এবার স্প্রিংটার গায়ে চাপ প্রয়োগ করে শার্সিটাকে ইঞ্চি কয়েক ওপরে উঠিয়ে দিলাম। দেখা গেল, গজালের ভাঙা মাথাটা যথাযথভাবে থেকে শার্সিটার সঙ্গে উঠে এসেছে। এবার জানালার পাল্লা ঠেলে বন্ধ করে দিলাম। দেখতে পেলাম, সম্পূর্ণ গজালের চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্যটা আবার সম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রহস্যটার সমাধান এ পর্যন্ত করা সম্ভব হলো।
আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম। খুনি কাজ সেরে জানালা দিয়েই গা-ঢাকা দিয়েছিল না। সে চলে গেলে জানালাটা কেউ বন্ধ করে দিক বা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাক, ম্প্রিংয়ের চাপে সেটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তদন্ত করার সময় পুলিশ স্প্রিংটাকে গজাল মনে করে ভুল করেছে। আর এরই ফলে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর তদন্ত করার দরকার নেই।
এ পর্যন্ত বলে বন্ধুবর দুপঁ মুহূর্তের জন্য থেমে একটু দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করল–চলুন, এবার ঘরটার ভেতরের দিকটা ঘুরে দেখা যাক। সাক্ষীরা সাক্ষ্যদানের সময় বলেছেন, ঘরের ট্রাঙ্কাগুলো লুঠ করে নেওয়া হয়েছিল, যদিও তনও তার ভেতরে প্রচুর অলঙ্কারদি রয়ে গিয়েছিল। আমি রীতিমত জোর দিয়েই বলছি, এটা অবশ্যই একটা অবাস্তব ধারণা। আরও খোলসা করে বললে,নির্ঘাৎ একটা বাজে ধারণা করা হয়েছিল।
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাঁর মুখের দিকে তাকালাম। তিনি পূর্ব প্রসঙ্গে জের টেনেই বললেন–দেখুন অলঙ্করাদি; মানে ট্রঙ্কের ভেতরে যেসব জিনিস দেখা গিয়েছিল কেবলমাত্র সেগুলোই যে প্রথম থেকেই সেখানে রক্ষিত ছিল, তা আমাদের তো জানার উপায় নেই। আর একটা কথা ভেবে দেখার আছে, মাদাম ল এস্পালয়ে আর তার মেয়ে বিশাল বাড়িটাতে নির্বাসিতার মতো, মানে পুরোপুরি নির্জন-নিরালায় দিন। কাটাতেন। কারো সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের বালাই ছিল না। আর তাদের বাইরে যাওয়ার দরকার খুব কমই হতো।
আর যেহেতু বাইরের লোকজনের সঙ্গে তাদের প্রায় যোগাযোগই ছিল না, তাই বার বার পোশাক পাল্টাবারও দরকার হতো না। ঘরটায় যেসব জিনিস নজরে পড়েছে সেগুলো সবই উন্নতমানের এবং অবশ্যই এ মহিলা দুজনের উপযোগি। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, কেউ যদি চুরি করার উদ্দেশ্য নিয়েই ঘরটায় ঢুকত তবে তো সবচেয়ে দামি জিনিসটাই হাতিয়ে নেবে, তাই না?
আমি প্রায় অস্ফুট উচ্চারণ করলাম–হুম!
মঁসিয়ে দুপঁ পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বলে চলল–কেবলমাত্র সবচেয়ে দামি জিনিসই নয়, সবই নিয়ে তো অনায়াসে চম্পট দিতে পারত। তা করল না-ই বা কেন? সংক্ষেপে বলতে গেলে, চার হাজার ফ্লার সোনার অলঙ্কার তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ফেলে রেখে কেবলমাত্র পোশাকের একটা গাট্টি নিয়ে গিয়ে নিজেকে বঞ্চিত করারই বা কারণ কি? যা-ই হোক সোনাদানায় হাত দিল না।
ব্যাঙ্কের মালিক মি. মগিনো তার সাক্ষ্যতে যে পরিমাণ সোনার কথা বলেছেন, তা পুরোটাই থলির মধ্যে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। অতএব সাক্ষ্যতে সে বাড়িতে এসে ফ্রর থলে পৌঁছে দেবার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর সে কথা বিবেচনা করে পুলিশের মনে খুনের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। আমি চাই সেটাকে আপনি মাথা থেকে ঝেড়ে মুছে ফেলে দিন।
ফ্রাঁর থলে দিয়ে যাবার তিন দিনের মধ্যে খুন হয়ে যাওয়ার চেয়ে দশগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আমাদের জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে আকছারই ঘটতে দেখা যায়। আমরা কিন্তু সেদিকে ভুলেও ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি না, চেষ্টাও করি না।
এ ঘটনাটাতে যদি সোনাদানাগুলো চুরি হয়ে যেত ততে তিনদিন আগেই সেটা উদ্ধার করে দেওয়ার কাজটাকে নিতান্তই যোগাযোগের বেশিকিছু বলেই মনে করে নেওয়া যেত। আর সেটাকেই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য বলে মনে করা হতো, ঠিক কি না?
আমি কিছু বলার জন্য যেই না মুখ খুলতে যাব অমনি মি. দুপঁ নিজেই আবার বলতে লাগলেন–এ পর্যন্ত যা-কিছু বললাম তাতে বাস্তবে যা দেখা যাচ্ছে, তাতে সোনাদানাগুলোকে হত্যার উদ্দেশ্য বলে মনে করা হয় তবে তো আমাদের এটাও বিবেচনা করা দরকার যে, হত্যাকারী এমনই এক আহাম্মক যে এক সঙ্গেই দুটোকেই বাতিল করেছে।
আমি ঐ দুটোকে কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে বললাম–এক সঙ্গে দুটোকেই বাতিল করেছে বলতে আপনি কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছেন, মি. দুঁপ?
মি. দুপঁ মুচকি হেসে বললেন–সোনা আর তার উদ্দেশ্যটার কথা বলতে চাইছি, বুঝেছেন?
আমি ঠোঁটের কোণে অনুরূপ হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে নীরবে ঘাড় নাড়িয়ে তার কথার জবাব দিলাম।
দুপঁ বলে চললেন এবার অদ্ভুত যে সব কথাবার্তা, মানে কণ্ঠস্বরের ইঙ্গিত দিচ্ছি, কাজ হাসিল করার উদ্দেশ্যে অতিমাত্রা ক্ষিপ্রতা, এমন ভয়ঙ্কর একটা মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পিছনে কোনোই উদ্দেশ্য না-থাকা, এসব ব্যাপার-স্যাপারকে মনের কোণে স্থায়ীভাবে গেঁথে নিয়ে মনের ঘটনাটার দিকেই আমরা মনপ্রাণ সঁপে দেই, কী বলেন?
আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই মঁসিয়ে দুঁপই আবার বলতে লাগলেন– অকুস্থলে পৌঁছলে আমরা কি দেখতে পাব? দেখতে পাব, এক মহিলাকে গলা টিপে খুন করা হয়েছে। তার লাশটার মাথাটাকে ওপরের দিকে রেখে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে চেপে চেপে সেটাকে চুল্লির ওপরকার চিমনিটাতে গুঁজে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ হত্যাকারীদের খুনের পদ্ধতি এটা অবশ্যই নয়। আর লাম গায়েব করার পদ্ধতিও মোটেই এটা নয়।
