মুহূর্তকাল আগে শার্সিটা থেকে অকস্মাৎ ক্যাচ্ করে একটা শব্দ হয়েছিল বটে। মা বা মেয়ে কেউ-ই ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। কারণ, তার নিঃসন্দেহ হয়েছিল, শার্সিটায় বাতাস লাগার ফলেই এমনতর অবাঞ্ছিত শব্দটার উদ্ভব হয়েছে।
ফরাসি নাবিক ভেতরে উঁকি দিয়েই আঁতকে উঠল। সে দেখল, বিশালদেহী ওরাংওটাংটা মাদামোয়াজেল ল এস্পালয়ের চুলের মুঠি ধরে নাপিতের দাড়ি কামানোর কায়দার হাতের সুতীক্ষ ক্ষুরটাকে তার সারা মুখে অনবরত টেনে চলেছে। তার তখন খোলা থাকার ফলে চুলের গোছা মুঠো করে ধরা জানোয়ারটার পক্ষে সহজ হয়।
মাদামোয়জেলের মেয়েটা মেঝেতে পড়ে। নিশ্চল-নিথর। সম্বিৎ লোক পাওয়ার জন্যই সে এমন এলিয়ে পড়ে রয়েছে।
আর বৃদ্ধা মাদামোয়াজেল ল এস্পালয়ে আর্তনাদ ও বাধা দেবার চেষ্টা করায় জানোয়ারটা তার শান্ত ভাবটা কাটিয়ে ক্রমে ক্রোধোন্মত্ত হয়ে পড়তে লাগল। সে ইতিমধ্যে শরীরের সর্বশক্তি নিয়োগ করে বৃদ্ধার মাথার চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে প্রায় ন্যাড়া করে দিয়েছে। এবার তার ক্রোধ পঞ্চমে চড়ে গেল। সে হাতের ক্ষুরটা দিয়ে অতর্কিতে এমন মোক্ষম একটা পোচ দিল, যাতে তার ধড় থেকে মুণ্ডুটা মেঝেতে আছড়ে পড়ল। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল। রক্ত দেখে ক্রোধোন্মত্ত জানোয়ারটা যেন মুহূর্তে উন্মাদ-দশাপ্রাপ্ত হলো।
হিংস্র ক্রোধোন্মত্ত জানোয়ারটা এবার বৃদ্ধার দিক থেকে ফিরে মেয়েটার দিকে নজর দিল। মেয়েটা তখনও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় মেঝেতে এলিয়ে পড়ে রয়েছে। সে অতর্কিতে তার নিশ্চল-নিথর দেহটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তীক্ষ্ণ নখগুলো দিয়ে তার গলাটাকে জব্বর কায়দায় চেপে ধরল। প্রাণপাখি খাঁচাছাড়া না হওয়া অবধি সে হাতের চাপ এতটুকুও শিথিল করল না।
হিংস্র জানোয়ারটা উন্মাদের মতো ঘরের চারদিকে দৃষ্টি ফেরাতে লাগল। হঠাৎ বিছানার ওপরের দিকে গিয়ে এক জায়গায় তার চোখ দুটো থমকে গেল। সেখানে সে তার মনিবের মুখটাকে দেখতে পেল। সে মুখটা আতঙ্কে কাঠ হয়ে গেছে। চোখ দুটো স্থির।
ব্যস, মনিবের মুখটার দিকে ক্রোধোন্মত্ত জানোয়ারটার চোখ পড়ামাত্র সে চাবুকটার ভয়ঙ্করতার কথা তার মনে পড়তেই মাথায় যেন মুহূর্তের মধ্যে খুন চেপে গেল। পরমুহূর্তেই তার ক্রোধ প্রশমিত হয়ে তার মধ্যে নিদারুণ আতঙ্ক সৃষ্টি করল। নিশ্চিত শাস্তির ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে সে তার কৃত রক্তাক্ত কাণ্ডটাকে লুকিয়ে ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অস্থিরভাবে ঘরময় দাপাদাপি জুড়ে দিল।
অস্থিরচিত্ত অতিকায় জানোয়ারটা উন্মাদের মতো ঘরের আসবাবপত্র ভাঙাভাঙি শুরু করে দিল। বিছানাপত্র খাট থেকে মাটিতে ফেলে লন্ডভন্ড করতে লাগল।
এতেও জানোয়ারটা শান্ত হলো না। সে এবার মেয়েটার মৃত দেহটাকে টেনে চুল্লিটার কাছে নিয়ে গেল। সেটাকে চিমনিটার ভেতরে ঢুকিয়ে দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। শরীরের সবটুকু শক্তি নিঙড়ে সেটাকে ঠেলে ধাকে চিমনিটার ভেতরে খুঁজে দিল।
উন্মাদপ্রায় জানোয়ারটা এবার এক লাফে মাদামোয়াজেলের মৃতদেহটার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত ক্রোধে ফুঁসতে লাগল। তারপরই তার বিকৃত মৃতদেহটাকে যন্ত্রচালিতের মতো মাথার ওপরে তুলে এক লাফে খোলা জানালাটার কাছে চলে গেল। পরমুহূর্তেই জানালা দিয়ে সেটাকে সজোরে ছুঁড়ে একেবারে বাইরে ফেলে দিল।
ক্রোধোন্মত হিংস্র জানোয়ারটা যখন মৃতদেহটাকে মাথার ওপরে তুলে জানালার কাছে চলে যায় ঠিক তখনই বজ্র-নিরোধক দণ্ডটা ধরে ঝুলে থাকা ফরাসি নাবিকটা ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে সেটা বেয়ে দ্রুত নিচে নেমে গেল। ব্যস, আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। উৰ্দ্ধশ্বাসে বাড়ির দিকে ছুটতে লাগল। আসলে এ খুন দুটোর পরিণতির কথা ভেবে ভয়ে সে সিঁটিয়ে যাবার যোগাড় হলো। তাই তার পোষা ওরাংওটাংটার কি গতি হবে তা নিয়ে ভাবার মতো মন ও সময় তার আদৌ ছিল না।
এবার পুরনো কথায় ফিরে যাওয়া যাক। বহিরাগতরা চিৎকার চাঁচামেচি শুনে বাড়ির ভেতরে ঢোকার পর ব্যস্তপায়ে সিঁড়ি-বেয়ে ওপরে ওঠার সময় যেসব কথা, তর্কাতর্কির শব্দ শুনেছিল তা আসলে ফরাসি নাবিকটার আতঙ্কিত চিৎকার আর জানোয়ারটার অর্থহীন বকবকানি মিলে অবাঞ্ছিত পরিস্থিতিরই ফল। এ পরিস্থিতিটাকেই সাক্ষীরা এক-একজন নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এর পর আর কিছু-ই বা বলার থাকতে পারে? এর পরের কথা যা-কিছু বলার তা তো আগেই বলা হয়ে গেছে।
তবে জিজ্ঞাস্য থাকতে পারে, ঘটনার নায়ক ওরাংওটাংটার গতি শেষপর্যন্ত কী হল? জানোয়ারটা হয়তো বা দরজা ভেঙে ফেলার আগেই খোলা-জানালাটা দিয়ে বাইরে গলে গিয়ে বজ্রনিরোধক দণ্ডটা ঘর থেকে, ঘটনাস্থল থেকে চম্পট দিয়েছিল। আর জানালা দিয়ে বেরিয়ে যাবার পর সেই হয়তো আবার জানালাটাকে বন্ধ করে দেয়। আর এটা হলেও হতে পারে।
না, জানোয়ারটা বেশিদূর যেতে পারেনি। তার মনিব, ফরাসি নাবিক তাকে ধরে ফেলে। তারপর বহু অর্থের বিনিময়ে জার্দ দ্য প্লাহেঁসে বিক্রি করে দেয়।
আমরা ফরাসি নাবিককে সঙ্গে করে পুলিশ স্টেশনে গেলাম। সেখান থেকে বড় সাহেবের দপ্তরে হাজির হলাম। তার কাছে ঘটনার আদ্যোপান্ত খোলাখুলি বলা হলো। তিনি সবকিছু শুনে কিছু সময় গুম হয়ে বসে কি যেন ভাবলেন। তারপরই লি বোকে ছেড়ে দিলেন।
