আমি মুহূর্তের জন্য নীরবে ভেবে নিয়ে বন্ধুবরকে বললাম একটা কথা; কিছুতেই আমি ভেবে পাচ্ছি না।
কী? কথাটা কি জানতে পারি কী?
কথাটা হচ্ছে, ওরাংওটাংটার মালিক যে একজন জাহাজের নাবিক, আর জাহাজটা মল্টাগামী তা আপনি কিভাবে জানতে পারলেন, বলবেন কী?
অবশ্যই জানি না। নিঃসন্দেহও নই।
তবে এমন একটা অসম্ভব ব্যাপার আপনার পক্ষে কীভাবে জানা সম্ভব হয়েছে?
এই যে একটা ফিতের টুকরো দেখতে পাচ্ছেন, এর দৈর্ঘ্য ও আকৃতি এবং তেল-ময়লা জড়ানো অবস্থাটাই আমাকে এ রকমটা ভাবতে উৎসাহিত করছে।
মানে কী বলতে চাইছেন মি. দুঁপ?
নাবিকরা পরচুলা বাঁধার কাজে সাধারণত এরকম ফিতেই ব্যবহার করে থাকে। নাবিকরা ছাড়া এরকম গিটও অন্য কারো পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। আর মল্টাবাসী নাবিকরাই সবচেয়ে বেশি করে এটা ব্যবহার করে।
ভালো কথা, এ ফিতেটা আপনার হাতে কিভাবে এলো?
সে বাড়িটায় তদন্ত চালাতে চালাতে বাড়ির গায়ের একটা জায়গায় পড়ে ছিল। কুড়িয়ে পকেটে রেখেছিলাম। ফিতেটা যে মৃত দুজনের কারো নয় এ বিষয়ে তো নিঃসন্দেহ হওয়া চলে। আমার এ ধারণাটা ভুল হলেও তো ক্ষতি বৃদ্ধি কিছুই নেই। আর যদি সত্য হয় তবে লাভ বিশালই হবে। এখন ধরে নেওয়া যেতে পারে, ফরাসিটা যদি নিরপরাধও হয়ে থাকে তবুও বিজ্ঞাপনটা পড়ে সে ওরাং ওটাংটা নেওয়ার জন্য এগিয়ে আসতে গড়িমসি করবে।
তবে তো আপনার বিজ্ঞাপনের পরিকল্পনাটা মাঠে মারা যাবে, তাই না মি. দুর্প?
হ্যাঁ, তা অবশ্য যাবে। কিন্তু ফরাসি ভদ্রলোক নিজেকে নানাভাবে প্রবোধ দেবার চেষ্টা করবে, যেমন ধরুন–আমি নিরপরাধ, আমি গরিব, আমার ওরাংওটাংটার মূল্য অনেক, আমার মতো একজন গরিবের কাছে ওটা একটা সম্পত্তি ছাড়া কিছু নয়, অনিশ্চিত ও অহেতুক বিপদের ভয়ে এমন একটা সম্পত্তি যে কেন বে-হাত করতে যাবে? ওরাংওটাংটা তো আমার প্রায় কজায়ই চলে এসেছে। আর বয় দ্য চুলেনে সেটাকে পাওয়া গেছে। আর সেটা অকুস্থল, অর্থাৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকে দূরে বহুদূরে অবস্থিত।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকে দূরে বহুদূরে অবস্থিত।
চমৎকার! চমৎকার!
আরও আছে, একটা পা-ও যে এমন একটা রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের নায়ক হতে পারে এমন সন্দেহ কারো মনে জাগবেই বা কি করে? ব্যর্থতা তো পুলিশ দপ্তরের? তারা এত চেষ্টা করে সামান্যতম সূত্রও বের করতে সক্ষম হয়নি। ব্যর্থ হয়েছে। তারা জনোয়ারটার হদিস পেলেও, সে ক্ষেত্রেও আমি যে হত্যাকাণ্ডটার কথা জানতাম, সে কথা কিছুতেই প্রমাণ করতে পারবে না, অথবা আমি জানতাম বলেই যে অপরাধের জন্য আমাকে অভিযুক্ত করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়বে।
হুম! আমি গম্ভীর মুখে প্রায় অস্ফুট উচ্চারণ করলাম। বন্ধুবর দুপঁ পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে এবার বললেন–পুলিশ ফরাসি লোকটাকে অপরাধী ভাবার কোনো সূত্রই খুঁজে পাবে না। সে অবশ্যই ভাববে, আমি তো সবারই পরিচিত। আর বিজ্ঞাপনদাতা
তো আমাকেই ওরাংওটাংটার মালিক ধরে নিয়েছে, বিজ্ঞাপনের তা উল্লেখও করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি কতটা কি জানেন তা আমার পরিষ্কার জানা নেই। জানতে পেরেও এরকম দামি জানোয়ারের দাবি না করে আমি নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকলে তো আমার ওপর সন্দেহ পড়তে বাধ্য। আমার বা আমারই জানোয়ারটার ওপর সবার নজর পড়ক এটা তো অবশ্যই আমার কাম্য হওয়া উচিতও নয়। বিজ্ঞাপনের ঠিকানা অনুযায়ী আমি উপস্থিত হব। ওরাংওটাংটাকে হাতে পেয়ে যাব। আর হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারটা যতদিন না ধামাচাপা পড়ে যায়, ততদিন আমি সব কথা আমার মনের গোপন করেই চাপা দিয়ে রাখব।
বন্ধুবরের মুখের কথা শেষ হতে না হতেই সিঁড়ি থেকে পায়ের শব্দ ভেসে আসতে লাগল।
মুহূর্তের জন্য উৎকর্ণ হয়ে শব্দটা শুনে নিয়ে দুনিচু গলায় বললেন–এক কাজ করুন, পিস্তলটা নিয়ে তৈরি হয়ে থাকুন। তবে মনে রাখবেন, আমার ইঙ্গিত না পাওয়া অবধি ওটা অবশ্যই ব্যবহার করবেন না, আর যাতে দেখতে না পায় সতর্ক থাকবেন।
বাড়ির সদর দরজাটা খোলা পেয়ে আগন্তুক ঘণ্টা না বাজিয়ে বা ডাকাডাকি না করেই সোজা ভেতরে ঢুকে এলো। লম্বা লম্বা পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই লক্ষ্য করলাম, লোকটা দ্বিধায় পড়েছে। এবার দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ার শব্দ কানে এলো। পরমুহূর্তেই আবার ওপরে উঠে আসার শব্দ শুনতে পেলাম। ব্যস, দ্বিতীয়বার তার আর নেমে যাওয়ার শব্দ শোনা গেল না। এবার মনে হলো, সে যেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। মুহূর্তের মধ্যেই সে সিঁড়ির বাকি ধাপ কয়টা অতিক্রম করে দরজার কড়া নাড়তে আরম্ভ করল।
বন্ধুবর দুপঁ বললেন–আসুন, ভেতরে চলে আসুন।
তার কথা শেষ হতে না হতেই দেখতে নাবিকের মতো এমন একজন ঘরে ঢুকে এলো। সুঠাম ও দীর্ঘদেহী আর পেশীবহুল চেহারা। মনে হলো গায়ে গতরে শক্তিও ধরে যথেষ্টই। দেখতে সুশি না হলেও খুব কুশিও বলা চলে না। তবে চোখে মুখে একটা বেপরোয়াভাব লক্ষিত হলো। আর মুখটাকে একটু বেশি রকমই রোদে পোড়া মনে হলো। জুলফি আর গোঁফে মুখের প্রায় অর্ধেকটা ঢেকে দিয়েছে। একটা মোটাসোটা কাঠের লাঠি তার হাতে ধরা। লাঠিটা ছাড়া আর কোনো অস্ত্রপাতি সঙ্গে নেই বলেই মনে হলো। বিচিত্র ভঙ্গিতে অভিবাদন সারল। এতেই মনে হলো আগন্তুক একজন প্যারিসের বাসিন্দা।
