠার সঙ্গে তাঁকে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মগ্ন হতে হবে। তিনি করলেনও তাই। আবারও গবেষণায় লিপ্ত হলেন–একের পর এক ব্যর্থতা আর আংশিক সাফল্যের পর শেষপর্যন্ত দ্বাদশ প্রয়াসে সৈসব-বিদ্যার চিকিৎসক সম্পূর্ণ সাফল্য লাভ করতে সক্ষম হলেন।
পরীক্ষার সম্পূর্ণ সাফল্যলাভের পর থেকেই রোগীর ইচ্ছাশক্তি খুবই দ্রুত চিকিৎসকের ইচ্ছাশক্তির কাছে নিজেকে সঁপে না দিয়ে পারল না। এবার থেকে উভয়ের ইচ্ছাশক্তির একই মিলিত ধারায় প্রবাহিত হতে লাগল।
আর এ কারণেই রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের সঙ্গে যখন আমার পরিচয় ঘটল তখন কেবলমাত্র চিকিৎসকের ইচ্ছাশক্তির কাছে পরাভূত হয়ে, রোগীর ইচ্ছাশক্তি ক্রমে স্তিমিত হতে হতে এক সময় ম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করে, ঘুমিয়ে পড়ে। অচিরেই ঘুমে একেবারে অচৈতন্য হয়ে পড়ে। এমনকি পঙ্গু রোগীর যদি চিকিৎসকের উপস্থিতির কথা জানা না-ও থাকত, তবু এ রকম কাণ্ড ঘটত। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য হলেও সত্য।
বর্তমানকালে অর্থাৎ ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে এমন একটা অদ্ভুত অবিশ্বাস্য অযৌক্তিক ঘটনা হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন চোখের সামনে দেখছে। আজকের মানুষ আর এরকম ঘটনার মুখোমুখি হয়ে কিছুমাত্রও অবাক হচ্ছে না। কিন্তু যে সময়ের কথা আমি এখানে ব্যক্ত করছি তখনকার মানুষ এরকম ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেই ভয়ঙ্কর কিছু একটা মনে করে রীতিমত স্তম্ভিত হয়ে যেত।
একটা কথা এ প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার, বেডলোর কথাবার্তা খুবই মিটমিটে, সহজেই রেগে যান। তবে তার মধ্যে আগ্রহের বিন্দুমাত্রও অভাব কোনোদিনই লক্ষিত হত না। তার কল্পনাশক্তি ছিল বিশেষ রকমের শক্তিশালী, সৃজনশীলও বটে। অবশ্য এ রকমটা ছিল নিয়মিত আফিমের গুলি উদরস্থ করার জন্যই। আর আফিমের পরিমাণ একটু বেশি মাত্রায়ই গ্রহণ করতেন। এও সত্য যে, প্রতিদিন যথেষ্ট পরিমাণে আফিম না গিলে তার পক্ষে বেঁচে থাকাই ছিল কঠিন সমস্যা। সমস্যা বললে ঠিক বলা হবে না, বরং আফিম না গিলে তাঁর পক্ষে বেঁচে থাকা একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার ছিল। তার কল্পনাশক্তি আরও অনেক বেশি তীব্র হয়ে ওঠে।
প্রতিদিন সকালে কিছু আহারাদির পর, এক কাপ কফি পানের পরই বেশ কিছু পরিমাণে আফিম খাওয়া ছিল তার অভ্যাস। এ অভ্যাসের এতটুকুও হেরফের হবার জো ছিল না।
আফিম সেবনের পর তিনি মেজাজ চাঙা করে নিয়ে বেড়িয়ে পড়তেন হাঁটাহাঁটি করতে। কখনও একা, আবার কখনও বা পোষা-প্রিয় কুকুরটাকে সঙ্গে নিয়ে চার্লোটেস্–ভিলের দক্ষিণ-পশ্চিমের অরণ্যে ছায়া মনোরম প্রাকৃতিক শোভামণ্ডিত পর্বতশ্রেণির গা ঘেঁষে এগিয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা পথ ধরে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি যখন নিজের আস্তানায় ফিরে আসতেন, তখন সূর্যদেব পাহাড়ের মাথায় না উঠলেও পাহাড়ের গা-বেয়ে অনেকটা ওপরে উঠে আসত। সেখানকার অধিবাসীরা ওই পর্বতশ্রেণিকে বন্ধুর পর্বতমালা বলে সম্বোধন করে সম্মান প্রদর্শন করত।
নভেম্বরের শেষের দিকে একদিন। সেদিন সকাল থেকেই ভ্যাপসা গরম চলছিল। ঘন কুয়াশা প্রকৃতিকে ছেয়ে রেখেছিল। আর কুয়াশার দাপটে সূর্যের আলো একেবারেই ম্লান হয়ে পড়েছিল। এমনই কুয়াশাচ্ছন্ন দিনে মি. বেড়লো প্রতিদিনের অভ্যাসমত বেড়াতে বেরোলেন। পাহাড়ের প্রায় গা ঘেঁষে এঁকে বেঁকে এগিয়ে-যাওয়া পথ ধরে তিনি হাঁটতে লাগলেন। হাঁটতে হাঁটতে তিনি কোথায়, কতদূর চলে গেলেন তা তিনি ছাড়া আর কেউ-ই জানতে পারল না। সকাল গিয়ে দুপুর এলো, তারপর এলো দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা, আর সবশেষে রাতও ঘনিয়ে এলো। কিন্তু হায়! তিনি ফিরলেন না।
রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এলে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। রাত আটটা বেজে গেলেও তিনি ফিরে না আসায় আমরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে, তাকে খোঁজ করতে লাগলাম। ঠিক তখনই একেবারে অভাবনীয়ভাবে তিনি দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে এলেন। তাঁকে দেখে আমরা যেন দেহে প্রাণ ফিরে পেলাম।
আমি অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে মি. বেডলোর আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে নিসন্দেহ হলাম, তার শরীরের অবস্থা যেমন থাকার কথা ঠিক তেমনই আছে। তার মধ্যে অসুস্থতার চিহ্নমাত্রও নজরে পড়ল না। একটা ব্যাপার দেখে আমি সবচেয়ে বেশি বিস্মিত হলাম। কেবল তাঁর চোখ-মুখে ক্লান্তির ছাপই অনুপস্থিত নয়, উপরন্তু চোখের তারায় অবর্ণনীয় হাসির ঝিলিক। তার মেজাজটা বেশি মাত্রায় চাঙা বলেই মনে হল। অর্থাৎ মেজাজ মর্জি খুশিতে ভরপুর।
আমাদের জিজ্ঞাসা দূর করতে গিয়ে মি. বেডলো তার অস্বাভাবিক বিলম্বের কারণ সম্বন্ধে যা-কিছু ব্যক্ত করলেন তা কেবলমাত্র অসাধারণ নয়, যারপনরাই অবিশ্বাস্যও বটে।
