বাদ্যকররা নিজেদেরনির্বুদ্ধিতা এবং স্নায়ুবিক দুর্বলতাবশত একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে ফিক ফিক্ করে হাসে আর অনুচ্চ কণ্ঠে পরস্পরের কাছে প্রতিজ্ঞা করে–ঘড়িটা যখন পরবর্তীকালে আবার বেজে উঠবে তখন তারা কিছুতেই যেন এমন বেহাল হয়ে পড়ে, কিছুতেই না। কিন্তু মাত্র ষাট মিনিট, যা উড়ে যাওয়ার সময়ের তিন হাজার দুশো সেকেন্ডের সমান সময় পার হওয়া মাত্র আবার যখন ঘড়িটার ঘণ্টাধ্বনি হতে শুরু করে তখনই চোখে পড়ে আগের মতোই বে-সামাল, চঞ্চল, শরীর দোলানি, দিবাস্বপ্নে বিভোর আর ধ্যান-ধ্যানভাবে সবাই নিজেদের ডুবিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু এত কিছু করার ফলেও সে নাচ-গান-বাজনা আর হৈ চৈ আনন্দ ফুর্তির আসরটা আগের মতোই আনন্দোচ্ছল হয়ে উঠল।
আসরটার পরিকল্পনা অকল্পনীয় দুঃসাহসিকতা আর অগ্নিময়তায় ভরপুর। তার ভাবগতিতে একটা বল্গাহীন বর্বরতা প্রকাশ পাচ্ছে।
এমনও হতে পারে, কেউ তাকে পাগল, বদ্ধ পাগল ভাবছে। তা হোক গে, তার অনুচররা তো আর ভুলেও এটা ভাবে না।
একটা কথা, তার যে মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেনি, পাগল হয়ে পড়েননি, এ ব্যাপারে নিসন্দেহ হতে হলে তার কথা শুনতে হবে, চোখের সামনে দেখতে হবে আর তাকে ছুঁতে হবে। অন্যথায় তার সম্বন্ধে সবকিছু ভালোভাবে জানা কিছুতেই সম্ভব নয়।
এ জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এ সাতটা ঘরের অস্থাবর সাজ সরঞ্জামগুলোকে এদিক-ওদিক সরানো হয়েছে।
রাজপুত্রের মর্জি আর মার্জিত রুচি অনুযায়ী অনুষ্ঠানটি পরিচালনার উকর্ষতার জন্যই মুখোশধারীদের আচার আচরণে নতুনতর বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাচ্ছে।
সত্যি করে বললে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মুখোশধারীরা সবারই চেহারা, বিশেষ করে মুখাবয়ব খুবই কদাকার। তাদের চেহারায় ঔজ্জ্বল্য, চটক, তীব্রতা আর অলৌকিকতা মধ্যে যা-কিছু লক্ষিত হয়েছিল তার অধিকাংশ বর্তমান। আর সে সঙ্গে অদ্ভুত আর বিশেষ সাজসজ্জাও রয়েছে। আর এমন বহু উন্মাদসুলভ চিন্তা-ভাবনার খেলা চোখে পড়ে যা কেবলমাত্র বিকৃত মস্তিষ্কদের পক্ষে করা সম্ভব।
আরও আছে। এখানে এমন বহু চমঙ্কার, বহু কামপরায়ণ, বহু কিছু কদাকার, একটু আধটু মারাত্মক, আর বিরক্তি উদ্রেককারী যা-কিছু বর্তমান তাকেও নগণ্য জ্ঞান। করা যায় না।
একের পর এক করে সাত-সাতটা ঘরময় অগণিত স্বপ্ন যেন অনবরত চক্কর মেরে বেড়াচ্ছে। আর এসব স্বপ্নরা হেলেদুলে নেচে নেচে এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যাতায়াত করছে। নানা ঘরের রংয়ের প্রলেপ গায়ে মেখে। আর বার বারই যেন মনে হচ্ছে।
অর্কেস্ট্রার উন্মত্ত সুরগুলো হয়তো বা তাদেরই পদচারণার প্রতিধ্বনি।
ওই ওই যে, ভেলভেটের চাদরে মোড়া হলঘরটার দেয়ালে ঝোলানো আবলুস কাঠে মিশমিশে কালো ঘড়িটা ঢং ঢং আওয়াজ করে বাজবে। ব্যস, আওয়াজটা বন্ধ হতেই মুহূর্তের জন্য সবকিছু একেবারে স্তব্ধ–শুনশান। একমাত্র ঘড়িটার টিক্ টিক্ আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দই নেই।
স্বপ্নগুলো নিশ্চল হয়ে পড়েছে, যেন জমাটবাঁধা বরফের মতো স্তব্ধ। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই ঘড়িটার ওই টিক্ টিক্ শব্দের প্রতিধনি মিলিয়ে গেল। পর মুহূর্তেই সে প্রতিধ্বনিটাকে অনুসরণ করে, তাকে পিছনে ঠেলে দিয়ে একটা চাপা হাসি যেন বাতাসের কাঁধে ভর দিয়ে এগিয়ে এলো ধীরে ধীরে একইভাবে ভাসতে ভাসতে দূরে, শ্রুতির বাইরে চলে গেল।
অর্কেস্ট্রা বাদকরা আবার সক্রিয় হল, আবার বাজনা বেজে উঠল। স্বপ্নগুলো এক এক করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল।
তেপায়ার চুল্লির আলোর অদ্ভুত স্রোতে স্বপ্নগুলো মাখামাখি হয়ে হেলেদুলে উল্লসিত পদচারণার মাধ্যমে এ-ঘর থেকে ও-ঘরে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
মুখোশধারীরা এক-এক করে সবগুলো ঘরেই গেল। কিন্তু পশ্চিম দিককার একেবারে শেষ প্রান্তের ঘরটায় কেউই ঢুকতে সাহসি হলো না। রক্তিম কাঁচ ভেদ করে অত্যুজল লাল আলোর রেখা ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। দোদুল্যমান কালো পর্দাগুলো ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। অদূরবর্তী আবলুস কাঠের ঘড়িটা থেকে যে শব্দ কানে এসে বাজছে, সেটা দূরবর্তী অন্য সব ঘরের তুলনায় এ-ঘরটায় ঢুকছে অনেক, অনেক বেশি গুরুগম্ভীর আওয়াজ হয়ে তার কানে বাজছে।
অন্যান্য ঘরগুলো কিন্তু মানুষের ভিড় উপচে পড়ছে, তিল ধারণের জায়গাটুকু পর্যন্ত নেই। সে সব ঘরে প্রাণের স্পন্দন সবচেয়ে তীব্র সুরে বেজে চলেছে।
আনন্দোল্লাস যখন একনাগাড়ে একই তালে চলছে ঠিক তখনই আবলুস কাঠের ঘড়িটায় ঢং ঢং করে মাঝ রাতের ঘণ্টা বেজে উঠল।
ব্যস, আর এক মুহূর্তও নয়, সঙ্গে সঙ্গে বাদ্যকররা বাজনা থামিয়ে দিল। পায়ের তালে তালে আওয়াজ করে করে ওয়ালেজ নাচনেওয়ালিদের পায়ের তাল থেমে গেল। শুধু কি এই? অস্বস্তিকর আর যা-কিছু সবই মুহূর্তের মধ্যেই থেমে গেল।
এবার ঘড়িটা ঘণ্টাধ্বনির মাধ্যমে বারোটা বাজার কথা ঘোষণা করতে লাগল।
এদিকে হৈ হুল্লাকারীদের মধ্যে যারা একটু বেশিমাত্রায় ভাবুক তাদের মাথায় ঢুকল আরও বেশি চিন্তা, আর সেগুলো জট পাকাতে লাগল।
এভাবে ঘড়িটার শেষ ধ্বনিটার প্রতিধ্বনিটা একেবাওে নিঃশেষ মিলিয়ে যাবার আগেই ভিড় করে অবস্থানরত লোকগুলোর মধ্য থেকে কয়েকজনের দৃষ্টি এমন এক মুখোশধারীর ওপর পড়ল যাকে ইতিপূর্বে কেউই কোনোদিন দেখেনি।
