দর্জি উইলিয়াম বার্ড এবং তার সঙ্গিরা বাড়িটার ভিতর থেকে ভেসে আসা ঝগড়াঝাটি, কথা কাটাকাটি শুনতে পায়। খুবই তীব্র স্বরে কথা হচ্ছিল।
যার কণ্ঠস্বর অধিকতর কর্কশ ছিল সে একজন ফরাসি। উইলিবার্ড কথাগুলো ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন, কিন্তু এখন আর সেগুলো স্মরণ করতে পারছেন না। তবে যে কয়টা শব্দ এখনও মনে আছে তাদের মধ্যে খ্যাকরে এবং মন ডিট শব্দ কয়টা এখন পর্যন্ত তাঁর বুকে যেন গেঁথে রয়েছে। ঠিক তখনই চিত্তার চাচামেচি এমন তুঙ্গে উঠে গিয়েছিল যার ফলে সব কথা তিনি ভালোভাবে শুনতেও পাননি। আর ঘুষোঘুষি আর হুড়হাঙ্গামা শুরু হয়ে যায়, যার ফলে তাদের বাকবিতণ্ডার সব কথা শোনা সম্ভব হয়নি।
কিন্তু তীব্র কণ্ঠস্বরটা ছিল খুবই উচ্চাগ্রামের। সংক্ষেপে বলতে গেলে, তীব্রর চেয়েও অনেক, অনেক বেশি জোরালো। উকর্ণ হয়ে শুনে তিনি নিঃসন্দেহ হয়েছিলেন, সেটা কোনো ইংরেজি ভাষা-ভাষীর কণ্ঠস্বর নয়। কোনো একজন জার্মানের কণ্ঠস্বর বলেই তার মনে হলো। আর সেটা নির্ঘাৎ কোনো মহিলার কণ্ঠস্বর। জার্মান ভাষায় কথা বলতে সে জানে না। তবে তিনি বার বারই বলেছেন সেটা যে মহিলার কণ্ঠস্বও, তাতে সামান্যতম সন্দেহ তার নেই।
এই মাত্র যে চারজনের সাক্ষ্যের কথা বলা হলো তাদের সবাইকে ডাকা হলো।
চারজন সাক্ষীই একই কথা বলেছেন। মাদামোয়জেলের মৃতদেহ যে ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে সে ঘরটার দরজায় পৌঁছেই তারা থমকে যেতে বাধ্য হন। কারণ, দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ, ছিটকিনি দেওয়া। না, কেবল ছিটকিনিই দেওয়া ছিল না, তালাবন্ধও ছিল। ভেতর থেকে সামান্যতম আওয়াজও ভেসে আসছিল না, শুনলাম। কোনোরকম আর্তনাদ তো নাই, কথাবার্তার আওয়াজও শোনা যাচ্ছিল না।
বাইরে থেকে দমাদম আঘাত হেনে অনেক কষ্টে দরজাটা ভেঙে ফেলা হলো। হুড়মুড় করে সবাই ভেতরে ঢুকে হতভম্ব হয়ে যাবার যোগাড় হলেন। কাউকেই দেখা গেল না।
সামনের আর পিছনের, উভয় দিকের জানালাই বন্ধ ছিল। ভেতর থেকে ছিটকিনি তুলে দেওয়া। দুটো ঘরের মাঝের দরজাটাও ছিল বন্ধ। তালা দেওয়া নয়, খিল আঁটা।
সামনের ঘর থেকে বারান্দায় যাবার জন্য একটা দরজা ছিল। সেটাও বন্ধ। তালাবন্ধ। আর তার চাবিটা ভেতরে রাখা ছিল।
চারতলা বাড়িটার সামনের দিকের বারান্দার শীর্ষে একটা ছোট ঘর ছিল। তার দরজা ছিল খোলা। ঘরটার ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখা গেল, বাক্স আর বিছানাপত্র গাদা মেরে ফেলে রাখা হয়েছে।
সবাই মিলে হুড়মুড় করে ঘরটার ভেতরে ঢুকে বাক্স আর বিছানাপত্র তল্লাশি করা হলো। হতাশই হতে হলো। কিছু পাওয়া গেল না। সত্যি কথা বলতে কি, বাড়িটার
এক ইঞ্চি জায়গাও তল্লাসি করতে বাদ দেওয়া হলো না। এমনকি চুল্লির ওপরকার চিমনিটাও বাদ দেওয়া হলো না। ওপর-নিচ তন্ন তন্ন করে ঝাঁট দিয়ে খোঁজাখুঁজি করা হলো। কিন্তু ফয়দা বলতে কিছুই হলো না।
আগেই বলা হয়েছে, বাড়িটা চারতলা। সবার ওপরে একটা চিলেকোঠা। ছাদের চাপ-দেওয়া দরজাটাকে মোটা গজাল চালিয়ে চালিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ভালোই বোঝা গেল, দীর্ঘ বছর কয়েক সেটাকে ভোলা হয়নি।
এবার স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, বাড়িটার ভেতর থেকে ভেসে-যাওয়া চিৎকার চাচামেচি আর তা শুনে দল বেঁধে হুড়মুড় করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে যাওয়ার মধ্যে সময়ের ব্যবধান কতখানি ছিল এ বিষয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন রকম মতবাদ ব্যক্ত করেছেন। জিজ্ঞাসা করলে কেউ বলল, তিন মিনিট; কেউ বলল পাঁচ মিনিট।
দরজাটা খুলতে কী যে কষ্ট হয়েছিল তা আর বলার নয়।
এবার সাক্ষ্য দিল, আলফনজো গার্চিও। তিনি মুদাফরাসের কাজ করেন। তিনি নিজের আবাসস্থলের কথা বলতে গিয়ে জানালেন, মর্গেই তার বাড়ি। সে দলটা বাড়ির ভেতরে গিয়েছিলেন তিনি তাদের দলেই ছিলেন।
অন্যান্যদের সঙ্গে বাড়ির ভেতরে গিয়েছিলেন সত্য। কিন্তু সবার সঙ্গে ওপরতলায় ওঠেন নি। আসলে উঠতে ভরসা পাননি। স্নায়ু খুবই দুর্বল। উত্তেজনার ফলে কি হতে পাওে, এ নিয়ে তার আশঙ্কা করে তিনি সিঁড়ি পর্যন্ত গিয়ে থেমে গিয়েছিলেন। তবে তর্কাতর্কি শুনতে পেয়েছিলেন ঠিকই।
তীব্র ও কর্কশ স্বরে চিল্লাচিল্লি করছিল সে কোনো এক ফরাসি, এ বিষয়ে তিনি নিঃসন্দেহ। আরও নিশ্চিত যে, লোকটা ইংরেজি ভাষা অজ্ঞ। তবে কথা বললে উচ্চারণ থেকে মোটামুটি একটা ধারণা করে নিতে পারেন।
এবারের সাক্ষী আলবের্তো তানি–রুটির ব্যবসায়ী তিনি। সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন–হৈ হল্লা শুনে যারা ছুটাছুটি করে বাড়ির ভেতরে ঢুকেছিল আর সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠেছিল, তিনি তাদের দলেই ছিলেন।
উপরোক্ত সাক্ষীদের মতামতের সঙ্গে আলবের্তো তানি একমত। কর্কশ স্বরের মালিক যে একজন ফরাসি, তিনিও এ ব্যাপারে একমত। তর্কাতর্কি হওয়ার সময় তিনি যা-কিছু শুনেছেন তাদের মধ্যে কয়েকটা কথা বুঝতে পেরেছেন। তিনি রীতিমত দৃঢ়তার সঙ্গে মতামত করতে গিয়ে বললেন–তীব্র কণ্ঠস্বরের মালিক কোনো একটা প্রসঙ্গে প্রতিবাদ করছিল।
তবে রুটির ব্যবসায়ী আলবের্তো তানি এও স্বীকার করলেন, তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরটা সম্বন্ধে তিনি কিছুই অনুমান করতে পারেননি। তার কথার একটা বর্ণও হৃদয়ঙ্গম করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সে খুবই দ্রুত কথা বলছিল। আর কণ্ঠসরটা এত ঘন ঘন ওঠা-নামা করছিল যার ফলে তিনি কিছুই ধরতে পারেননি। তবে লোকটাকে একজন রুশীয় বলেই তার মনে হয়েছে।
