মুহূর্তের মধ্যেই রাজপুত্ৰ প্ৰম্পেররা-র দেহটা নিষ্ঠুর মৃত্যুর কোলে এলিয়ে পড়ল।
পরিস্থিতি খারাপ দেখে ঠিক সে মুহূর্তেই আনন্দোল্লাসকারীদের পুরো দলটা অন্তহীন হতাশা আর হাহাকার সম্বল করে উন্মাদের মতো সাহসে ভর করে তীব্র আক্রোশে হুড়মুড় করে কালো ঘরটায় ঢুকে পড়ল। তারপর সবাই রাগে গ গস্ করতে করতে নবাগত মুখোশধারীকে জাপ্টে ধরে ফেলল। দীর্ঘদেহ অমিত শক্তিধর লোকটা আবলুস কাঠের কুচকুচে ঘড়িটার ছায়ায় অটল অনড়ভাবে দাঁড়িয়ে রইল,
আর ক্রোধোন্মত্ত আক্রমণকারীরা অনুসন্ধিৎসু নজরেনিরিখ করে যখন বুঝতে পারল যে, কবরের কালো পোশাক পরিচ্ছদে আবৃত দেহ আর মড়ার মুখোশে ঢাকা মুখের মালিককে তারা সবাই মিলে এমন ঠেসে ধরেছে, এমন নির্মম-নিষ্ঠুরভাবে চেপে ধরেছে যা দেখে সবাই তো বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবার যোগাড় হল। তারা নিঃসন্দেহ হলো কবরের পোশাক আর মুখোশের আড়ালে সত্যিকারের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য’ দেহের লেশমাত্রও নেই। ব্যাপারটা বোঝামাত্র সবাই নীরব আতঙ্কে বাশক্তি হারিয়ে ফেলল। কারো ভেতরে টু-শব্দটি করার মতোও ক্ষমতা নেই।
অত্যাশ্চর্য লোকটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সবাই বুঝতে পারল–সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ হলো দীর্ঘাকৃতি কালো কবরের পোশাক আর মড়ার মাথার খুলির মুখোশের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখা লোকটার নির্ঘাৎ ‘লাল-মৃত্যু।
রাতের অন্ধকারে চোরের মতো সন্তর্পণে সে এখানে হাজির হয়েছে।
মুহূর্তের মধ্যে অবিশ্বাস্য ভয়ঙ্কর একটা ব্যাপার ঘটতে লাগল। আনন্দোল্লাসকারীরা একে একে রক্তাপুত মেঝের ওপর আছড়ে পড়তে লাগল। আর পড়ামাত্রই সবাই নিষ্ঠুর মৃত্যুর শিকার হয়ে পড়ল।
সব শেষের পারিষদটার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ামাত্রই আবলুস কাঠের কুচকুচে ঘড়িটার প্রাণ-বায়ুও খাঁচাছাড়া হয়ে গেল। আর সে সঙ্গে তেপায়ার ওপরের চুল্লির আগুন নিভে যাওয়ায়, আলোকচ্ছটাও দুম্ করে নিভে গেল! অন্ধকারের কালো পর্দা সবার ওপর ছড়িয়ে পড়ল। ধ্বংস আর ‘লাল-মৃত্যু-র শাসনদণ্ড। আর সে সঙ্গে অবসান ঘটল যাবতীয় আতঙ্ক–মৃত্যুভয়।
দ্য ম্যান অব দ্য ক্রাউড
যাদের বই পড়ার খুবই বাতিক রয়েছে তাদের উদ্দেশ্যে বলছি–খবরদার! একটা বই কিন্তু কোনোদিনই পড়ার জন্য উৎসাহি হবেন না। সবার মুখেই একই কথা, এ-বইটা নাকি না পড়াই ভালো। এই বিশেষ বইটা জার্মান ভাষায় লেখা হয়েছে। সে যা-ই হোক, এটাকে কিন্তু সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে চলবেন।
সত্যি কথা বলতে কি, বহু গোপন ব্যাপার-স্যাপার রয়েছে যা না বলা যেমন ভালো, ঠিক তেমনই না শোনাও কম ভালো নয়।
একটা ব্যাপার প্রায়ই লক্ষ করলে দেখতে পাবেন, পাপের বোঝা মাথা থেকে নামিয়ে ফেলার জন্য অনেকেই মৃত্যুর সময় দারুণ অস্থির হয়ে পড়ে, রীতিমত কাড়াতে থাকে। চোখের সামনে তাদের সে অসহ্য যন্ত্রণা দেখা যায় না।
এতকিছু সত্ত্বেও গোপন কথা কিন্তু শেষপর্যন্ত অন্ধকার গোপন অন্তরালেই থেকে যায়। বিভীষিকায় ভরপুর মনটা কেবলমাত্র কবরের অন্ধকারে আশ্রয় পাওয়ার পরই শান্তি, স্বস্তি লাভ করে, আগে নয়। একমাত্র সেখানেই কৃত অপরাধের অবসান ঘটতে পারে, তার আগে নয়–অবশ্যই নয়।
দিন কয়েক আগেকার কথা। সেদিন সন্ধ্যায় আমি লন্ডনের ডি-কফি হাউসের অতিকায় জানালায় ধারে চেয়ার পেতে বসে সময় কাটাচ্ছিলাম।
দীর্ঘদিন আমাকে রোগ শয্যায় শরীর এলিয়ে দিয়ে কাটাতে হয়েছে। এখন একটু একটু করে রোগটা আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে। ক্রমে স্বাভাবিকতা ফিরে পাচ্ছি। আগের শক্তি সামর্থ্য ফিরে আসছে, মনও ক্রমেই চাঙা হয়ে উঠছে। এমন সময়টা যেমন আনন্দদায়ক, ঠিক তেমনই আরামদায়কও বটে। ধীর গতিতে শ্বাস নেয়া আর ছাড়ার মধ্যেও কম আনন্দ পাওয়া যায় না। আর ছোটখাট কষ্ট-যন্ত্রণাগুলোও কম আনন্দের সন্ধান দেয় না।
আমি রেস্তোরাঁর জানালার ধারে চেয়ারের শরীর এলিয়ে দিয়ে খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনের ওপর চোখের মণি দুটো বুলিয়ে আর চুরুট থেকে অনবরত ধোয়া ছেড়ে কাটিয়ে দিয়েছি। আর ঘরে যারা আসা যাওয়া করছে, তাদের চাল-চলন আর কথাবার্তা সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ করেছি। আসলে কাজ না থাকলে যা হয়।
তারপর সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার ঘনিয়ে এলে ঘোলাটে কাঁচের মধ্যদিয়ে রাস্তার ওপর চোখের মণি দুটোকে অলসভাবে বুলোতে লাগলাম।
লন্ডনের যে কয়টা রাস্তায় সারাদিন অস্বাভাবিক ভিড় আর ঠেলা-ধাক্কা লেগেই থাকে, তাদের মধ্যে এটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। না, কেবলমাত্র উল্লেখযোগ্য বললে ঠিক বলা হবে না, এটাতেই সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায়। মানুষ আর গাড়ি-ঘোড়ার মিছিল যেন সবসময় লেগেই থাকে।
আর দিনের বেলা তো ঠেলা-ধাক্কা এড়িয়ে পথ চলাই সমস্যা হয়ে যায়। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলে ভিড় বাড়তে বাড়তে এমন একপর্যায়ে পৌঁছায় যা আর কহতব্য নয়।
ল্যাম্পপোস্টগুলোর মাথায় টিম টিম করে বাতি জ্বালার পর যে দিকেই চোখ ফেরানো যাক না কেন, দেখা যায় কেবল মাথা। যেন রাস্তা দিয়ে মাথাগুলো মিছিল করে চলেছে। দেখলাম, পিঁপড়ের মতো সাড়ি বেঁধে মাথা যাচ্ছে আর আসছে। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ যেমন ক্রমাগত বয়ে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে একই গতিতে, একই তালে।
কিন্তু কই, ইতিপূর্বে এ-জায়গায় তো মানুষকে এমন মিছিল করে যেতে দেখিনি।
