হুম! আমি প্রায় অস্ফুট উচ্চারণ করলাম।
মঁসিয়ে দুপঁ এবার আমার দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, মি., আপনি হয়তো এবার বলবেন, কণ্ঠস্বরটা কোনো আফ্রিকাবাসী বা এশিয়াবাসীর হওয়া সম্ভব। কিন্তু কথা হচ্ছে, প্যারিস শহরে দলে দলে আফ্রিকাবাসী বা এশিয়াবাসী বাস করে না।
আমি কিন্তু–
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই মি. দুপঁ আবার বলতে লাগলেন–দেখুন, আপনার সে ধারণার পূর্ণ মর্যাদা দিয়েই তিনটি ব্যাপারের প্রতি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি।
বলুন, কি বলতে চাইছেন, বলুন?
আশা করি আপনার অবশ্যই স্মরণ আছে, সাক্ষীদের মধ্যে একজন মন্তব্য করেছেন যে, কণ্ঠস্বরটা তীক্ষ্ণ ছিল বটে, কিন্তু তার চেয়ে, অনেক বেশি ককৰ্শ ছিল।
হুম!
অন্য দুজন সাক্ষীর মতে, কণ্ঠস্বরটা ছিল খুবই দ্রুত আর অসমান। অতএব এতে বোঝা যাচ্ছে, কোনো শব্দ বা কোনো শব্দের অনুরূপ উচ্চারণকেই কোনো সাক্ষীই বোধগম্য বলেননি, সত্য কি না?
আমি আমতা আমতা করে বললাম–হ্যাঁ, তা অবশ্য সত্য।
বন্ধুবর দুর্পস তার বক্তব্য অব্যাহত রাখলেন–আমি বুঝতে পারছি না মি., আপনার জ্ঞান-বুদ্ধির ওপর আমার বক্তব্য কতখানি ছায়াপাত করতে পেরেছে। তবে এ-কথা কিন্তু আমিনিসংকোচে বলতে পারি, সাক্ষীর সাক্ষ্যদানের তীক্ষ্ণ আর কর্কশ কণ্ঠস্বর কথাটা দুটো থেকেই যে যুক্তিগ্রাহ্য ও সঙ্গত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব সেটাই এখন একটা সন্দেহের উদ্রেক করতেই পারে। আর তার মাধ্যমেই রহস্যটার অবশিষ্ট তদন্তের পথ বেছে নেওয়া সম্ভব। যুক্তিগ্রাহ্য এবং সঙ্গত সিদ্ধান্তের মাধ্যমেও কিন্তু আমার বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে ব্যক্ত হয়নি।
আপনার ইঙ্গিতটা আমার কাছে পরিষ্কার হলো না।
আমি আপনাকে এটাই বোঝাতে চাইছি যে, একমাত্র সিদ্ধান্তের কথা আপনাকে বললাম তা থেকেই সন্দেহটা নিশ্চিতভাবে মনে জাগে।
কিন্তু সে সন্দেহটা—
সন্দেহটা সম্বন্ধে আমি কিন্তু এখন কিছুতেই মুখ খুলব না।
তবে আমাকে আপনি কী করতে বলছেন?
আপনার কাছে আমি কেবলমাত্র এটুকুই বলতে চাইছি, আমার সঙ্গে আপনিও এ-কথাটা মনে রাখবেন, আমার মনের উদ্ভুত সন্দেহটা ভবিষ্যৎ তদন্তকে পথ দেখাবার ক্ষেত্রে খুবই শক্তিশালী। আপাতত এটুকু বুঝলেই চলবে।
আমি নীরবে ঘাড় কাৎ করলাম।
বন্ধুবর দুপঁ আবার মুখ খুললেন–এখন আমরা বরং এখানে বসইে অকুস্থল, মানে ওই ঘরটা সম্বন্ধে কল্পনার মাধ্যমে বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখি। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা সেখানে কীসের তল্লাশ করব? হত্যাকাণ্ড সেরে হত্যাকারীরা কোন পথে বাড়িটা থেকে চম্পট দিয়েছিল? আশা করি এ-কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের মধ্যে কেউ-ই অতিপ্রকৃত ঘটনায় আস্থাবান নই। অতএব আমরা বলব, মাদামোয়াজেল ল এস্পালয়ে আর মাদামকে অবশ্যই কোনো অশরীরী হত্যা করেনি। তাই বলতেই হয়, দু-দুটো খুন যাদের বা যার হাতে হয়েছে সেনির্ঘাৎ কোনো-না কোনো রক্তমাংসে গড়া মানুষ। আর সে অবশ্যই কোনো একটা না একটা বাস্তব পথ দিয়েই গা-ঢাকা দিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, খুনি কাজ হাসিল করে কোন্ পথে গা-ঢাকা দিয়েছে? ভাগ্যগুণে আমাদের সামনে একটামাত্র পথই খোলা রয়েছে। আর সে পথ অনুসরণ করে এগোলেই আমরা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে হাজির হতে পারব বলেই আমি মনে করছি।
এবার সে বাড়িটা থেকে কেটে পড়ার স্বাভাবিক পথগুলোর কথা একটা একটা করে বিচার বিশ্লেষণ দেখা যেতে পারে। একটা ব্যাপারে কিন্তু কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয় যে, চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুনে বাইরে থেকে ছুটে বাড়িটার ভেতরে যে লোকগুলো ঢুকে ছিলেন এবং সিঁড়ি দিয়ে ব্যস্তপায়ে ওপরে উঠে যান তখন মাদামোয়াজেল যে ঘরে ছিলেন সে ঘরেই খুনিরাও ছিল। আর তা যদি না-ও থাকে তবে তার লাগোয়া ঘরটায় ছিল। এ-কথা যদি আমরা মেনে নেই তবে কেবলমাত্র দুটো ঘর থেকেই পালিয়ে যাবার মতো পথের খোঁজ করতে হবে।
এবার পুলিশী তৎপরতার কথা ভাবা যাক। তারা মেঝে আর শিলিং দু-ই খুলে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। আরও আছে, চারদিকে দেওয়ালের পলেস্তারা তুলে তছনছ করে দিয়েছে। কিন্তু গোপন কোনো পথেরই হদিস তারা পায়নি।
আমি পুলিশের ওপর আস্থা না করে নিজে সবকিছু ঘাটাঘাটি করে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছি। সিদ্ধান্ত নিতেই বাধ্য হয়েছি, কোনো গুপ্তপথের অস্তিত্বই নেই।
ঘটনার সময় ঘর থেকে বারান্দায় বেরোবার দু দুটো দরজাই ভেতর থেকে বন্ধ, তালাবন্ধ ছিল। অতএব এদিক থেকেও নতুন কোনো চিন্তায় পৌঁছানো সম্ভব নয়।
আমরা এবার বরং চুল্লিটার কাছে যাই। তার ওপরকার চিমনিটার দিকে নজর দেই, কেমন? সেটা চুল্লি থেকে আট-দশ ফুট অবধি সাধারণ ব্যাসযুক্ত ঠিকই। কিন্তু একটা বিভাগ পর্যন্ত গোড়া থেকে শেষাবধি সেটার ভেতর দিয়ে গলে যেতে পারবে না। এতই সরু।
চিমনি-পথে খুনি বা খুনিদের পক্ষে বেরিয়ে যাওয়ার চিন্তা যখন একেবারেই অবাস্তব তখন শেষমেশ জানালাগুলোর কথা ভেবে দেখা যাক। সামনের দিকের জানালা দিয়ে পথে ভিড় করে দাঁড়িয়ে-থাকা মানুষগুলোর চোখে ধুলো দিয়ে কারো পক্ষে চম্পট দেওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। তবে? আততায়ী কোন পথে গা-ঢাকা দিতে পারে? পিছনের দিককার ঘর দিয়ে? আমাদের মাথায় যখন এ-চিন্তাটা একবার উঁকি দিয়েছে তখন যুক্তির তাগিদে নিছকই অসম্ভব বলে তাকে কেটে হেঁটে ফেলতে পারি না, উচিতও নয়।
