সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পর্যালোচনা করে লক্ষ করা যাচ্ছে ঘটনাটা নিয়ে মি. সি. অগাস্ত দুপঁ খুবই আগ্রহান্বিত। আর কিছু না হোক তার মতিগতি দেখে আমার এরকমই বিশ্বাস। সবচেয়ে বড় কথা, সে ব্যাপারটা নিয়ে ভালো-মন্দ কিছুই বলছে না। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম লি বে-কে গ্রেপ্তার করে জেরে আটক করার কথা খবরের কাগজ মারফৎ প্রচার হবার পরই সে হত্যার ব্যাপারটা নিয়ে প্রথম আমার মতামত জানার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে।
এ রহস্যজনক হত্যাকাণ্ড দুটোর রহস্যভেদের অতীত রহস্য বলে জ্ঞান করা সম্বন্ধে প্যারিসের সব মানুষের সঙ্গে আমি নির্দিধায় সহমত পোষণ করছি। এ হত্যাকাণ্ডের রহস্যভেদের সূত্রের সন্ধান করার কোনো উপায়ই আমার মাথায় আসেনি।
বন্ধুবর দুপঁ মুখ খুললেন–দেখুন মি., রহস্যভেদের ব্যাপারে এসব কেবলমাত্র তদন্তের বাইরের দিকটা দেখে সে পথ সম্বন্ধে বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া সঙ্গত হবে না।
প্যারিসের পুলিশের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্বন্ধে অনেকেই বহুভাবে ভূয়সি প্রশংসা করেন সত্য। কিন্তু তাদের বুদ্ধিমত্তা আছে যথেষ্টই। ব্যস, এটুকুই। আর তাৎক্ষণিক উপায় অবলম্বন ছাড়া তাদের কাজকর্মে লক্ষ্যনীয় কোনো পদ্ধতিই থাকে না। তারা হম্বিতম্বিসহ নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করে ফেলে। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই কাজের বেলা দেখা যায়, উদ্দেশ্য সিদ্ধির ব্যাপারে সেগুলো মোটেই সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করা হয় না। তাদের কাজের ফল যা দেখা যায় সেগুলো চমক লাগানোর মতোই বটে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে ফল লাভ সম্ভব হয় অল্প পরিশ্রম আর সহজ-সরল কাজকর্মের মাধ্যমে। কার্যক্ষেত্রে এসব গুণাবলী যেখানে অনুপস্থিত থাকে সেখানেই তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
উল্লেখিত হত্যাকাণ্ড দুটোর রহস্যভেদের ব্যাপারে পুলিশের মতামত ব্যক্ত করার আগে আমরা নিজেরাই কিছুটা অগ্রসর হই, তদন্ত করে দেখি কতদূর কি করা যায়।
সত্যি কথা বলতে কি, রহস্যটা নিয়ে তদন্তে নামলে কিছুটা অন্তত আনন্দ তো পাওয়াই যাবে, কৌতূহলও নিবৃত্ত হবে। সবচেয়ে বড় কথা, লি বে কোনো এক সময় আমার কিছু উপকার করেছিল। এ কারণেই আমি তার কাছে কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ।
পুলিশ দপ্তরের প্রিফেক্টসির সঙ্গে আমার যথেষ্ট পরিচয় রয়েছে। ফলে তদন্তের ব্যাপারে অনুমতি লাভ করতে কোনো সমস্যাই হওয়ার কথা নয়।
কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, আমার অনুমানই সত্য, পুলিশ দপ্তরের প্রিফেক্ট জির কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত কম সময়ের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডটার তদন্তের অনুমতি পেয়ে গেলাম।
ব্যস, পুলিশের অনুমতিপত্রটা হাতে পাওয়ার পর মুহূর্তমাত্রও সময় নষ্ট না করে আমরা রুমর্গের উদ্দেশে পা-বাড়ালাম।
নির্দিষ্ট স্থানটায় যখন আমরা পৌঁছলাম তখন বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যার আলো আঁধারির খেলা শুরু হয়ে গেছে।
আমাদের আশ্রয়স্থল আর নির্দিষ্ট সে জায়গাটার মধ্যে ব্যবধান যথেষ্টই।
আমাদের বাঞ্ছিত সে বাড়িটার হদিশ পেতেও মোটেই বেগ পেতে হলো না। এর কারণও আছে। বাড়িটার পাশের রাস্তার বিপরীত দিকে বহু লোকই উদ্দেশ্যহীন কৌতূহলের শিকার হয়ে বন্ধ-জানালাগুলোর খড়খড়ির দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সেটা প্যারিস শহরের খুবই সাদামাটা একটা বাড়ি। একটা সাধারণ ফটক আছে।
বাড়ির ভেতরে ঢোকার আগে আমরা পায়ে পায়ে এগিয়ে পাশের একটা গলিতে ঢুকলাম। তারপর আর একটা বাঁক ঘুরে বাড়িটার একেবারে পিছন দিকে হাজির হলাম।
আমরা বাড়িটার পিছন দিকটায় যাওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আমার সহযাত্রী বন্ধু দুঁপ বাড়িটাসহ সম্পূর্ণ অঞ্চলটা এত বেশি কৌতূহল ও মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল, যাকে আমি অহেতুক কাজ বলেই ধরে নিলাম।
বাড়িটার পিছন দিকটায় এক চক্কর মেরে আমরা আবার হাঁটতে হাঁটতে সামনের দিকে চলে এলাম। আমি প্রধান ফটকের গায়ের ঘণ্টাটা বার-কয়েক বাজালাম। দরজা খুলে গেল। বাড়িটার রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত ব্যক্তিরা আমাদের পরিচয়পত্র দেখে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিল।
বাড়িটার ভেতরে ঢুকে আমরা সিঁড়ি ভেঙে ওপর তলায় উঠে গেলাম।
ঘরের ভেতরে পা দিয়েই খাটের ওপর মাদামোয়াজেল এলো। এস্পালয়ের মৃতদেহটা দেখতে পেলাম। কেবল তার মৃতদেহটাই নয়। তার মেয়ের মৃতদেহটাও পাশেই শুইয়ে রাখা হয়েছে দেখলাম।
ঘরের ভেতরে যে লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে গিয়েছিল, সে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিটা তখনও তেমনই দেখতে পেলাম।
ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখে আমি লক্ষ্য করলাম, গজেট দ্য দিবিড, পত্রিকার পাতায় যা ছাপা হয়েছিল তার অতিরিক্ত কিছুই নেই।
আমার চেয়ে অনেক বেশি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু সঁসিয়ে দুর্পস দেখলেন। তিনি অনুসন্ধিৎসু নজরে মৃত-দুজনের লাশ দেখতেও বাদ দিলেন না।
মৃত-ঘর থেকে বেরিয়ে আমরা অন্য ঘরগুলো ও উঠানে গেলাম। একজন সশস্ত্র পুলিশ প্রথম থেকে শেষাবধি আমাদের পিছনে আঁঠার মতো লেগে রইল। রাতের অন্ধকার নেমে-আসা অবধি আমরা তদন্তের কাজে লেগে রইলাম।
সে বাড়ি থেকে বেরোবার পর বাড়ি ফেরার সময় পথের ধারের এক দৈনিক পত্রিকার দপ্তরে এক মুহূর্তের জন্য ঢু মারলেন।
আমার বন্ধুবরের হরেকরকম খামখেয়ালির কথা তো আগেই উল্লেখ করেছি। তাই লক্ষ্য করলাম, ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডটা সম্বন্ধে পরদিন দুপুরের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত মুখ না খোলার খেয়ালটাই তার মাথায় চেপেছে।
