জানালা দিয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আমি জনসমুদ্রের মেলা চাক্ষুষ করে চলেছি। এভাবে কিছুটা সময় কাটানোর পর হোটেলের যাবতীয় আকর্ষণ উপেক্ষা আমি অপলক চোখে পথের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে ঠায় বসেই রইলাম।
কই, এতক্ষণ ব্যাপারটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখিনি, দেখার প্রয়োজনও বোধ করিনি এতটুকুও। কেবলমাত্র পথচারীদের নাচন-কোদনের দিকেই নিজের চোখ ও মনকে ব্যস্ত রেখেছি।
শেষপর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে লক্ষ করলাম, অসংখ্য আকৃতি আর প্রকৃতি, পোশাক পরিচ্ছদ, চালচলন, মুখভঙ্গি আর পদচালনা আর মুখাবয়ব প্রভৃতি।
পথচারীদের মধ্যে অধিকাংশকে খুবই আত্মতুষ্ট মনে হলো। কাজকর্মই যেন তাদের ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা। পৃথিবীতে অন্য আর যে সব ব্যাপার স্যাপার আছে সবকিছুতেই তারা যেন দারুণ উদাসীন।
পথচারীদের ব্যাপার দেখে আমার মনে এ-ভাবনাই জাগল যে, লম্বা-লম্বা পায়ে হেঁটে গেলেই বুঝি মুক্তি-পথের সন্ধান পেয়ে যাবে। এর-ওর গুঁতো খেয়ে এলোমেলো হয়ে-যাওয়া পোশাক-পরিচ্ছদ গোছগাছ করতে করতেই তারা ঊর্ধ্বশ্বাসে হেঁটে চলেছে গন্তব্যস্থলের উদ্দেশ্যে। অন্য আর একটা দল যাদের গান শেষ করা সম্ভব নয়। এরাও কিন্তু একইরকম ব্যস্ত হয়েই পথ পাড়ি দিচ্ছে। আর চোখ-মুখ লাল করে, এক নিকাসে কথা বলে চলেছে পথ চলতে চলতেই। এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে কথা বলার মতো সামান্যতম সময়ও তাদের নেই। আশ্চর্য তাদের ব্যস্ততা।
সব মিলিয়ে তারা সম্ভ্রান্ত পরিবারে এবং মার্জিত রুচিসম্পন্ন নর-নারী, এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই।
পথচারীদের মধ্যে কেউ ব্যবসায়ী, কেউ শেয়ার বাজারের দালাল, কেউ উকিল আবার কেউ-বা নিছকই বনেদী পরিবারের মানুষ। এদের কেউ-ই কিন্তু জোর করে আমার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারল না।
জনসমুদ্রের মাঝে কেরাণি জাতটাকে খুব বেশি করে আমার নজরে পড়ছে। এদের মধ্যে আবার দুটো বিশেষ ভাগ রয়েছে। নামজাদা প্রতিষ্ঠানের অধঃস্তন কেরাণিরা আঁটসাঁট কোট-প্যান্ট, চকচকে ঝকঝকে বুট জুতা, তেল জবজবে চুল আর সচেতন ঠোঁট নিয়ে আড়ষ্ট হয়ে পথ পাড়ি দিয়ে চলেছে।
পাশের লোকদের পিছনে ফেলে রেখে এগিয়ে যাবার মুহূর্তে তারা বড়ই তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে পথ পাড়ি দিয়ে চলেছে। এ থেকেই অনুমান করে নেওয়া যেতে পাওে, এরা সমাজের কোন শ্রেণির মানুষের দলভুক্ত?
পরনের বাদামি, না হয়তো কালো কোট আর পা-জামা দেখেই বোঝা যাচ্ছে এরা কেরাণিকূল। আরাম-আয়েশ করে বসতে যাতে অসুবিধা না হয়, সেভাবেই ঢিলেঢালা করে পা-জামাটা তৈরি। আর এরা গায়ে ওয়েস্ট কোট অবশ্যই চাপাবে, আর গলায় জড়াবে মাফলার। আর সবাই চওড়া জুতা পায়ে দিয়ে থপ থপ করে পথ পাড়ি দিচ্ছে। লম্বা মোজা জোড়াকে টানাটানি করে একেবারে হাঁটু অবধি তুলে দিয়েছে।
আর এদের প্রায় প্রত্যেকের চুল নেই বললেই চলে। আবার কারো কারো মাথায় ইয়া বড় টাক চক চক করে। অদ্ভুত কায়দায় ডান কানটা, বাইরের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। দিনের পর দিন কলম গুঁজে রাখায় কানের হাল এরকম হয়েছে।
কোটের পকেটে খুঁজে দেওয়া হয়েছে গোলাকার ঘড়ি। তার ধাতব স্টেকলটায় আলো পড়ে ঝকঝক করছে। এগুলো সবই যে সাবেকি আমলে তৈরি ঘড়ি। পা থেকে মাথা পর্যন্ত অভিজাত ফুটিয়ে তোলার সাধ্যাতীত প্রয়াস এভাবেই চালানো হয়েছে। শুধু কি এ-ই? মাথা থেকে টুপিটা খুলে এহাত-ওহাত করে নাচাতে নাচাতে কেউ কেউ চলছে, এরকম দৃশ্যই বিরল নয়। আভিজাত্যকে ফুটিয়ে তোলার জন্য কেরাণিরা কত কায়দাই যে জানে, তা বলে শেষ করা যাবে না।
খুবই চটপটে স্বভাবের মনে হচ্ছে, তাদের এক নজরে দেখলেই ধরে নেওয়া যায়, পকেট মারা এদের নেশা। বড় বড় শহরের জনবহুল রাস্তায় এরা দলে দলে ঘুরে বেড়ায়। এদের পোশাক-পরিচ্ছদ আর চালচলন দেখলেই এদের চিনে নেওয়া যায়, এরা কোন ধান্ধায় পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। এরা যত, যা-ই বলুক না কেন, সম্ভ্রান্ত ঘরের মানুষ বলে এদের কিছুতেই ভুল হবে না। এদের পরিচয় পাওয়া যায়, কোমরের চওড়া বেল্ট–আগ বাড়িয়ে আলাপ জমানো আর কথা বলার আগ্রহ দেখে।
আর জুয়াড়িদের চিনতেও অসুবিধা হবার কথা নয়। ওই যে হরেক রকমের পোশাক-পরিচ্ছদ গায়ে চাপিয়ে খুশি মেজাজে পথ চলেছে, ওরা কারা? জুয়াড়ি। হয় জুয়ার আড্ডা থেকে বেরিয়ে এসেছে, নতুবা সান্ধ্য জুয়ার আড্ডায় সামিল হতে চলেছে। দেখেছেন না, কেমন সবাই কেতাদুরস্ত। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর ঝলমলে পোশাক গায়ে চাপিয়ে একেবারে ফুলবাবু সেজে এরা পথচারীদের ভিড়ে এমনভাবে মিশে পথ চলেছে যে, কার বাপের সাধ্য এদের পেশা সম্বন্ধে সামান্যতমও ধারণা করতে পারবে।
কিন্তু যাদের বিভিন্ন পরিবেশ এবং এখানকার মানুষের বিভিন্ন পেশা সম্বন্ধে কিছু ধারণাও আছে, তাদের চোখে জুয়াড়ি নিজেদের লুকোবার চেষ্টাকে অপচেষ্টা ছাড়া আর কি-ই বলা যেতে পারে। এদের কেউ ফুলবাবু সেজেছে আর কেউ বা পাদরির পোশাক গায়ে চাপিয়ে নিজেদের পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করেছে।
আরও দুটো লক্ষণ দেখে জুয়াড়িদের অতিরিক্ত দুটো দলকে চিনতে অসুবিধা হলো না। তাদের একটা লক্ষণ হচ্ছে, চাপা গলায় কথাবার্তা বলছে। আর দ্বিতীয়ত অন্যান্য আঙুল থেকে এমনভাবে নব্বই ডিগ্রি কোণে ঠেলে তুলেছে বুড়ো আঙুলটাকে যেন তাস সাফাইয়ের অভ্যাসটা রপ্ত করছে। আসলে তার সাফাইয়ের কারসাজির ব্যাপারটা সর্বক্ষণ এদের মাথায় ঘুরপাক খায়।
