অতএব উপরোক্ত আপাত অবাস্তবগুলো বাস্তবক্ষেত্রে অবাস্তব নয়, এটা আমাদের প্রমাণ করা দরকার হয়ে পড়েছে।
আমরা আবার অকুস্থলে, অর্থাৎ ঘরটায় ফিরে যাই। ঘরটায় দুটো জানালা। তাদের মধ্যে একটাকে সম্পূর্ণরূপে দেখা যায়, আসবাবপত্রে ঢাকা পড়ে যায়নি।
আর অন্য জানালাটার খুব কাছাকাছি বড় খাটটা রয়েছে। আর তার মাথাটা জানালাটাকে ঢেকে রেখেছে, যার ফলে চোখেই পড়ে না। আর প্রথম জানালাটা ভেতর থেকে ছিটকিনি আঁটা থাকতে দেখা গেছে। বহু চেষ্টা করেও সেটাকে খোলা সম্ভব হয়নি। বড় একটা গজাল ব্যবহার করে আরও পোক্তভাবে আটকে দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় জানালাটায়ও গজাল দিয়ে সাঁটা। সেটাকেও খোলার চেষ্টা করে হতাশ হতে হয়েছে। তাই কেউ যে ঘর থেকে পালিয়ে যেতে পারেনি এ ব্যাপারে পুলিশ পুরোপুরি নিঃসন্দেহ। তাই কোনোই দরকার নেই ভেবে গজাল তুলে জানালা দুটোকে খুলে ফেলা হয়েছে। ব্যস, এ পর্যন্তই।
একটা কথা, আমার নিজের পরীক্ষাটা কিন্তু একটু আলাদা প্রকৃতির। কারণ, আমার তো জানাই ছিল, ঐ ক্ষেত্রে যাকে সম্ভব জ্ঞান করা হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে সে তা নয়, এটা প্রমাণ করাই আমার দায়িত্ব।
ব্যস, আমি এ রকমভাবেই ভাবনা চিন্তা আরম্ভ করলাম। তবে তা অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে।
আমি বলছি, পালাতে গিয়ে খুনিরা যে কোনো একটা জানালাই ব্যবহার করেছিল। তা যদি হয় তবে তো জানালার পাল্লাটা ভেতর থেকে আটকানো সম্ভব হতো। এরকম সিদ্ধান্ত নিয়েই পুলিশ এ পর্যন্ত এগিয়ে তদন্তের কাজ বন্ধ করেছে। কার্যক্ষেত্রে তো সেগুলোকে তো আটকানো অবস্থাতেই দেখা গেছে। তা যদি হয় তবে তো স্বীকার করতেই হয় জানালাগুলো নিজে থাকতেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এ রকম সিদ্ধান্ত না নিলে উপায়ও তো কিছু নেই।
আমি চাপা না-পড়ে থাকা জানালাটার কাছে এগিয়ে গেলাম। গজালটা উপড়ে ফেলার চেষ্টা করলাম। আমার সব প্রয়াস মাঠে মারা যাবে ভেবেছিলাম। বাস্তবে হলও ঠিক তাই। আমি নিশ্চিত ছিলাম, গোপন একটা স্প্রিং কোনো-না-কোনো জায়গায় ব্যবহার করা আছে। তন্ন তন্ন করে খুঁজতে গিয়ে বাঞ্ছিত স্পিংটার হদিশ ঠিক মিলে গেল। ব্যস, স্পিংটার গায়ে একটু চাপ প্রয়োগ করতেই দুম করে কাঁচটা উঠে গেল। আমার মন আনন্দে ডগমগ হয়ে উঠল।
এবার গজালটাকে তার আগের জায়গায় আবার বসিয়ে দিয়ে অনুসন্ধিৎসু নজরে লক্ষ্য করতে লাগলাম। নিঃসন্দেহ হলাম, কোনো একজনের পক্ষে জানালাটা দিয়ে গলে বাইরে চলে গিয়ে সেটাকে আবার বন্ধ করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে। স্প্রিংটার পক্ষেও আগের মতো কাজ করা সম্ভব।
এ পর্যন্ত ঠিকই আছে। কিন্তু গজালটা? সেটাকে তো আর আবার যথাস্থানে পুঁতে দেওয়া সম্ভব নয়। সিদ্ধান্তটা একেবারে পানির মতোই পরিষ্কার।
এবার আমার তদন্তের ব্যাপারটার পরিধি ছোট হয়ে গেল। খুনিরা নির্ঘাৎ অন্য কোনো পথ ব্যবহার করে চম্পট দিয়েছে। এবার যদি মনে করা হয়, দুটো জানালার কাঁচের স্প্রিং একই রকম, আর তা হওয়াই স্বাভাবিক; তবে গজাল দুটোর মধ্যে অবশ্যই কোনো-না-কোনো পার্থক্য থাকতে বাধ্য। আর কিছু না হলেও তাদের আটকাবার কৌশলের কোনো পার্থক্য অবশ্যই ছিল।
এবার আমার কাজ হলো দ্বিতীয় জানালাটার দিকে নজর দেওয়া। খাটের ওপর উঠে সেটাকে পরীক্ষা করে দেখলাম। ওপরের দিকে বোর্ডের পিছনে চোখ ফেরাতেই স্প্রিংটা নজরে পড়ে গেল। সেটার ওপর চাপ দিলাম। দেখলাম এ প্রিংটা আগেরটার মতোই বটে। আবার গজালটাও আগেরটার মতোই মোটাসোটা। ওপর। ওপর দেখে মনে হলো আগেরটার পদ্ধতিতেই বসানো। চেপে প্রায় মাথা পর্যন্ত ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বন্ধু, আপনি ভাবছ, আমি কর্তব্য হারিয়ে ফেলেছিলাম। আপনি যদি তা-ই ভেবে থাকেন তবে আমি বলব, আমার অনুমানের পদ্ধতিটাকেই আপনি ভুল বুঝেছেন। আসলে কিন্তু আমার দিক থেকে কোনো ভুলই হয়নি। এমনকি ক্ষণিকের জন্য আমার ঘ্রাণশক্তিও লোপ পায়নি। আর আমার কাজের ধারার মধ্যেও কোনো দোষ-ত্রুটি ছিল না।
এবার কি বলছি ধৈর্য ধরে শুনুন, গোপন কথাটাকে শেষ অবধি অনুসরণ করেছি। আর ওই গজালটাই হচ্ছে তার ফলশ্রুতি। আমার কথা বিশ্বাস করুন, সেটা সর্বতোভাবে অন্য গজালটার আকৃতি বিশিষ্টই বটে। এ পর্যন্তই সূত্রটা শেষ হয়েছে ধরে নিয়ে বিচার করতে বসলে দেখা যাবে, গজাল দুটোর সাদৃশ্যটাই পুরোপুরি অবাস্তব।
আমি এবার আর মুখ বুজে থাকতে পারলাম না। বললাম–দেখুন মি. দুৰ্প, গজালটা সম্বন্ধে অবশ্যই কোনো-না-কোনো ভুল করা হয়েছে। কথাটা বলতে বলতে আমি গজালটার ওপর হাত রাখলাম। ব্যস, সেটা পৌনে এক ইঞ্চিসহ মাথাটা খুলে আমার হাতে চলে এলো। আর অবশিষ্ট অংশ রয়ে গেল কাঠের গায়েই। ভেঙে যাওয়ার ব্যাপারটা নতুন নয়, পুরনো। কারণ ভাঙা জায়গাটায় মরচে পড়ার জন্যই। এমনটা সম্ভব নয়। আর একটা হাতুড়ির আঘাতের মাধ্যমে সেটা করা হয়েছে। আর এরই ফলে গজালের মাথাটা শার্সির তলায় বসে গিয়েছিল।
আমি আবার গজালের মাথাটাকে ভাঙা জায়গাটাতেই বসিয়ে রাখলাম। ব্যস, সেটা দেখে কেউ অস্বীকার করবেন না যে, সেটা একটা আস্ত গজাল নয়। কোনো ভাঙা-দাগ দেখা নয়া যাওয়ায় সেটা যে আস্ত গজাল নয়, এমন ধারণা কারো মাথায়ই আসার কথা নয়।
