এবার আপনি কি মেনে নেবেন, লাশটাকে যেভাবে চিমনিটার ভেতরে খুঁজে দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে এমনকিছু লুকিয়ে আছে যা ভাবতে খুবই কষ্টকর। যাকে মানুষের স্বাভাবিক কাজের পর্যায়ে ফেলা সম্ভব নয়। মানুষের প্রবৃত্তি যতই হীন হয়ে পড়ুক না কেন, যে চিমনির ভেতর থেকে লাশটাকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে আনতে বেশ কয়েকজনের শক্তিকে একত্রিত করতে হয়েছে। অতএব সেটাকে ওই সরু চিমনিটার মধ্যে গুঁজে দিতে কী পরিমাণ বলপ্রয়োগ করতে হয়েছিল, আশা করি অনুমান করতে অসুবিধা হচ্ছে না।
এ পর্যন্ত তো শুনলেন। এবার অবাক হবার মতো বলপ্রয়োগের অন্যসব কাজের দিকে চোখ ফেরান। সাক্ষীর সাক্ষ্যে আছে, মানুষের পাকা চুলের মোটা বিনুনির কথা। খুবই মোটা মোটা বিনুনি। আর এ কারো মাঝখাপার, অশনি আর আমি খুবই মোটা মোটা বিনুনি। আর এও বলা হয়েছে, সেগুলোকে গোড়া থেকে উপড়ে আনা হয়েছে। এবার ভেবে দেখুন, কারো মাথা থেকে বিশ ত্রিশটা চুল একই সঙ্গে উপড়ে নেওয়া যে কী শক্তির দরকার ও কষ্টকর ব্যাপার, আশা করি তা আপনাকে অন্তত বলে বোঝানো যাবে না। সে চুলের গোছাগুলো তো আপনি আর আমি উভয়েই দেখি, মনে পড়ছে? আর এও মনে থাকার কথা, চুলের গোড়াগুলোতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাংস লেগেছিল। এক সঙ্গে লক্ষচুল মুঠো করে ধরে উপড়ে ফেলতে হলে যে কী ভীষণ শক্তি প্রয়োগ করতে হয়, সে চুলগুলো তারই প্রমাণ দিচ্ছে।
এবার অন্য প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। বৃদ্ধা মাদাম ল এস্পালায়ের ধড় থেকে যে কেবলমাত্র মাথাটাকে কেটে ফেলা হয়েছে তা-ই নয়, দুটোকে পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। তাই কাজটা হাসিল করতে ক্ষুর ব্যবহার করা হয়েছে। বন্ধু, এ-কাজগুলো পশুসুলভ হিংস্রতার দিকটা একবারটি বিবেচনা করে দেখ। তবে মাদামের গায়ে চামড়া কেটে-ছিড়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই।
মি. দুমা আর তার অভিজ্ঞ সহকর্মী মি. ইতেনের বক্তব্য অনুযায়ী বলতে হয়, কোনো ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে খুনটা করা হয়েছে। হ্যাঁ, এ পর্যন্ত তাদের বক্তব্য ঠিকই আছে। এ বক্তব্যটা এখন খুব সহজ সরল ও স্বাভাবিক মনে হলেও এদিকে পুলিশের নজরই আকৃষ্ট হয়নি।
এবার বলছি কি, উপরে বর্ণিত ব্যাপারগুলো ছাড়াও ঘরটার ভয়ানক রকমের এলোমেলো পরিস্থিতির দৃশ্যটার কথা তো তোমার মাথায় ভালোভাবেই চেপে বসে রয়েছে, ঠিক কিনা? তোমার চিন্তা ভাবনার সঙ্গে আমি সংযোজন করেছি তাক লাগার মতো কর্মক্ষমতা। পাশবিক নিষ্ঠুরতা ও হিংস্রতা, অলৌকিক শক্তি রীতিমত অমানবিক আচরণ আর উদ্দেশ্যবিহীন হত্যাকাণ্ড ও এমন একটা বিস্ময়কর কণ্ঠস্বর যা বহু দেশের মানুষের কাছেই ভিনদেশীয় বলে মনে হয়েছে, যাতে কোনো স্পষ্ট আর অর্থবহ শব্দের খোঁজ মেলেনি। এবার বলুন তো ফল কী পাওয়া গেল?
মুহূর্তের জন্য থেমে তিনি এবার বললেন–আপনার কল্পনায় আমার বক্তব্য কী কিছুমাত্রও প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে, খোলসা করে বলুন তো?
বন্ধুবর দুপঁ যখন আমাকে লক্ষ্য করে এ প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল, তখন আমার শরীরের সব কয়টা স্নায়ু যেন একই সঙ্গে সচকিত হয়ে উঠল, আর মাংসপেশীতে অভাবনীয় কম্পন অনুভুত হলো। আমি নিজেকে সামলাতে না পেরে বলে উঠলাম–এটা কোনো পাগলের কর্ম? অদূরবর্তী ম্যাসন্ ডি স্যান্টে পাগলাগারদ থেকে কোনো পাগল করেছে নাকি?
আমার কথা শুনে তিনি বললেন–আপনার অনুমানটা একেবারে অমূলক নয়। বাড়িটায় ঢুকে-পড়া লোকগুলো সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় যে অদ্ভুত কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিল, তীব্রতম পরিস্থিতিতেও কোনো বদ্ধ পাগলের কণ্ঠস্বরের সঙ্গেও তার সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। আমি অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে, মন্ত্রমুগ্ধের মতোই তার যুক্তি সঙ্গত বক্তব্য শুনতে লাগলাম।
তিনি বলে চললেন–আরে বন্ধু, পাগল হলেও সে তো কোনো-না-কোনো দেশ আর অঞ্চলের মানুষ তো বটে। আর তারনিজস্ব একটা ভাষাও থাকবেই থাকবে। কারো বক্তব্য যত অসংলগ্নই হোক না কেন তাতে প্রচলিত শব্দের উল্লেখ তো লক্ষিত হবেই। আরও আছে বন্ধু।
আরও? যেমন?
কোনো পাগলের চুল হলে সেগুলো অবশ্যই আমার হাতের চুলের গোছার মতো কিছুতেই হতো না। এবার কয়েকটা চুল আমার দিকে এগিয়ে ধরে বললেন–এ চুল কটার রহস্য কী, বলতে পারেন?
কী? কী ব্যাপার ঐ রহস্যের?
এগুলো আমি যোগাড় করেছি মাদাম ল এস্পালয়ের মুঠো করা হাতের আঙুলের ফাঁক থেকে।
তাই বুঝি?
হ্যাঁ, ঠিক তা-ই।
শুনুন মি. দুর্প, মুহূর্তের জন্য আরও চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে নিয়ে আমি বললাম–এ চুলগুলো অবশ্যই সাধারণ, মানে মানুষের চুলই নয়। মানুষের এরকমটা হতে পারে না। কিছুতেই না।
মঁসিয়ে দুপঁ বললেন–কই, এগুলো মানুষের চুল এমন কথা তো আমি বলিনি। এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেবার আগে আমি চাই আমার নিজের হাতে আঁকা এ রেখাচিত্রটা আপনি একবার দেখুন।
আমি তার হাতের কাগজটার দিকে তাকালাম।
তিনি বলে চললেন–দেখুন, সাক্ষীদের কারো কারো সাক্ষ্যের এক জায়গায় যাকে মাদামোয়াজেল ল এস্পালায়ের গলার ওপরের থেঁতলে যাওয়ার জন্য কালো দাগ বলে ব্যক্ত করা হয়েছে আর বলা হয়েছে, নখের আঁচড়, আবার এমনও বলা। হয়েছে আঙুলের চাপের জন্য কালসিটে পড়ার দাগ, এটাকে তারই কার্বনকপি বলে মনে করতে পারেন। মোদ্দা কথা, সে চিহ্নগুলোকেই আমি রেখাচিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছি।
