আর দুরকম ঠকবাজ পথে ভিড়ের মধ্যে ঘুরপাক খেতে দেখা যায়–যারা কথা বেচে লোক ঠকিয়ে মালকড়ি কামায়। এদের একদল রীতিমত রাজা-বাদশা সেজে রয়েছে। আর অন্য দলটা মিলিটারির কায়দায় থেকে পা ঠুকছে।
পথচারীদের শ্রেণি বিভাগ করতে করতে ভিড় ঠেলে এক সময় হাজির হলাম ইহুদি ফেরিওয়ালাদের মেলে। কথাবার্তা আচরণ দেখলে মনে হবে এদের থেকে নিরীহ মানুষ পৃথিবীতে আর মিলবে না। কিন্তু নজর এদের বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ। মালকড়ি দেখলেই যেন অতর্কিতে ছোঁ মেরে বসবে।
আর দেখলাম অদৃষ্টবিড়ম্বিত ভিখারীদের। যারা ভাগ্যেরনিদারুণ আঘাতে জর্জরিত হয়েও আশায় আশায় ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে ভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেন কিছুতেই মরতে রাজি নয় বলেই এর-ওর সামনে ভিক্ষাপাত্রটা ধরছে। একজনের কাছ থেকে হতাশ হয়েও আবার সেটাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে অন্য জনের সামনে। এরা ভালোই জানে, জীবনে বাঁচা মানেই লড়াই, লড়াই করেই পৃথিবীতে টিকে থাকতে হবে।
বিধাতা লাঞ্ছিত ভিখারীগুলোর আয়ু প্রায় শেষ হয়ে এসেছে বুঝতে পেরেনও লোকের সহানুভূতি প্রার্থনা করে। নিতান্ত ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে নিরানন্দ কুঠরির দিকে যাওয়ার পথেও গুণ্ডা বদমায়েসদের গা জ্বালা করা ফচকিমি আর কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে খেয়ে অল্প-বয়সী মেয়ে ভিখারী সমানে চোখের পানি ঝরাচ্ছে।
আবার এমন একদল মেয়েকে দেখা যাচ্ছে যারা ঝলমলে পোশাকে প্রায় অস্তমিত যৌবনকে ঢেকে রেখে গায়ে মুখে রঙের প্রলেপ গায়ে চাপিয়ে পাপের ধান্ধায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর খদ্দের পাকড়াও করার ধান্ধায় প্রতিনিয়ত ছোঁক ছোঁক করছে।
আর গলা পর্যন্ত মদ গিলে মদ্যপরা উদাসীনভাবে, বার-বার এদিক-ওদিক ঠোকার খেতে খেতে পথ পাড়ি দিচ্ছে। আর কারো পা এমন টলমলে, যে কোনো মুহূর্তে মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে পারে। তাদের কারো গায়ে দীনবেশ, কারো পোশাক ছিন্নভিন্ন আর হরেক দাগ-লাগা। এরা সংখ্যা অগণিত। তাই তাদের কত আর বিবরণ দেওয়া সম্ভব?
আর দলে দলে কাতারে কাতারে চলেছে বিচিত্র পোশাক গায়ে চাপিয়ে, গায়ে কালিঝুলি মাখা কয়লা খিনর শ্রমিক, কারখানার শ্রমিক, কুরিকামারী, রাজমিস্ত্রি, ব্যালে নাচিয়ে, বাজনা বাজিয়ে, বাদর খেলুড়ে আর ঝাড়দারের দল। হরেকরকমভাবে গতর খাঁটিয়ে পয়সা রোজগার করে এরা দিনের শেষে মাথা গোঁজার আস্তানায় ফিরে চলেছে। আমার জানালার ধার দিয়ে যাবার সময় এরা এমন বিচিত্র স্বর আর অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলছিল, যা শুনে আমার কান ঝালাপালা করেই দিচ্ছিল না কারো কথায় হাসি রেখা দায় হয়ে পড়ছিল, আবার কারো কথায় চোখের কোণে পানি ভিড় করার উপক্রম হয়ে পড়ছিল।
সত্যি বিচিত্র লন্ডন শহর। আরও বিচিত্র এখানকার মানুষগুলোর চরিত্র আর জীবনযাত্রা প্রাণালী!
এভাবেই কর্মক্লান্ত মানুষগুলো দিনের শেষে নিজের নিজের আস্তানায় ফিরছে। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। অন্ধকার ক্ৰমে গাঢ় হয়ে পড়ায় গ্যাসের বাতিগুলো যেন ক্রমেই উজ্জ্বলতর হয়ে উঠতে লাগল।
রাত বাড়ার সঙ্গে দ্র-সম্ভ্রান্ত নাগরিকরা নিজ-নিজ আস্তানায় মাথা গুঁজে অবশিষ্ট রাতের ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিতে লাগল। হ্যাঁ, যা ভেবেছি ঠিক তা-ই। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখে কালসীটে পড়া রাতে রানিরা দলবেঁধে অন্ধকার গহ্বর থেকে আলোয় বেরিয়ে আসতে লাগল। তাদের যে না এসে উপায় নেই, কারণ, অন্ধকারের। অতিথি-রাজপুত্ররা যে বুকভরা তৃষ্ণা নিয়ে অনবরত হাপিত্যেশ করে চলেছে। তাদের। তৃপ্তিদানের দায়িত্ব যে অলিখিতভাবে তাদের ওপরই বর্তেছে। তাদের যত দেখছি ততই আমার আগ্রহ ঘনীভূত হচ্ছে।
আমার চোখের সামনে বিচিত্র সব মানুষের মিছিল। বিচিত্র চরিত্রের লেবেল গায়ে এঁটে সবাই নিজনিজ গন্তব্যস্থলের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাচ্ছে। তাদের চোখের চাহনি লন্ডন শহরের চরিত্র স্পষ্টতর করে তুলেছে। সত্যি অদ্ভুত শহর লন্ডন।
আমার কৌতূহল, আগ্রহ উত্তরোত্তর বেড়েই চলল। আমি চেয়ারটাকে সামান্য টেনে কাঁচের জানালাটার একেবারে গা-ঘেঁষে বসলাম। অত্যুগ্র আগ্রহ নিয়ে আমি আবার জানালা দিয়ে পথের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিশেষ একটা মুখের ওপর আমার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। আমার হাল এমন হলো যে, কিছুতেই সে চোখটার ওপর থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
কোন মুখ, কার মুখ এটা? এ মুখের মালিকের বয়স কম হলেও পয়ষট্টি থেকে সত্তর তো হবেই। আশ্চর্য ব্যাপার। নিজের আচরণে নিজেই বিস্মিত হলাম। ওই ছন্নছাড়া বাউণ্ডুলে লোকটার মুখে এমনকি আছে যার জন্য আমাকে এমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো হা করে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে!
সে মুখটা থেকে চোখ দুটোকে সরাতে তো পারলামই না উপরন্তু আমার সত্ত্বাটা যেন অত্যাশ্চর্য মুখটার অদ্ভুত অধিকারীর ওপর আমার মানব মনের কথা জানবার, চিনবার আর বুঝবার আগ্রহ উত্তরোত্তর বেড়েই চলল।
আমার মনটা কেন হঠাৎই এমন উদ্গ্রীব হয়ে পড়ল? ছন্নছাড়া বাউণ্ডুলে গোছের লোকটার বিশেষতৃগুলোই আমার চোখ আর মনকে এমন করে প্রভাবিত করেছে।
কী মহাসমস্যাই না পড়া গেল। ওই ছন্নছাড়াটার বিশেষত্বগুলো যে কি তা কাউকে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে বলাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কেউ পীড়াপীড়ি করলে আমি শুধুমাত্র এটুকুই বলতে পারব, ওই রক্তমাস চামড়ার মুখটায় এমন সব ভাব প্রকট হয়ে উঠেছিল, যার তুলনা অন্য কোনো মানুষের সঙ্গেই করা সম্ভব নয়। সত্যি বলছি, এমন কোনো মুখের আদল, অন্য কারো মুখে ইতিপূর্বে কোথাও দেখিনি, ভবিষ্যতেও দেখব বলে সন্দেহ যথেষ্টই। তার বিবরণ নেহাৎ যদি দিতেই হয় তবে একটাই উদাহরণ আমার মাথায় আসছে, নরকের পিশাচ বুঝি দলছুট হয়ে লন্ডনের পথে নেমে এসেছে।
