বহু রাজপ্রাসাদেই এরকম ঘরগুলো পাশাপাশি লম্বা সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করে আর সাজানোও থাকে চমৎকারভাবেই।
ঘরগুলোর দরজা এমন কায়দায় তৈরি যে, সেগুলোকে খুলে দেওয়ামাত্র দুদিকের দেওয়ালের গায়ে গায়ে সেঁটে যায়। ফলে কেবলমাত্র খুব যে শোভন হয় তাই নয়, জায়গাও নষ্ট হয় খুবই কম। আর এতে ঘরের পুরো দৃশ্যটা দেখতে সামান্যতম অসুবিধাই হয় না।
এ মঠের ব্যবস্থাদি কিন্তু সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধরনের। রাজপুত্রের আকর্ষণ অদ্ভুত কোনোকিছুর প্রতি অনুরাগ যা আশা করা যেতে পারে। এমন অগোছালভাবে ঘরগুলো তৈরি আর সাজানো যে এক সঙ্গে তাদের একটার বেশি অন্য কোনো ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখার সামান্যতম সুযোগও নেই।
এখানকার আর যা-কিছু লক্ষ্যণীয় তা হচ্ছে, প্রতি বিশ বা ত্রিশ গজ দূরে দূরে একটা করে খাড়া বাঁক গড়ে রোখা হয়েছে, যার জন্য প্রত্যেক বাঁকে অদ্ভুত ফল হয়েছে। বাঁ আর ডাইনের প্রত্যেক দেওয়ালের গায়ে একটা করে লম্বা ও সরু জানালা বসানো রয়েছে। এগুলোতে গণিক শিল্প-কৌশল অবলম্বিত হয়েছে। আর এগুলো এমনভাবে বসানো হয়েছে যে, প্রত্যেক জানালার পিছনে একটা করে বদ্ধবারান্দা ঘরগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। আর জানালাগুলোতে রঙিন কাঁচ বসানো। আরও একটা ব্যাপার লক্ষ্যণীয় যে, ঘরের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে জানালাগুলোর কাঁচের রং নির্বাচন করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে একেবারে পূব দিককার ঘরটার কথা বলা যেতে পারে–ঘরটার ভেতরে নীল রং করা, তাই জানালায় রঙের ব্যবহার করা হয়েছে নীল রঙের কাঁচ।
আর দ্বিতীয় ঘরটার পর্দা থেকে শুরু করে সবকিছুর রং লাল। তাই জানালার কাঁচের রংও লাল রক্তের মতো গাঢ় লাল।
আর তৃতীয় ঘরটার সবকিছুই সবুজাভ, তাই জানালায় ও সবুজ কাঁচ লাগানো হয়েছে। চতুর্থ ঘরটার ভেতরের সবকিছুই সবুজ রংবিশিষ্ট তাই জানালার কাঁচ সবুজই।
চতুর্থ ঘরের রং এবং অন্যান্য যাবতীয় সাজসজ্জা কমলা রংয়ের, জানালাও তাই। পঞ্চম ঘরের যাবতীয় রং ও ভেতরের অন্যান্য সবই সাদা, জানালার কাঁচও সাদাই ব্যবহার করা হয়েছে। আর ষষ্ঠ ঘর জানালার কাঁচসহ সবকিছু সাদা।
আর সপ্তম ঘরটার কালো রংয়েরই একাধিপত্য লক্ষিত হয়। এর সিলিং থেকে নেমে-আসা কালো ভেলভেটের পর্দা দিয়ে দেয়ালগুলো মুড়ে দেওয়া হয়েছে। আর সেগুলো মেঝের কালো কার্পেটের ওপর চমৎকারভাবে ভাঁজ হয়ে পড়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আর বসার আসন থেকে শুরু করে ঘরে আর যা-কিছু আছে সবই কালো। কিন্তু ব্যতিক্রম কেবলমাত্র জানালার কাঁচগুলোতে। এগুলো নিয়মমাফিক কালো না হয়ে গাঢ় লাল রং বিশিষ্ট।
এ সাতটা ঘরের মেঝেতে হরেক রকম জিনিসপত্র আবার ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে প্রচুরসংখ্যক সোনালি রঙের প্রলেপ দেওয়া অনেক কিছু। কিন্তু কোনো ঘরেই বাতিদান নেই। ফলে কোনো ঘরের ভেতরের জ্বলন্ত মোমবাতির আলো জানালার রঙিন কাঁচ ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে না বা বাইরে এসে লুটিয়ে পড়ছে না।
তবে প্রতিটি জানালার পিছন দিককার বারান্দায় একটা করে ভারী তে-পায়া রাখা আছে। তাদের প্রতিটার ওপর রক্ষিত চুল্লি থেকে ঠিকরে বেরিয়ে-আসা আলোক ছটা রঙিন কাঁচ ভেদ করে ঘরের ভেতরের সবকিছু গায়ে আভা ছড়িয়ে দিয়ে উদ্ভাসিত করেছে। এভাবে সম্পূর্ণ বাড়িটা বিচিত্র রঙে নিজেকে সাজিয়ে তুলেছে।
এ তো গেল পশ্চিম দিকের বা কালো ঘরটা ছাড়া অন্যান্য ঘরগুলোর বিবরণ। কিন্তু কালো ঘরটার চুল্লি থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসা আলোকচ্ছটার ফল দাঁড়িয়েছে সম্পূর্ণ অন্যরকম।
লাল রংয়ের কাঁচ ভেদ করে চুল্লির আলো ঠিকরে বেরিয়ে এসে ঘরের ঝুলন্ত যাবতীয় আসবাব পত্রের ওপর পড়ার ফলে এক অলৌকিক রংয়ের উদ্ভব হয়েছে। শুধু কি এ-ই? যারাই এ ঘরে ঢুকছে, তাদের মুখের ওপরই সে আলোকচ্ছটা পড়ায় এমন অমানবীয় দৃশ্যের অবতারণা করেছে যা প্রত্যক্ষ করে অন্য কেউ-ই সে ঘরে ঢুকতে উৎসাহি হচ্ছে না, কারো সাহসে কুলাচ্ছে নাও বলা যেতে পারে।
আর সে ঘরটার পশ্চিমের দেয়ালটার গায়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে আবলুস কাঠের সুবিশাল একটা ঘড়ি। কুচকুচে তার রং। অনবরত টিটিক আওয়াজ করে তার পেন্ডুলামাটা এদিক-ওদিক দুলেই চলেছে। মিনিটের কাটাটা ঘুরতে ঘুরতে এক ঘণ্টা পর পর যখন ঘড়িটা বেজে উঠছে, সে মুহূর্তেই তার ধাতব গর্ভস্থল থেকে বেরিয়ে আসছে গুরুগম্ভীর কিন্তু সুরেলা ধ্বনি।
কিন্তু ঘড়িটার মিষ্টি মধুর সুরেলা ধ্বনিটার তাল ও তীব্রতা এমনই আকর্ষণীয় যে প্রতি এক ঘণ্টা পর পর অর্কেস্ট্রা বাদ্যকররা সে মনোলোভা ধ্বনি শোনার জন্য বাজনা বন্ধ করে উকৰ্ণ হয়ে থাকে। আর বাজনা বন্ধ করার জন্য, লোভনীয় আওয়াজটা শোনার জন্য আগ্রহান্বিত হয়ে নাচ থামিয়ে থমকে আচমকা দাঁড়িয়ে না পড়ে পারে না। তাই আনন্দপ্রিয় বাজনা আর নাচ-গানের সম্পূর্ণ দলটাই কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও তাল হারিয়ে না ফেলে পারে না।
ঠিক তখনই অকল্পনীয় একটা ব্যাপার ঘটতে দেখা যায়। ঘড়িটা তখনও সমান তালে বাজতেই থাকে। তখনই চোখে পড়ে যাদের মধ্যে চাঞ্চল্য, ছিল তাদের মুখে যেন হঠাই কেমন চকের মতো ফ্যাকাশে ছাপ ফুটে ওঠে। আর সে মুহূর্তেই বুড়ো আর অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা জ্বতে আঙুল বুলাতে আরম্ভ করে। তাদের বাব দেখে মনে হয় তারা যেন দিবাস্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়েছে, নইলে ধ্যানমগ্ন হয়ে রয়েছে।
