এক সময় আচমকা তিনি আমায় প্রশ্ন করলেন একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাইছি, দয়া করে উত্তর দেবেন কী?
তার মুখে এমন আকস্মিক প্রশ্নটা শুনে আমি কেমন হকচকিয়ে গেলাম। পরমুহূর্তেই নিজেকে একটু সামলে নিয়ে, মুচকি হেসে বললাম সে কী কথা! উত্তর না দেওয়ার কী হলো! আপনি কি জানতে চাইছেন, নির্দিধায় বলতে পারেন।
হত্যাকাণ্ডের বাড়িটায় তো গেলেন, বিশেষভাবে লক্ষ্য করার মতো কিছু নজরে পড়েছিল কী?
আমি ভ্রূ দুটো কুঁচকে তার দিকে তাকালাম। কি বলব ভেবে না পেয়ে নিস্পলক চোখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।
তিনি বিশেষভাবে শব্দটার ওপর অধিকতর চাপ দিয়ে কথাটা আবারও আমার কাছে পাড়লেন।
আমি আমতা আমতা করে বললাম–বিশেষ কিছু?
হ্যাঁ, বিশেষ কিছু নজরে পড়েছে কী?
না, তেমন কিছু তো নজরে পড়েনি। খবরের কাগজের পাতায় যা কিছু পড়েছিলাম তার চেয়ে বেশি কিছু তো আমার নজরে অন্তত পড়েনি মি. দুপঁ।
আশা করি আপনার স্মরণ আছে, রহস্যজনক ঘটনাটার আতঙ্কের ব্যাপারটা নিয়ে খবরের কাগজ কিছু বলেনি, ঠিক কি না?
গেজেটের কথা বলছেন তো?
হ্যাঁ, যাক গে, ছাপানো পত্রিকার হালকা আলোচনার কথা ছেড়েই দেওয়া যাক। আমার তো বিশ্বাস, সে জন্য এ রহস্যজনক ঘটনাটাকে সমাধানযোগ্য মনে করা দরকার। ঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেই ঘটনাটাকে সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে।
মুহূর্তের জন্য থেমে তিনি আবার সরব হলেন–দেখুন মি. হত্যা করার উদ্দেশ্যটা নয়, কিন্তু এ-হত্যার পাশবিকতার উদ্দেশ্যের আপাত অভাব লক্ষ্য করেই পুলিশ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে।
আর তর্কাতর্কি সম্বন্ধে দ্রুত বিভিন্ন রকম কণ্ঠস্বরের সঙ্গে নিহত মাদামোয়াজেল ল এস্পালয়ে ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তিকে ওপর তলায় খুঁজে না পাওয়া ও বহিরাগত যারা ওপরে গিয়েছিল তাদের চোখে ধুলো দিয়ে বাড়িটা থেকে বাইরে বেরিয়ে যাবার কোনো দরজা বা উপায় না থাকার জন্য ঘটনাগুলোকে একসঙ্গে জড়ো করে একটা সুতোয় গাঁথার অসম্ভব ব্যাপারটাই পুলিশকে আরও বেশি করে অস্থির করে তুলেছে।
এবার ঘরটার এলোমেলো, একেবারে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যাওয়ার দৃশ্যটা, লাশটার মাথাটাকে নিচে ঝুলিয়ে রেখে শক্ত লাঠি বা সেরকম কোনো শক্ত দণ্ড দিয়ে ঠেলে ধাকে ভেতরে গুঁজে দেওয়ার ব্যাপারটা, বৃদ্ধা মাদামোয়াজেল ল এস্পালয়ের দেহটার ছাল চামড়া তুলে বিশ্রিরকম বিকৃত করে দেওয়া আরও অনেকগুলো টুকরো টুকরো ঘটনা সরকারের পোষা বাছাধনদের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে, একেবারে ঘোলাপান্তা খাইয়ে ছেড়েছে।
দুর্বোধ্যতা আর অস্বাভাবিকতাকে এক সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে দিয়েই সাধারণ ভুলে হাবুডুবু খাচ্ছে।
আমি প্রায় অস্ফুট উচ্চারণ করলাম–হুম!
বন্ধুবর বলে চললেন–দেখুন, এ সাধারণ গাঁটটাকে অতিক্রম করতে পারলেই বুঝি সত্য পথটার হদিস পেয়ে যাবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সত্যি কথা বলতে কি, এ রহস্যটা পুলিশের দৃষ্টি যত দুর্বোধ্য এবং সমাধান অসম্ভব বলে মনে হয়েছে ঠিক তত সহজেই আমি রহস্যটা ভেদ করতে পারব বলেই দৃঢ় বিশ্বাস রাখি। সমাধান করে বলেও মনে করতে পারেন।
আমি অতর্কিতে বিস্ময়-মাখানো দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে নীরব চাহনি মেলে তাকালাম। কি যে বলব, ভেবেই পেলাম না।
আমাদের সদর-দরজার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে সে বলল–এ মুহূর্তে আমি এমন এক ব্যক্তির পথ চেয়ে রয়েছি যে এ দু-দুটো ভয়ঙ্করতম ও জঘন্যতম খুনের নায়ক না হলেও কিছু না কিছু অংশে দায়ী। এর সবচেয়ে মারাত্মক কাজের ব্যাপারে সে নিরপরাধ হতে পারে বটে। তবে আমি এও অনুমান করছি, আমার ধারণাটা অভ্রান্ত, কারণ তাকে কেন্দ্র করেই আমি চক্রটাকে দেখার চেষ্টায় রয়েছি।
কিন্তু কে এমন জঘন্যতম–
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই সে আবার বলতে আরম্ভ করল–আরে বন্ধু, যে কোনো মুহূর্তে তাকে এ ঘরটায় দেখা যেতে পারে। অবশ্য সে না-ও আসতে পারে, কিন্তু তার আসার সম্ভাবনাই বেশি বলে আমি মনে করছি।
ভালো কথা, আপনার বাঞ্ছিত লোকটা যদি এখানে এসেই পরে, তবে?
যদি এসেই পড়ে তবে তাকে আটকে রাখতে হবে।
আটকে রাখবেন?
অবশ্যই।
আমরা বললেই সে লক্ষ্মী ছেলের মতো
আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বন্ধুবর মি. দুপঁ বলে উঠলেন–আরে ধ্যুৎ! তা হবে কেন? কথা বলতে বলতে তিনি কোটের পকেট থেকে দুটো পিস্তল বের করে আমার সামনে ধরে বললেন–
এই যে, এ দুটোর সাহায্যে। প্রয়োজনের তাগিদে এ দুটোর ব্যবহার তো আমাদের কারো আর অজানা নয়, কী বলেন?
হুম!
দরকার হলে এ দুটো ব্যবহার করে আমরা সে শয়তানটাকে কজায় আনবই আনব।
আমি কি করতে চলেছি, না ভেবে, না বুঝেই অথবা যা-কিছু শুনলাম, বিশ্বাস করেই তার হাত থেকে পিস্তল দুটোকে নিলাম।
বন্ধুবর দুপঁ স্বগতোক্তির মতোই প্রায় অনুচ্চারিত কণ্ঠে বলতে লাগলেন–আমি ইতিপূর্বেই বলে রেখেছি, এমন সব মুহূর্তে তিনি যেন কেমন নৈর্ব্যক্তিক হয়ে ওঠে।
এবার অধিকতর স্পষ্টভাবে, চড়া গলায় না হলেও একটু জোরে জোরেই সে বলল–দূরে অবস্থানরত কাউকে যেন বলছে এমন স্বরেই বলল–দেখুন, বহিরাগত যে দলটা বাড়িটার ভেতরে ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় চিল্লাচিল্লি কথা কাটাকাটিতে লিপ্ত লোকগুলোর কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিল, তা গৃহীত সাক্ষীদের সাক্ষ্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, সেগুলো কোন মহিলা বা মহিলাদের কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হয়নি, তাই নয় কী?
