এ নতুন মুখোশধারীর কথা মুখে-মুখে সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ামাত্র একটা চাপা ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল, যা শেষপর্যন্ত ভয়ানক ভয়, তীব্র আতঙ্ক আর অভাবনীয় বিরক্তির উচ্ছ্বাসে পরিণত হয়ে গেল। সংক্ষেপে যাকে ঘোরতর আপত্তি আর বিস্ময়ের হৈ হুল্লা আখ্যা দেওয়া যেতে পারে।
সত্যি কথা বলতে কি, সে রকমের অলৌকিক সমাবেশের বর্ণনা আমি তুলে ধরেছি তাতে সহজেই অনুমান করা যেতে পারে যে কোনো সাধারণ মানুষের উপস্থিতি লোগুলোকে এত বেশি আতঙ্কিত ও উত্তেজিত করে তুলতে কিছুতেই সক্ষম হত না।
আসল ব্যাপারটা হচ্ছে, মুখোশধারী নাচের আসরে যোগদান করে আনন্দোল্লাস করার জন্য দিল খোলসা করে অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু অপরিচিত মুখোশধারী নাচিয়েটা রাজপুত্রের নির্ধারিত বিধি-নিষেধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সবাইকে ডিঙিয়ে চলে গেল। ব্যাপারটা উপস্থিত দলের সবাই অনুভব করল, পোশাক পরিচ্ছদ আর আচার আচরণ কোনো দিক থেকেই নতুন মুখোশধারী লোকটা বুদ্ধিসত্তা বা ভদ্রতার কোনো পরিচয়ই দিতে পারেনি।
মুখোশধারী নবাগত লোকটা ছিপছিপে লম্বা, আর তার পা থেকে মাথা অবধি সারা দেহ কবরের পোশাকে মোড়া। যে পোশাক-পরিচ্ছদ সে নিজেকে ঢেকে নিয়েছে সেটা এত বেশি শক্ত দেখাচ্ছে যার একমাত্র তুলনা চলতে পারে মড়ার মুখের সঙ্গে, যেটাকে খুব ভালো করে লক্ষ্য না করলে কিছুতেই বোঝার জো নেই। খুবই কষ্টকর।
তা সত্ত্বেও আনন্দোচ্ছল হৈ হুল্লাকারী মানুষগুলো হয়তো সবকিছুই বরদাস্ত করেনিত। কিন্তু ইতিমধ্যেই মুখে মুখে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে যে, নবাগত এ মুখোশধারীই ‘লাল মৃত্যু। নবাগত মুখোশধারীকে লাল-মৃত্যু ভাববার কারণও রয়েছে যথেষ্টই। তার পোশাক পরিচ্ছদে রক্ত মাখামাখি, ইয়া বড় চোখের ওপরে চওড়া জ্ব। নাক-মুখ সবকিছুতেই রক্তিম আতঙ্কের ছাপ সুস্পষ্ট। মুহূর্তের জন্য চোখ ফেরালেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, বুকের ভেতরে শুরু হয়ে যায় ঢিবঢিবানি।
নবাগত মুখোশধারী বাজখাই গলায় গর্জে উঠল-কার এত স্পর্ধা!’ আমাকে এমন অপবিত্র উপহাসের মাধ্যমে অপমান করার মতো এতবড় বুকের পাটা কার, জানতে চাই। তাকে ধর, জোর করে মুখোশটা খুলে ফেল। আমরা তার মুখটা একবার দেখতে চাই। তাকে চিনতে চাই, কাল সূর্য ওঠার আগেই তাকে ফাঁসির দড়িতে লটকে দিতে হবে। ধর তাকে, মুখোশটা খুলে ফেল।’
পূর্ব দিকের, নীল রং বিশিষ্ট ঘরে দাঁড়িয়ে রাজপুত্র বজ্রগম্ভীর স্বরে কথাগুলো ছুঁড়ে দিলেন। তার তীব্র কণ্ঠস্বর সাতটা ঘর থেকেই স্পষ্ট শোনা গেল। কারণ রাজপুত্র দুর্দান্ত সাহসি, আর গায়ে শক্তিও ধরে যথেষ্টই। আর তার হাতের ইশারায় মুহূর্তের মধ্যেই যাবতীয় বাজনা বন্ধ–স্তব্ধ হয়ে গেছে। টু-শব্দটিও কারো মুখে নেই।
নীল-ঘরটায় রাজপুত্রের পাশে একদল পারিষদ বিমর্ষমুখে দাঁড়িয়ে। তাদের কারো মুখেও কোনো কথা নেই,নির্বাক-নিস্পন্দ।
রাজপুত্রের মুখের হুকুমটা শোনামাত্র একদল লোক তীব্র আক্রোশে নবাগত মুখোশধারীর দিকে তেড়ে গেল। সে-ও অদূরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে এবার লম্বা লম্বা পায়ে রাজপুত্রের কাছে এগিয়ে এসে একেবারে কাছাকাছি চলে এলো।
দলের কিছু লোক রাজপুত্রের হুকুমে তার দিকে তীব্র আক্রোশে তেড়ে গেল বটে, কিন্তু কাছে যেতেই সবাই অজানা আতঙ্কে রীতিমত মিইয়ে গেল। ফলে তার গায়ে হাত দিতেই কারোরই সাহসে কুলালো না।
আর এরই ফলে সে বিনা বাধায় আরও দু পা এগিয়ে একেবারে রাজপুত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ল। উভয়ের ব্যবধান মাত্র এক গজ।
পরিস্থিতি প্রতিকূল বিবেচনা করে উপস্থিত পারিষদরা চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ এঁকে এক সঙ্গে ঘরের মাঝখান থেকে যন্ত্রচালিতের মতো পিছাতে পিছাতে একেবারে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বুকে জমাটবাঁধা আতঙ্ক নিয়ে প্রতিটা মুহূর্ত কাটাতে লাগল। আর নবাগত মুখোশধারী তখন নির্বিবাদে দৃঢ় পদক্ষেপে নীল রংয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে লাল রংয়ের ঘরে, লাল রংয়ের ঘর থেকে সবুজ রংয়ে, সবুজ রংয়ের ঘর থেকে কমলা রংয়ের ঘরে ঢু মারল। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে বীরদর্পে সাদা রংয়ের ঘরে, তারপর এমনকি বেগুনি রংয়ের ঘরটা ঘুরে সে আরও এগিয়ে চলল।
কিন্তু কার্যত দেখা গেল রাজপুত্রের হুকুম তামিল করতে কেউই তাকে বন্দি করা তো দূরের ব্যাপার, এমনকি এক পা এগোতেও সাহসি হলো না।
ব্যাপারটা যা-ই ঘটুক না কেন, ঠিক সে মুহূর্তেই রাজপুত্র প্রস্পেরো নিজের আকস্মিক ও সাময়িক ভীতি, রাগ ও লজ্জায় মিইয়ে গিয়ে একের পর এক করে ছয় ছয়টা ঘরের ভেতর দিয়ে ছুটোছুটি করতে লাগলেন।
পরিস্থিতি সুবিধার নয় দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত পারিষদদের কেউ-ই রাজপুত্রের সঙ্গনিল । তারা সে ঘরটায় দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আগের মতোই পরমাধ্যকে স্বরণ করতে লাগল।
নবাগত মুখোশধারী আগের মতোই বীরদর্পে এগিয়ে চলল। এদিকে রাজপুত্র সুতীক্ষ্ম লকলকে ছুরি হাতে মুঠো করে ধরে লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে তার তিন চারফুটের মধ্যেই পৌঁছে গেলেন।
ইতিমধ্যে নবাগত মুখোশধারীও ভেলভেটের পর্দায় মোড়া ঘরটার একেবারে শেষপ্রান্তে হাজির হয়ে আচমকা ঘুরে দাঁড়িয়ে পড়ল। আর অনুসরণকারীরা রাজপুত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ল।
ব্যস, মুহূর্তে তার কান্নার স্বর উত্থিত হল। আর তার হাতের ছুরিটা কালো কার্পেটের ওপর দুম্ করে আছড়ে পড়ল। তার ওপর চুল্লির অত্যুজ্জ্বল আলোকচ্ছটা পড়ে রীতিমত ঝলমল করতে লাগল।
