তারপর সে যা-কিছু বলল, সংক্ষেপে এরকম–বর্তমানে ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ দর্শনে বেরিয়েছে। বোর্ণিও বন্দরে তার সহযাত্রীরা নেমে যায়। প্রমোদ ভ্রমণের জন্য বন্দর থেকে বেরিয়ে তারা শহরে চলে যায়। হঠাৎ সে ওরাংওটাংটাকে দেখতে পেয়ে সেটাকে ধরার জন্য তৎপর হয়। তারপর একজন সহযাত্রীর সাহায্যে বহু কষ্ট স্বীকার করে সেটাকে ধরতে পারল। অচিরেই সঙ্গিটার মৃত্যু হয়। ব্যস, এবার সে একাই ওরাংওটাংটার মালিক বনে যায়। জানোয়ারটা তার অধীনেই বন্দি-জীবন যাপন করতে থাকে।
বন্দি ওরাংওটাংটা খুবই হিংস্র আর গোঁয়ারগোবিন্দও বটে। বাড়ি ফেরার পথে হাজারো হাঙ্গামা-হুঁজ্জতি সহ্য করে সে শেষপর্যন্ত কোনোরকমে প্যারিস শহরে ফিরে আসতে সক্ষম হলো।
প্যারিসে ফিরে আসার পর প্রতিবেশীদের কৌতূহল ও ঝামেলার হাত থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার উদ্দেশ্যেই সে জানোয়ারটাকে বাড়ি থেকে দূরে এক নির্জন প্রান্তরে লুকিয়ে রাখল। জাহাজে থাকার সময়ে একটা কাঠের টুকরো আঘাত লেগে পায়ের কিছুটা অংশ কেটে যায়। দগদগে ঘা হয়ে যায়। ভাবল যে দাম পেলে বিক্রি করে দেবে। বিক্রি করে দেবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েই নেয়।
যে রাতে হত্যাকাণ্ডটা ঘটেছিল সে রাতের কথা। সে ইয়ার দোস্তদের সঙ্গে আনন্দ-স্ফূর্তি সেরে সে প্রায় ভোরের দিকে বাড়ি ফিরে অত্যাশ্চর্য এক ঘটনার মুখোমুখি হন। সে দেখল, জানোয়ারটা তার নিজের খেয়াড় ছেড়ে এসে মনিবের শোবার ঘরে ঢুকে টেবিল থেকে ক্ষুরটা তুলে নিয়ে দিব্যি দাড়ি কামানোর কাজে মেতে গেছে। কোনোদিন হয়তো সে দরজার ছিদ্রে চোখ লাগিয়ে মনিবকে আয়নার সামনে বসে দাড়ি কামাতে দেখেছিল।
ওরাংওটাংটার কাণ্ড দেখে তার মনিব নাবিক তো রীতিমত স্তম্ভিত। একটা বন্য পশুকে ক্ষুর দিয়ে অবিকল মানুষের মতো দাড়ি কামাতে দেখলে কার না চোখ ছানাবড়া হবে। সে ঘরে ঢুকেই দেওয়াল থেকে চাবুকটি টেনে নিয়ে আচ্ছা করে তাকে ভড়কে দিল। ইতিপূর্বে হিংস্র জানোয়ারটাকে বশে রাখার জন্য বহুবারই এ অস্ত্রটা তাকে ব্যবহার করতে হয়েছে।
দু-চার ঘা খেয়েই অসহ্য যন্ত্রণায় বিশ্রি স্বর করে আতনাদ করতে করতে জানোয়ারটা খোলা জানালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে সোজা রাস্তায় চলে যায়।
ক্রোধোন্মত ফরাসি নাবিকটা জানোয়ারটার পিছনে ধাওয়া করল। আর সেটা ক্ষুর-হাতে ক্রোধে গর্জন করতে করতে ছুটছে আর মাঝে মাঝে পিছন ফিরে মুখ বিকৃত করে তাকে ভ্যাংচাতে লাগল। সে কিন্তু এতটুকুও হতাশ না হয়ে সেটাকে অনুসরণ করেই চলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের উভয়ের মধ্যে ব্যবধান কমতে কমতে লোকটা জানোয়ারটার একেবারে কাছাকাছি চলে এলো।
তখন ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই। ঘরিতে ভোর তিনটা বাজে। রাস্তাঘাট নির্জন নিরালা, একেবারে শুনশান। রু মর্গের পিছন দিককার একটা ফাঁকা গলি দিয়ে চলার সময় নিজের বাড়ির চারতলায় মাদময়জেল ল এম্পানয়ের খোলা-জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসা আলোর সাহায্যে ঘরের ভেতরের খাটটার দিকে তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়।
হিংস্র জানোয়ার ওরাংওটাংটা একলাফে এগিয়ে গিয়ে বাড়িটার বজ্র-প্রতিরোধক দণ্ডটা বেয়ে অত্যাশ্চর্য দ্রুততার সঙ্গে ওপরে উঠে গিয়ে বাড়িটার খোলা জানালাটায় পৌঁছে যায়। সেখান থেকে এক লাফে খাটের মাথায় চলে যায়। ঘরটায় ঢোকার সময়ই সে এক লাথি মেরে শার্সিটাকে খুলে দিল। একটা মাত্র মিনিটের মধ্যেই পুরো ব্যাপারটা ঘটে গেল। ব্যস, সব শেষ।
ফরাসি নাবিক তখন হাসি ও বিমর্ষের জোয়ারে ভাসছে, এবার সেটাকে ধরতে পারবে বলেই সে আশান্বিত। কারণ, যে কাঠগড়ায় সে মাথা গলিয়েছে সেখান থেকে আবার নিজেকে মুক্ত করার সম্ভাবনা মোটেই নেই।
সে যদি বজ্রনিরোধক দণ্ডটাকে রেখে নেমে আসতে প্রয়াসী হয় তবে তাকে ধরে ফেলতে পারবে বলেই বিশ্বাস।
আর নাবিকটার এ আশঙ্কাও কম নয় যে, বাড়ির ভেতরে ঢুকে জানোয়ারটা কোন্ অপকর্ম করে বসে তাই বা কে জানে? অতএব যে করেই হোক, সেটাকে ধরতে হবেই। আর সেটা পিছু না নিলে কেলেঙ্কারীর চূড়ান্ত ঘটে যাওয়াও কিছুমাত্র সন্দেহও নেই।
সে একজন দক্ষ নাবিক। একটা বজ্র নিরোধক দণ্ড বেয়ে ওপরে উঠে যাওয়া তার পক্ষে কোনো কঠিন কাজ নয়। সে কারলও তাই।
জানালাটার কাছে পৌঁছেই সে থমকে থেমে গেল। বুঝতে পারল, ওই নির্দিষ্ট জানালাটা অনেক উঁচুতে অবস্থিত। উপায়ন্তর না দেখে সে সেখানেই থেমে গেল। দীর্ঘসময় ধরে বহুভাবে চেষ্টা করার পর সে কোনোরকমে ভেতরে দৃষ্টিপাত করতে পারল। কিন্তু ভেতরে যে ভয়ঙ্কর দৃশ্য, সে দেখতে পেল, তাতে তার যে কেবলমাত্র চক্ষুস্থিরই হয়ে গেল তা নয়, অন্তর-আত্মা খাঁচা ছাড়া হয়ে যাবার যোগাড় হলো। কোনোরকমে নিজেকে সামলেম নিল, নইলে হাত ফসকে পড়েই যেত।
ব্যস, ঠিক সে মুহূর্তেই ঘরের ভেতর থেকে এমন বুক-কাঁপানো আর্তনাদ উঠল যা শুনে রুমর্গের বাসিন্দারা শুধু চমকেই উঠল না, ধরতে গেলে আধমরা হয়ে গেল।
বৃদ্ধা মাদামোয়াজেল ল এম্পানায়ে আর তার মেয়ে রাতের পোশাক পরেই লোহার সিন্দুকটাকে টেনে হিঁচড়ে ঘরের মাঝখানে নিয়ে আসার জন্য প্রাণান্ত প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। সিন্দুকটা খোলা। ভেতরের জিনিসপত্র মেঝেতে স্তূপ করে রাখা। কাজ কিছুটা সেরে, সিন্দুকটাকে ঘরের মাঝামাঝি এনে তারা দুজনই জানালার কাছে বসে একটু জিরিয়ে নিতে লাগল। উভয়েই জানালার দিকে পিঠ রেখে বসে। তাই হিংস্র জানোয়ারটা কখন যে ঘরের ভেতরে ঢুকে এসেছে তারা টেরই পায়নি। তারপর থেকে তার আর্তনাদের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্তও তারা কেউ তার উপস্থিতি এতটুকু অনুমানও করতে পারেনি।
