আলবের্তো তানি নিজে একজন ইতালীয়। আর কোনো রুশের সঙ্গে কোনোদিন কথা বলার সুযোগও তার হয়নি।
এবার জনাকয়েক সাক্ষীকে দ্বিতীয়বার সাক্ষ্যদান করতে হলো। তাদেরই একজন বলল–চারতলার ঘরের চুল্লির চিমনিগুলো খুবই সরু। সেগুলো এতই সরু যে, তার ভেতর দিয়ে একজন মানুষের পক্ষে কিছুতেই গলে-যাওয়া সম্ভব নয়।
চিমনিগুলো সরু হওয়া সত্ত্বেও একটা চিমনি খোঁচাবার ঝাড়ন বার বার খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখতেও ত্রুটি রাখা হলো না।
বাড়িটায় কোনো গুপ্তপথও নেই। কোনো বহিরাগত যখন বাড়ির ভেতরে ঢোকে, সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠে, তখন কেউ গুপ্তপথ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাবে, এমন কোনো ব্যবস্থাও নেই।
এদিকে মাদামোয়াজেল ল স্পোলয়ের লাশটা চিমনির ভেতরে এমনভাবেআটকে গিয়েছিল যে, সেটা বের করা কঠিন সমস্যা হয়ে দেখা দিল। শেষপর্যন্ত কয়েকজন দাঁতে দাঁত চেপে টানা হেঁচড়া করে সেটাকে কোনোরকমে বের করে আনা হলো।
এবারের সাক্ষী পল দুমা। তিনি একজন কৃতী চিকিৎসক। সাক্ষ্য দেবার জন্য তাকে কাকডাকা ভোরে তলব করে নিয়ে আসা হয়েছিল।
ডাক্তার পল দুমাকে সোজা ওপরে, যে ঘরে মাদামোয়া জেল ল-র মৃতদেহটা ছিল। সে ঘরের কারুকার্যমণ্ডিত খাটের ওপর শোয়ানো ছিল। তারই পাশে শুইয়ে রাখা হয়েছিল তার মেয়ের মৃতদেহটা।
ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখলেন, যুবতির দেহের অনেকাংশ ছিঁড়ে গিয়ে ছাল চামড়া উঠে গেছে। তার চেহারাটা এমন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠার কারণ, চিমনিটার ভেতর থেকে মৃতদেহটাকে টানাটানি করে বের করা হয়েছে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে গিয়ে ডাক্তার পল দুমা যুবতিটার গলায় ঘন কালো–কালসিটে পড়ার একটা দাগ স্পষ্ট দেখতে পেলেন। আসলে সেটা ঘটানির দাগ। থুতনির তলায় কয়েকটা গভীর ক্ষতও দেখতে পেলেন। তার মুখটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে, চকের মতো সাদা। মাঝে-মধ্যে কালসিটে পড়ার দাগগুলো, যে আঙুলের দাগ, এতে কিছুমাত্রও সন্দেহের অবকাশ ছিল না।
মুখটাই যে কেবলমাত্র ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল তাই নয়, চোখের মণি দুটো কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে এসেছিল। আর দাঁতের চাপে জিভের কিছুটা অংশও কেটে গিয়েছিল।
আর পাকস্থলির গায়ে একটা বড়সড় কাটা-দাগ দেখে মনে হলো হাঁটু দিয়ে জোর করে চেপে ধরার ফলেই ওটা সৃষ্টি হয়েছে। ডাক্তার পল দুমা যা বললেন, তাতে করে বোঝা গেল, অপরিচিত কোনো ব্যক্তি বা কয়েকজন তার গলা চেপে ধরেছিল। আর এরই ফলে তার মৃত্যু হয়েছে। মেয়ের চেয়েও মায়ের দেহটা, বিশেষ করে চোখ-মুখ খুব বেশি রকম বিকৃত হয়ে পড়েছিল। মাদাম ল এস্পালয়-এর ডান পা আর হাতের সবকটা হাড়গোড়াই ভেঙে গিয়েছিল, কিছুটা অংশ গুঁড়ো গুঁড়োও হয়ে গিয়েছিল। আরও আছে, বাঁ পায়ের হাড় আর বাঁ দিকের সব কটা পাঁজরই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। মোদ্দা কথা, সম্পূর্ণ দেহটাই মারাত্মক রকম কেটে, হাড়গোড় ভেঙেচুরে বিকট আকৃতি ধারণ করেছিল। কিভাবে যে সে সব ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল, ডাক্তার পল দুমার নিশ্চিত করে বলতে পারলেন না।
পেশীবহুল কোনো অতি বলবান ব্যক্তি মোটা লোহার টুকরো বা কাঠের ভারী গদা জাতীয় কোনোকিছু বা ভারী কোনো চেয়ার প্রভৃতি কোনো ভারী বড় অস্ত্রপাতি দিয়ে আঘাতের মাধ্যমেই এরকম ক্ষতের সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। ডাক্তার পল দুমারের দৃঢ় বিশ্বাস, কোনো মহিলা কাউকে এত জোরে আঘাত করতে পারে না।
স্বাক্ষী অকুস্থানে পৌঁছে যখন দেখলেন, তখন মৃতের মাথাটা ধড় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে পড়েছিল আর খুব তেলে ভেঙেচুড়েও গিয়েছিল। গলাটা কি দিয়ে ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল? এ ব্যাপারে তার মতো, নির্ঘাৎ কোনো সুতীক্ষ অস্ত্র দিয়ে কাজটা সারা হয়েছিল। তিনি নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও ক্ষুর দিয়ে কাজটা সারা হয়েছিল, এরকম ইঙ্গিত দিলেন।
মৃতদেহ দুটোকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য সার্জন ডাক্তার পল দুমার সঙ্গে সার্জন আলেকজান্দার এতিয়েনকেও খবর দিয়ে আনা হয়েছিল। তিনি ডাক্তার পল দুমার সিদ্ধান্তকেই মেনে নিলেন।
পরবর্তীকালে এক এক করে আরও কয়েকজনকেও মা-মেয়ের মৃত্যুর ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। কিন্তু তাদের মুখ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য কোনো কথাই জানা সম্ভব হয়নি।
সত্যি কথা বলতে কি, প্যারিস শহরের বুকে সবদিক থেকে এমন জটিল ও গভীর রহস্যপূর্ণ কোনো হত্যাকাণ্ড ইতিপূর্বে কোনোদিন ঘটেনি। অবশ্য যদি এটা মৃত্যু না হয়ে হত্যার ব্যাপার হয়।
এরকম দু-দুটো অস্বাভাবিক মৃত্যুর ব্যাপার নিয়ে পুলিশ রীতিমত হিমসিম খাচ্ছে। হণ্যে হয়ে চেষ্টা করেও নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রের হদিস পেল না।
খবরের কাগজটার সান্ধ্য সংস্করণে ছাপা হয়েছে, কায়োতিয়ের স্যাৎ রোচ-এর পরিস্থিতি এখন অবধি শান্ত তো হয়নি বরং সেখানকার মানুষ উত্তেজনায় আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার মতোই ফুটছে। অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে যাওয়া বাড়িটাতে আবারও রহস্যের সূত্র লাভের আশায় সতর্কতার খোঁজাখুঁজি করা হয়েছে। স্বাক্ষীদের আরও ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই ফায়দা কিছুই হয়নি।
তবে সান্ধ্য পত্রিকায় বলা হয়েছে, এ দল্ফ লি বোঁ-কে পুলিশ গ্রেপ্তার করে জেলখানায় আটক করেছে। তবে এও সত্য যে, বর্ণিত বিবরণ ছাড়া এমন সূত্রের সন্ধান মেলেনি যাতে এ ব্যাপারে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব।
