কথা বলতে বলতে বন্ধুবর দুপঁ হাতের নক্সাটাকে টেবিলের ওপর রাখলেন। সেটাকে খুলে এক জায়গায় অঙ্গুলি-নির্দেশ করে বললেন–একটু লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন এ রেখাচিত্রটা থেকে একটা বজ্রমুষ্ঠির ধারণা পাবেন। হাত ফসকে বা পিছনে যাবার কোনো চিহ্নও নেই। এই দেখুন, প্রতিটা আঙুলের গোড়াতেই শেষ অবধি সেভাবে গভীরভাবে চেপে গিয়েছিল, হয়তো বা আক্রান্ত মাদামমায়াজেল ল এম্পানায়ের মৃত্যু হওয়া অবধি ভয়ঙ্কর সে সুদৃঢ় মুষ্টিকে অব্যাহত রাখা হয়েছিল।
আমি ছবিটার ওপর অনুসন্ধিৎসু নজর বুলাতে লাগলাম।
তিনি এবার আমাকে লক্ষ্য করে বললেন–মি., আপনার আঙুলগুলোকে ছবিটার প্রতিটা আঙুলের ছাপের ওপর স্থাপন করার চেষ্টা করে দেখুন তো।
আমি তার কথামত ছবির চিহ্নগুলোর ওপর আমার হাতের আঙুলগুলোকে রাখার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। বার-কয়েক বৃথা চেষ্টা করে হাতটাকে কাগজটা থেকে তুলে নিলাম।
আমাকে ব্যর্থ হয়ে হাতটা সরিয়ে নিতে দেখে তিনি বললেন–দেখুন, কাজটা হয়তো ঠিক ঠিকভাবে করা হচ্ছে না।
মানে? আপনার কথাটা আমি–।
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই তিনি এবার বললেন–আমরা তো একটা সমতল টেবিলের ওপর কাগজটা ছড়িয়ে রেখেছি, তাই না?
হ্যাঁ, তা-তো বটেই।
কিন্তু মানুষের গলার আকৃতি তো আর সমতল নয়, গোলাকার। কথা বলতে বলতে একটা কাঠের টুকরো আমার সামনে ধরে বললেন–এ কাঠের টুকরোটা মানুষের গলার আকৃতি বিশিষ্ট মনে করা যেতে পারে ঠিক কি না?
হ্যাঁ, সে রকম মনে করা যেতে পারে বটে।
এবার কাঠের টুকরোটার গায়ে রেখাচিত্রটা জড়িয়ে নিয়ে চেষ্টা করে আবার দেখুন তো আপনার হাতের আঙুলগুলো ছবির চিহ্নগুলোর ওপর পড়ে কি না?
তার পরামর্শ অনুযায়ী আমি তা-ই করার চেষ্টা করলাম বটে। কিন্তু দেখলাম এবারের কাজটা আগের চেয়ে অনেক অনেক বেশি শক্ত।
আমি বাধ্য হয়ে বেশ জোর গলায়ই বললাম–ধ্যুৎ! এটা অবশ্যই কোনো মানুষের আঙুলের ছাপ নয়।
আমার কথা শুনে বন্ধুবর দুঁপ ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুললেন। তারপর একটা চটি বইয়ের একটা জায়গার ওপর অঙ্গুলি-নির্দেশ করে বললেন–এ অংশটুকু একবারটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন তো। লেখাটা কুড়িয়ের পড়ন।
আমি বইটাকে হাতে নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখলাম। ওরাংওটাং-এর অঙ্গ সংস্থানসহ সাধারণ বিবরণ সম্বলিত কয়েক রং বিশিষ্ট একটা বই। পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে বৃহদাকার প্রাণীটার দেখা মেলে। বিশালদেহী স্তন্যপায়ী প্রাণী। দেহে অমিত শক্তি ধরে। কর্মক্ষমতাও যথেষ্টই। অসাধারণ হিংস্র প্রকৃতির। আর এদের অনুকরণ ক্ষমতার কথা কার না জানা আছে।
বইটার দিকে তাকিয়ে ওরাংওটাং সম্বন্ধে ওপরের কথাগুলো মনের কোণে উঁকি দেওয়ামাত্র হত্যাকাণ্ডটার ভয়ঙ্করতা সম্বন্ধে আমার মধ্যে স্পষ্ট একটা ধারণা খেলে গেল।
বন্ধুবর দুঁপের পরামর্শ অনুযায়ী বইটা পড়ে ফেললাম। লক্ষ্য করলাম বইটাতে অতিকায় প্রাণীটার আঙুলের যে বিবরণ দেওয়া আছে তা রেখাচিত্রটার ছাপগুলোর সঙ্গে অবিকল মিলে যায়।
আমি এবার বললাম–মি. দুঁপ, স্পষ্টই বুঝতে পারছি, রেখাচিত্রটায় যে আঙুলের ছাপ আপনি এঁকেছেন তা ওরাংওটাং ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীর পক্ষে মোটেই সম্ভব নয়। কুভিয়ের যে কটা রঙের লোমের বিবরণ দিয়েছেন, তা যেন অবিকল সে চুলের গোছার মতোই বটে। কিন্তু আমি খুবই ধন্ধে পড়েছি।
ধন্ধ? কী সে ধন্ধ, বলুন তো?
ভয়ঙ্কর এ হত্যাকাণ্ডটার ছোটখাট ব্যাপারগুলো আমার মাথায় ঠিক ঢুকছে না। আর কথা কাটাকাটির সময় দুটো কণ্ঠস্বর শোনা গিয়েছিল, আর তার একটা যে কোনো এক ফারসীর কণ্ঠস্বর সে বিষয়ে তো তিলমাত্রও সন্দেহই নেই।
অবশ্যই। সাক্ষীরা তাদের নিজনিজ সাক্ষ্য দিতে গিয়ে যা বলেছেন, তার মধ্যে প্রত্যেকেই একটা কথা উল্লেখ করেছেন। কথাটা কি তা-তো আমরাও বারবারই বলেছি–মন ডিউ। সাক্ষীদের একজন এ কথাটাতে আপত্তি প্রকাশ করতে গিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন, ঠিক কি না?
হ্যাঁ, তা বটে।
অতএব রহস্যটার সমাধানের ব্যাপারে এ শব্দ দুটোতেই আমার সব আশা লুকিয়ে রয়েছে।
আরও বলতেই হয়, হত্যাকাণ্ডটার কথাটা একজন ফরাসি জানতে পেরেছিলেন। হয়তো বা সে এ ভয়ঙ্কর কাণ্ডটার সঙ্গে কোনোক্রমেই লিপ্ত ছিল না। ব্যাপারটা এমনও হতে পারে ওই ওরাংওটাংটা তার কাছ থেকে পালিয়ে আছে। হয়তো বা তাকে অনুকরণ করেই সে ঘরটায় ঢুকে গিয়েছিল। ব্যস, তারপরই সে তুলকালাম কাণ্ড শুরু হয়ে যায়। তাতে করে তার পক্ষে জানোয়ারটাকে কিছুতেই আটকে ফেলা সম্ভব হয়নি। যাক, এটা নিয়ে আর বেশি কিছু বলার আগ্রহ নেই, আর আমার অধিকারও তো নেই।
কারণ কী?
কারণ, যুক্তিটার ওপর যে আমিই পুরোপুরি নির্ভর করতে পারছি না। তাই এটাকে একটা অনুমান হিসেবেই ধরে নেওয়া যেতে পারে। উপরোক্ত ফরাসি লোকটা যদি আমার ধারণা অনুযায়ী সত্যি সত্যি নির্দোষই হয় তবে তো গতরাতে বাড়ি ফেরার সময় পথে যে বিজ্ঞাপনটা আমি লে মোদে–জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত পত্রিকার দপ্তরে ছাপার জন্য দিয়ে এসেছি। চোখে পড়লেই সে আমার বাড়ি চলে আসবে বলেই আমি বিশ্বাস করি।
কথাটা বলতে বলতে সে এক চিলতে কাগজ আমার দিকে বাড়িয়ে দিল।
আমি হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে পড়তে লাগলাম–এ মাসের প্রথম দিকে প্রত্যূষে বর দ্য বুলোম নামক শহরে অতিকায় একটা ওরাংওটাং ধরা পড়েছে। সেটা বোর্নিও শ্রেণির ওরাংওটাং। সেটার গায়ের রঙটা। জানা গেছে সেটা মল্টাগামী জাহাজের মালিকের। যা-ই হোক, সেটার মালিক উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে তার আটক করা ও খাই-খরচ বাবদ অর্থ পরিশোধ করে সেটাকে খালাস করে নিয়ে যেতে পারেন। যোগাযোগের ঠিকানা–নং, র, ফবুর্গ স্যাঁৎ জার্মেন।
