আমার বন্ধুবর দুপের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল থাকা সত্ত্বেও পুলিশের বড় সাহেব ভদ্রলোক কিন্তু তাকে ঘটনাটাকে কেন্দ্র করে একটু-আধটু জ্ঞান দেয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করলেন তো না-ই বরং নিজের জ্ঞানভাণ্ডার উজাড় করে আমার বন্ধুর জ্ঞানের ঘাটতিটুকু পূরণ করতে প্রয়াসী হলেন।
আমার বন্ধুবর দুঁপ তার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে বললেন–মি, একে বলার সুযোগ দিন। কিছু বলুক। এর ফলে এর বিবেক একটু হলেও শান্ত হবে। একে ঘায়েল করতে পারার জন্যই আমি যথেষ্ট আনন্দিত হয়েছি। তবু এর পক্ষে যে রহস্যটা ভেদ করা সম্ভব হয়নি তাতে অবাক হবার কিছু নেই। কারণ, আসলে আমাদের অভিন্ন হৃদয় বন্ধু পুলিশের এ বড় সাহেব চালাক সন্দেহ নেই। কিন্তু ইনি যতটা চালাক ততখানি বুদ্ধি কিন্তু রাখেন না। তবে সব মিলিয়ে মানুষ হিসেবে বড়ই ভালো, স্বীকার না করে উপায় নেই। আমি কিন্তু একে মনে প্রাণে ভালোবাসি, এর বাছা বাছা কথাবার্তার জন্য যা সম্বল করে ইতি-খ্যাতি অর্জন করেছেন। কথাটা বলা শেষ করেই তিনি রুশোর একটা বাণী গড় গড় করে বলে গেলেন।
আমি সবিস্ময়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
দ্য মাস্ক অব দ্য রেড ডেথ
লাল মৃত্যু!
বহুদিন আগেই লাল মৃত্যু দেশটাকে একেবারে তছনছ করে দিয়েছিল।
আজ পর্যন্ত অন্য কোনো মহামারীই লাল মৃত্যুর মতো ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে দেখা দেয়নি।
রক্ত! টকটকে লাল রক্ত! রক্তের লাল রং আর ভয়াবহতাই–তার অবতাররূপে গণ্য হয়।
গোড়ার দিকে ভয়ানক ব্যথা বেদনা আর আকস্মিক ঝিমুনি ভাব দেখা দেয়। তারপর তা দ্রুত বেড়ে যেতে থাকে। তারপরই লোমকুপ থেকে গল গল করে রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে যায়। এভাবেই অনিবার্য মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির সর্বাঙ্গে, বিশেষ করে মুখাবয়বে রক্তাভ গোল গোল দাগের জন্যই আত্মজনরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তার কাছ থেকে দূরে চলে যায়। তার প্রতি কেউ-ই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় না, কারো সহানুভূতিই তার বরাতে জোটে না।
ভয়ঙ্কর এ রোগটা আক্রমণ করার পর তার ব্যাপ্তি আর মৃত্যু সবকিছুই মাত্র আধ। ঘণ্টার মধ্যে মিটে যায়।
রাজপুত্র ভ্রস্পোরো কিন্তু বাস্তবিকই সুখি, নির্ভিক আর চালাক চতুর।
রাজ্যের মোট জনসংখ্যা সাবাড় হয়ে যাবার পর পারিষদদের আর রূপসিদের ভেতর থেকে এক হাজার সদাহাস্যময় আর নম্র স্বভাবের বন্ধু বান্ধবদের তলব করে নিয়ে এলো। তারপর তাদের সঙ্গে করে প্রাচীরে ঘেরা দুর্গের মতো একটা নির্জন নিরালা মঠে গিয়ে মাথা গুঁজল।
মঠটা যেমন বড়সড় তেমনি তার গঠন বৈচিত্র্যে আর ভাস্কর্য শিল্প রাজপুত্রের খেয়ালি অথচ মহান রুচির অনন্য সৃষ্টি। আকাশ-ছোঁয়া সুদৃঢ় প্রাচীর মঠটাকে বেষ্টন করে রেখেছে। আর সামনের দিকে একটা লোহার মজবুত দরজা।
পারিষদরা মঠে ঢুকেই মঠে ঢোকা ও বেরোনোর পথ বন্ধ করার জন্য সম্ভাব্য যাবতীয় ব্যবস্থা করতে লেগে গেলেন। তারা প্রথমেই উনুন আর কয়েকটা ইয়া ভারী হাতুড়ি যোগাড় করলেন। তারপর হাতুড়ি দিয়ে দমাদম হুড়কোগুলোর পিঠে ওপর ঘা মেরে মেরে জুড়ে দিলেন, কাউকে মঠে ঢুকতে ও বেরোতে না দেওয়ায় তারা কঠিন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল মনের আকস্মিক ও পুঞ্জিভূত হতাশা, যাকে মস্তিষ্ক বিকৃতি বলা যেতে পারে–শিকার হয়েই তারা এমন ব্যস্ততার সঙ্গে কাজটা সেরে ফেলল।
মঠ থেকে যাতে বাইরে বেরোতে না হয় সে জন্য তারা আগেই ভাগেই প্রচুর পরিমাণে খাদ্যবস্তু গুদামজাত করে রেখেছেন। এর ফলে বাইরে থেকে রোগ জীবাণু ঢুকে যাতে রোগ সংক্রামিত হতে না পাওে, সে ব্যবস্থা পাকাপাকিভাবে সম্পূর্ণ করা হল।
এদিকে মঠের প্রাচীরের বাইরে যে জগষ্টা রয়ে গেল তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা সে নিজেই গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। এ মুহূর্তে এ নিয়ে আফসোস বা ভাবনা-চিন্তা করা। নিরর্থক।
তাই বলে আমোদ আহ্লাদকে তো আর বিসর্জন দেওয়া সম্ভব নয়। এ দিকটা নিয়ে প্রিন্সই ভাবিত। তিনিই বাজনা বাদ্যি আর নামকরা কলের ব্যালে-নাচের ব্যবস্থা আর রূপালি তম্বী যুবতিদের এনে জড়ো করেছেন। আর সে সঙ্গে পিপা ভর্তি দামি দামি মদ তো রয়েছেই। এসব ব্যবস্থাদির সবকিছুর সঙ্গেই কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার দিকে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। অতএব কার্যত দেখা গেল প্রাচীরবেষ্টিতে মঠের ভেতরে লাল-মৃত্যুকে প্রতিরোধের জন্য কঠোর ব্যবস্থা, আর লালমৃত্যুর জন্য রাখা হলো প্রাচীরের বাইরের অঞ্চল।
আসলে বাসস্থানের পঞ্চম বা ষষ্ঠ মাসের শেষের দিক। তখন প্রাচীরবেষ্টিত মঠের বাইরে তখন মহামারী ভয়ঙ্কর রক্তচক্ষু মেলে প্রচণ্ড রকম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
রাজপুত্র প্রম্পেররা তখন প্রাচীরবেষ্টিত মঠ-চত্বরে হাজার পারিষদদের আনন্দ দানের উদ্দেশ্যে অভাবনীয় জাঁকজমকপূর্ণ নামকরা এক মুখোশধারী দলের বল-নাচের ব্যবস্থা করলেন।
মুখোশধারী দলর সমবেত বল-নাচের আসরে জাঁকজমক আর হৈ-হল্লাতে ভরপুর এক বিলাসবহুল দৃশ্য সৃষ্টি করা হয়েছে।
কিন্তু একই সঙ্গে তো আর মঠের সবকটা ঘরের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থাদির বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়েই যে সব ঘরে নাচের আসর জমজমাট হয়ে উঠেছে। সে বিবরণই আগে দিচ্ছি।
ঘরের সংখ্যা সাত। প্রতিটা ঘরই রাজকীয় কায়দায় মনোরম করে সাজিয়ে তোলা হয়েছে।
