মুচকি হেসে দুঁপ বললেন–বসুন বন্ধু। আমার মনে হচ্ছে, আপনি ওরাং ওটাংটার খোঁজেই এসেছেন। একটা কথা, এমন দামি একটা জানোয়ারের মালিক হওয়ার জন্য আমি কিন্তু আপনাকে হিংসাই করছি। একটা কথা জানতে পারি কী?
আগন্তুক বিজ্ঞ বিনয়ের সঙ্গেই বললেন–কী জানতে চাইছেন, বলুন। আপনার জিজ্ঞাসা নিরসন করার ক্ষমতা থাকলে আমি তা অবশ্যই করব।
আপনার জানোয়ারটার বয়স কত বলুন তো?
দেখুন সঠিক বয়স বলা মুশকিল। তবে চার পাঁচ বছরের বেশি নয় বলেই আমার বিশ্বাস। আচ্ছা, সেটাকে কী এখানেই রাখা হয়েছে?
না। ওটাকে এখানে কি করে রাখব! এখানে জায়গা কোথায়, দুবুর্গের একটা খোয়াড়ে সেটাকে রাখা হয়েছে। কাল সকালে পেয়ে যাবেন, অসুবিধা হবে না। তবে সেটা যে আপনার, সেটা প্রমাণ করার চিন্তা-ভাবনা আপনি অবশ্যই করেছেন, তাই না?
হ্যাঁ, আমি তৈরি হয়েই এসেছি।
কয়দিন আমার জিম্মায় আছে, আমার মায়া পড়ে গেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবার তিনি বললেন–জানোয়ারটাকে ছেড়ে দিতে আমরা কিন্তু খুবই কষ্ট পাব।
আরে মি., আমি আপনাকে শুধুশুধু ঝামেলা পোহাতে বলব না। আমি তা চাইবই বা কেন? আমার প্রিয় ওরাংওটাংটাকে ফিরে পাবার বিনিময়ে আনন্দের সঙ্গে একটা পুরস্কার আপনাকে দিতে চাইছি। পুরস্কার না বলে তাকে আপনার ন্যায্য পাওনা মনে করাই ভালো।
হুম!
হ্যাঁ, আমি খুশি হয়েই আপনাকে সন্তুষ্ট করার জন্য–
এ তো আনন্দের কথা মি.! কেউ খুশি হয়ে কিছু দিলে তা হাত পেতে নেয়াই তো ভদ্রতা।
তবে অনুগ্রহ করে বলুন, কী পেলে আপনি খুশি হবেন?
খুশি হব? ভালো কথা, আমাকে তবে একটু ভাববার সময় দিন।
ঠিক আছে! তবে ভেবেই বলুন।
দেখুন, আমি এমনকিছু আপনার কাছ থেকে প্রত্যাশা করি না যাতে আপনাকে অর্থব্যয় করতে হবে!
তবে?
রু মার্গের খুনের ব্যাপারটা সম্বন্ধে আপনি আমাকে সাধ্যমত জানালে আমি সবচেয়ে খুশি হব।
বন্ধুবর দুঁপ শান্তস্বরেই কথাটা শেষ করলেন। কথা বলতে বলতে চেয়ার থেকে উঠে ধীরপায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজায় তালা দিয়ে চাবিটা কোটের পকেটে চালান করে দিলেন। আগের মতো ধীরেই টেবিলের কাছে এসে দাঁড়ালেন। কোটের ভেতরের বুক পকেট থেকে পিস্তলটা বের করে আলতোভাবে টেবিলের ওপরে রাখলেন।
আগন্তুক নাবিক অতুত্র আগ্রহের সঙ্গে পুরো ব্যাপারটা লক্ষ্য করলেন। আমি আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে তার চোখ মুখের আকস্মিক পরিবর্তনটুকু লক্ষ্য করতে লাগলাম। দেখলাম, তার মুখটা ক্রমে লাল হয়ে উঠল। আর এও আমার নজর এড়াল না, এখনই বুঝি তার শ্বাস বন্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়বে। টু-শব্দটি করল না। তার আকস্মিক মর্মান্তিক পরিস্থিতিটা দেখে করুণার উদ্রেক হলো।
আমার বন্ধুবর দুপঁ তার পরিকল্পনামাফিক একের পর এক ধাপ এগোতে লাগলেন। কণ্ঠস্বরে সহানুভূতি প্রকাশ করে এবার বললেন–শুনুন মি., আপনি কিন্তু মিছেই ভয় পেয়ে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছেন। বিশ্বাস করুন, আপনার তিলমাত্রও ক্ষতি করার ইচ্ছা আদৌ আমাদের নেই। সত্যি বলছি, একজন ভদ্রলোক, একজন ফরাসি হিসেবে আপনার মান সম্মানের দোহাই দিয়ে বলছি, আপনার গায়ে আঘাত করা তো দূরের ব্যাপার, ফুলের টোকা দেয়ার ইচ্ছাও আমাদের নেই।
মুহূর্তের জন্য থেমে দুপঁ আবার বলতে আরম্ভ করলেন–আমার কিন্তু ভালোই জানা আছে মি., রুমর্গের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে আপনি নিরপরাধ–নির্দোষ। তবে খুনের ঘটনাটার সঙ্গে নিজেকে যে একটু লিপ্ত করে ফেলেছেন তা অস্বীকার করে ফয়াদা কিছু হবার নয়।
আমাদের অতিথি-দ্রলোকটা নীরবে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আগের মতোই লাল হয়ে ওঠা মুখটা তুলে নীরবে তাকিয়ে রইলেন।
দুপঁ পূর্বপ্রসঙ্গের জের টেনেই বলে চললেন–শুনুন মি., আমি যা-কিছু বলেছি তা থেকে আপনি নিশ্চয় অনুমান করতে পারছেন, এ ঘটনাটা সম্বন্ধে সব কথা জানাবার মতো সব পথ আমার অবশ্যই আছে, যা আপনার পক্ষে স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি। যাক, পরিস্থিতিটা মোটামুটি এ রকম হয়ে পড়েছে–আপনি এমন কোনো কাজ করেন নি যা আপনার পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল। অর্থাৎ খুনের ব্যাপারটা নিয়ে আপনার ওপরে দোষ চাপিয়ে দেয়া যেতে পারে এমন কোনো কাজই আপনি করেন নি। আবার ডাকাতির জন্যও আপনার ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে কি, কাজটা কিন্তু আপনি নির্বিপরেই সেরে ফেলতে পারতেন বলেই আমি মনে করি। গোপন করার মতো কিছুই আপনার নেই। আর চেপে যাওয়ার মতো কাজও তো আপনি কিছুই করেন নি। তবে এটাও সত্য, নিজের মান সম্মানের কথা চিন্তা করে আপনার যেটুকু জানা আছে, তা প্রকাশ করতে বাধ্য।
আমি লক্ষ্য করলাম, আগন্তুকের মুখটা আগের চেয়ে অনেক, অনেক বেশি লাল হয়ে উঠল।
বন্ধুবর দুপঁ কিন্তু নাছোড়বান্দা। তিনি বলেই চললেন–একটা কথা মন দিয়ে শুনুন মি., যে অপরাধীকে আপনি অনায়াসেই ধরিয়ে দিতে পারেন, তার কৃত অপরাধের দায়ে একটা নিরপরাধ মানুষ কিন্তু জেলে পঁচে মরছে।
বন্ধুর কথা শুনে আগন্তুক নাবিকের মনোবল বেশ কিছুটা ফিরে এলেও আগের সে সাহসিকতা কিন্তু আর তার মধ্যে লক্ষিত হলো না।
কয়েক মুহূর্ত নীরবে ভেবে, পায়ের বুড়ো আঙুল মেঝেতে ঘষতে ঘষতে এক সময় আগন্তুক বলল–ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি, হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে যা-কিছু আমার জানা আছে সবই খোলাখুলি আপনাকে বলছি। আমি তিলমাত্র গোপন না করলেও আমার বক্তব্যের অর্ধেকটাও আপনি বিশ্বাস করবেন বলে আমি আশা করি না। আপনার কথা না হয় ছাড়ানই দিলাম। আমি নিজে একটা আহাম্মক না হলে বিশ্বাস করতাম না। তবুও আমি নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাপরাধ মনে করি বলেই সবই খোলসা করে আপনাকে বলব। এতে যদি আমাকে মৃত্যুবরণও করতে হয় তবুও এটা কথাও চাপার চেষ্টা করব না। কথা দিচ্ছি।
