আমি আমতা আমতা করে বললাম–হ্যাঁ, তা হয়েছে বটে।
মি. দুপঁ বলে চললেন–এবার মন দিয়ে শুনুন আমি কি বলতে চাইছি–বৃদ্ধা মহিলা মাদামোয়াজেল ল এস্পালয়ের আগে মেয়েকে খুন করে, তারপর আত্মহত্যা করেছে কি না এরকম সন্দেহ যদি কারো মনে জেগে থাকে তবে এটা থেকেই সে সন্দেহের অবসান ঘটে যাবে।
আমি স্তম্ভিতের মতো গোল গোল চোখে ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।
মি. দুপঁ আমার জিজ্ঞাসা দূর করার জন্য এবার বললেন–আমার এ-কথাটা বলার উদ্দেশ্য তদন্ত পদ্ধতির কথা ব্যক্ত করা। কারণ, চুল্লির ওপরের চিমনিটা থেকে মেয়ের লাশটা বের করতে গিয়ে যা মনে হয়েছে, যথেষ্ট বল প্রয়োগ করেই সেটাকে তার ভেতরে ঢোকাতে হয়েছিল। এমনভাবে সেটাকে ঠেলে ধাক্কে ভেতরে খুঁজে দেওয়ার মতো অমিত শক্তি-সামর্থ্য মাদাম ল এম্পালয়ের দেশে ছিল বলে মনে করা যায় না।
আমি মুখ খোলার চেষ্টা করতেই তিনি নিজেই আমার মনের উদ্ভুত জিজ্ঞাসার জবাব দিতে লাগলেন–হ্যাঁ, মাদাম ল এস্পালয়ের মৃতদেহের বিভিন্ন স্থানে যে সব ভয়ঙ্কর ক্ষতচিহ্ন লক্ষ্য করা গেছে তাতে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত দূরে সরে যেতেই হয়। তা-ই যদি মনে করা হয় তবে ধরেই নিতে হয় কোনো তৃতীয় পক্ষের দ্বারা হতাকাণ্ড দুটো ঘটেছে। আর ওই তৃতীয় পক্ষ একজন নয়, একাধিক। কারণ, তর্কাতর্কির সময় অনেকগুলো কণ্ঠস্বর শোনা গিয়েছিল, সাক্ষীরা সবাই বলেছেন।
হুম!
শুনুন মি., এবার আমি বলছি, এসব কণ্ঠস্বর সম্বন্ধে সাক্ষীরা যে সব সাক্ষ্যদান করেছেন, সে-সব তথ্য সম্বন্ধে নয়, তবে সেগুলোরই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রসঙ্গে। মুহূর্তের জন্য থেমে তিনি এবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন– আচ্ছা, এ ব্যাপারে বিশেষ কিছু কী আপনার নজরে ধরা পড়েছিল?
দেখুন মি. দুঁপ, কর্কশ কণ্ঠস্বরটার মালিক কোনো-না-কোনো এক ফরাসির, এ কথা সব সাক্ষী একমত ব্যক্ত করলেও তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরটা সম্বন্ধে কিন্তু সবাই ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন।
আরে মি., ও তো সাক্ষীদের মতামতের ব্যাপার।
তবে?
তবে আমি বিশেষ কোনো দিকের প্রতি দৃষ্টিপাত করছি এবং আপনার দৃষ্টি আকর্ষণও করতে চাইছি। এবার আমার দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন– আচ্ছা, ভালো করে ভেবে দেখুন তো, সেখানে কী আপনার নজরে বিশেষ কিছুই পড়েনি? আমি কিন্তু বলব, লক্ষ্য করার মতো অবশ্যই কিছু ছিল।
ছিল! বিশেষ কিছু আপনার নজরে পড়েছে?
কেবলমাত্র আমার কথাই বা বলেন কেন, আপনিও তো বলেছেন, সাক্ষীরা কর্কশ কণ্ঠস্বরটা সম্বন্ধে সহমত পোষণ করেছেন। এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে সামান্যতম মতপার্থক্যও নেই, ঠিক কি না?
হ্যাঁ, তা-তো বলেছিই।
আর তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরটার ব্যাপারে কিন্তু একটা বিশেষত্ব অবশ্যই ছিল।
বিশেষত্ব। বিশেষত্ব ছিল?
অবশ্যই ছিল, এ প্রসঙ্গে সাক্ষীরা যে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মতো ব্যক্ত করেছেন, তা-ও নয়। ইংরেজ, ইতালীয়, স্পেনীয়, ফরাসি বা ওলন্দাজ যা-ই হোক না কেন সে কণ্ঠস্বর সম্বন্ধে মত ব্যক্ত করতে গিয়ে কিন্তু সবাই বলেছেন সেটা একটা বিদেশির কণ্ঠস্বর। সেটা সে তার দেশবাসী কারো নয় এ ব্যাপারে প্রত্যেকেই নিঃসন্দেহ। আর কণ্ঠস্বরটা সম্বন্ধে মত ব্যক্ত করতে গিয়ে সবাই দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেছেন, এমন কারো কণ্ঠস্বর নয় যার দেশের ভাষার ওপর তার দখল রয়েছে–বরং সম্পূর্ণ বিপরীত।
হ্যাঁ, এ-কথা স্বীকার করতেই হয়, আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম।
তিনি আমার কথা শেষপর্যন্ত শোনার জন্য অপেক্ষা না করেই আবার বলতে শুরু করলেন–সাক্ষীদের বক্তব্যগুলোকে আমরা পাশাপাশি রাখলে দেখতে পাব, ওলন্দাজ সাক্ষী ভেবেছেন, কণ্ঠস্বরটা কোনো-না-কোনো ফরাসির। কিন্তু কার্যত দেখা গেছে, ফরাসি ভাষায় দখল না থাকার জন্য দো-ভাষীর সাহায্যে সাক্ষীর সঙ্গে কথাবার্তা বলা হয়েছে। ফরাসি লোকটা সেটাকে স্পেনীয় ভাষা বলেই মতো প্রকাশ করেছেন। এও স্পষ্ট ভাষায়ই তিনি বলেছেন, স্পেনীস ভাষায় তার দখল থাকলে তিনি তাদের বাদানুবাদের কারণ সম্বন্ধে ধারণা করতে পারতেন। ইংরেজ সাক্ষীর মতে লোকটা জার্মানি। আর জার্মান ভাষায় তার অজ্ঞতার জন্যই তিনি বক্তব্যটা বোঝা তো দূরের ব্যাপার, সামান্যতম আঁচও করতে পারেননি।
আর স্পেনীয় সাক্ষীর মতে, সে কণ্ঠস্বরের মালিক কোনো এক ইংরেজি। ইংরেজি ভাষা তিনি তিলমাত্রও জানেন না। তবে তিনি কি করে এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হচ্ছেন? তিনি বক্তার কথা বলার ভাব-ভঙ্গি দেখেই নিশ্চিত হতে পেরেছেন।
এদিকে ইতালীয় সাক্ষীর মতে, কণ্ঠস্বরটা ছিল কোনো-না-কোনো রুশের। কিন্তু ইতিপূর্বে তিনি কোনোদিন কোনো রাশিয়ানের সাথে কথা বলেননি।
দ্বিতীয় ফরাসি সাক্ষী প্রথম ফরাসি সাক্ষী থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মতো ব্যক্ত করেছেন। তিনি নিজের মতো ব্যক্ত করতে গিয়ে রীতিমত দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেছেন, নিঃসন্দেহে কণ্ঠস্বরটা কোনো এক ইতালিয়ের।
উপরোক্ত সাক্ষীদের বক্তব্য থেকে স্পষ্টই প্রমাণিত হচ্ছে, কণ্ঠস্বরটা যারপরনাই বিচিত্র প্রকৃতির, ঠিক কি না।
আমি, ঘাড় নেড়ে তার বক্তব্যটা সমর্থন করলাম। আর তার বাচনভঙ্গি এমনই অদ্ভুত ধরনের ছিল যার ফলে সাক্ষীরা এমন মতামত ব্যক্ত না করে পারেননি। আর এরই জন্য ইউরোপের পাঁচ-পাঁচটা বড়সড় দেশের বাসিন্দারা তাতে তাদের জানা কোনো শব্দ পেলেন না, সামান্যতম আঁচও করতে পারলেন না।
